জুলাই গণঅভ্যুত্থান: সফলতা, ব্যর্থতা নাকি একটি অসমাপ্ত যাত্রা?
- আপডেট সময় : ১২:০৬:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬ ৮৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। তবে অভ্যুত্থানের এক বছর পরও জনপরিসরে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে—এই গণঅভ্যুত্থান কি সফল, নাকি ব্যর্থ? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর উত্তর নির্ভর করে আমরা অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপটকে কীভাবে মূল্যায়ন করছি তার ওপর।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর অধিকাংশ বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানকে তাদের তাৎক্ষণিক ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করা কঠিন। ফরাসি বিপ্লবকে যদি ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা হয়, তবে বিশ্বের বহু ঐতিহাসিক বিপ্লবই প্রত্যাশিত সব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে সেগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বা রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। কারণ কোনো বিপ্লব কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সমাজের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের সূচনা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। এই অভ্যুত্থানের সফলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের অনুধাবন করতে হবে এর মূল প্রেরণা কী ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের ওপর এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা ক্রমশ গণতান্ত্রিক বৈধতা হারিয়ে ফেলেছিল। দুর্নীতি, দুঃশাসন, প্রশাসনিক দলীয়করণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের অভিযোগ জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক যখন ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে, তখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে জমে থাকা অসন্তোষ একসময় বিস্ফোরণের রূপ নেয়।
এই প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। তাদের আন্দোলন কেবল কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে ছিল না; বরং একটি কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ছিল। সেই অর্থে বিচার করলে অভ্যুত্থানের প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি শক্তিশালী স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানো। যদি এই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়, তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে সফল। কারণ এটি এমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে, যা একসময় অনেকের কাছেই অসম্ভব বলে মনে হতো।
তবে এখানেই বিতর্কের সূত্রপাত। অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন দ্রুত দৃশ্যমান হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র সংস্কার কোনো তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়া নয়। একটি সরকার পতন ঘটানো তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ঘটনা হলেও একটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর বহু বছরের কাজ।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই বিপ্লব ও সংস্কারকে একই বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরপরই মানুষ একটি আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়। প্রত্যাশা যত বড় হয়, হতাশার সম্ভাবনাও তত বৃদ্ধি পায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা স্পষ্ট। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, সেটিকে অনেকে সংস্কারের চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সম্ভাবনা ও বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব পূরণ করতে সময়, দক্ষ নেতৃত্ব এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান—সবকিছুরই প্রয়োজন হয়।
অতএব, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একক শব্দে সফল বা ব্যর্থ বলা সম্ভব নয়। একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিচারে এটি সফল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের বিচারে কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। সেই অর্থে এটি কোনো সমাপ্ত অধ্যায় নয়; বরং একটি দীর্ঘ যাত্রার সূচনা।
ইতিহাস সাধারণত বিপ্লবকে তার প্রথম বছরের অর্জন দিয়ে বিচার করে না। বরং বিচার করে সেই বিপ্লব নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের কতটুকু ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে তার ওপর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে এটুকু বলা যায়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে আগামী বছরগুলোতে রাষ্ট্র ও সমাজ কোন পথে অগ্রসর হয় তার ওপর।
নাকিবুর রহমান সরকার
শিক্ষার্থী
মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা, বাংলাদেশ



















