ঢাকা ০৬:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কাপাসিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর যুব বিভাগের উদ্যোগে বিশাল মাদক বিরোধী র‍্যালী সীমান্তে মাদকের বড় চালান জব্দ: ৭২ হাজার ইয়াবাসহ আটক ২ বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত কুবিতে ছাত্রশিবিরের বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কর্মসূচি হামে ৩০০ শিশু মৃত্যুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রশ্ন তুললেন ড. মাসুদ এমপি গর্জনিয়ার উত্তর বড়বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমিটি গঠিত চিংড়ি খাত উন্নয়নে সরকারি সহায়তার আশ্বাস- প্রতিমন্ত্রী টুকু সংসদে মাদকবিরোধী কঠোর আইন পাসের উদ্যোগ নেওয়া হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করলো জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট বিশ্বকাপে মুখোমুখি হতে পারে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা

বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত

হাসান মাহমুদ শুভ
  • আপডেট সময় : ০৩:৩১:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ ১২৪ বার পড়া হয়েছে
নিউজ ভিশনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে কূটনৈতিক সাফল্য সবসময় কোনো বড় চুক্তি, যৌথ ঘোষণা বা বহুল আলোচিত রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় একটি দেশের প্রতি অন্য দেশের আচরণ, অবস্থান কিংবা নীতিগত পরিবর্তনই বড় ধরনের কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা। বিষয়টির তাৎপর্য এখানেই যে, এই সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো অনুরোধ, চাপ বা কূটনৈতিক প্রচারণার খবর সামনে আসেনি; বরং ভারত নিজ উদ্যোগেই ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর সময়সূচি ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি সূক্ষ্ম প্রতিফলন।

এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি তুলনামূলকভাবে সক্রিয় ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পেয়েছে। এসব সফরের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

মালয়েশিয়া সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার কূটনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী দেশটির অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন এবং দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। সাম্প্রতিক সফরে দুই দেশের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদন খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি হিসেবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু শ্রমবাজার নয়, বরং প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং হালাল শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে চায়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে কূটনীতিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।

অন্যদিকে চীন সফর ছিল আরও বেশি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ববহ। গত এক দশকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদারে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাম্প্রতিক সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।

বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্রুত বর্ধনশীল বাজার চীনা ও অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তিস্তা প্রকল্পও আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্প শুধু পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চীনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। কারণ তিস্তা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গেও জড়িত।

এখানেই ভারতের ভিসা নীতিতে পরিবর্তনের বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। চীন সফরের ঠিক আগে ভারতের এই নমনীয় অবস্থানকে অনেক পর্যবেক্ষক কেবল মানবিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না। বরং এটিকে বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক বার্তা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ আজ আর শুধুমাত্র কোনো একটি আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভৌগোলিক অবস্থান, বৃহৎ বাজার এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করত যে দেশটি অতিরিক্তভাবে ভারতকেন্দ্রিক কূটনৈতিক বলয়ের মধ্যে অবস্থান করছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে চীন, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এই বহুমুখী কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে অন্তত এই বার্তাই পাওয়া যায় যে দেশটি এখন নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছে এবং সেই সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

অবশ্য কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধুমাত্র সফর, বৈঠক বা নীতিগত ঘোষণার মাধ্যমে করা যায় না। এর প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করে কতটা বিদেশি বিনিয়োগ আসে, কত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, রপ্তানি কতটা বাড়ে এবং জাতীয় উন্নয়নে এসব উদ্যোগ কতটা অবদান রাখে তার ওপর। তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করে বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের ভিসা নীতিতে পরিবর্তন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা সব মিলিয়ে এটি এমন এক পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত দেয়, যা ক্রমশ আরও বহুমাত্রিক, বাস্তববাদী এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই আত্মবিশ্বাসই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

লেখক
নাকিবুর রহমান সরকার
শিক্ষার্থী
মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা, বাংলাদেশ

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত

আপডেট সময় : ০৩:৩১:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের কূটনীতির নতুন আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে কূটনৈতিক সাফল্য সবসময় কোনো বড় চুক্তি, যৌথ ঘোষণা বা বহুল আলোচিত রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় একটি দেশের প্রতি অন্য দেশের আচরণ, অবস্থান কিংবা নীতিগত পরিবর্তনই বড় ধরনের কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা। বিষয়টির তাৎপর্য এখানেই যে, এই সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো অনুরোধ, চাপ বা কূটনৈতিক প্রচারণার খবর সামনে আসেনি; বরং ভারত নিজ উদ্যোগেই ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর সময়সূচি ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি সূক্ষ্ম প্রতিফলন।

এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি তুলনামূলকভাবে সক্রিয় ও বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পেয়েছে। এসব সফরের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

মালয়েশিয়া সফর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার কূটনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী দেশটির অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন এবং দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। সাম্প্রতিক সফরে দুই দেশের মধ্যে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদন খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি হিসেবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু শ্রমবাজার নয়, বরং প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং হালাল শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে চায়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে কূটনীতিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।

অন্যদিকে চীন সফর ছিল আরও বেশি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ববহ। গত এক দশকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদারে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাম্প্রতিক সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।

বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং দ্রুত বর্ধনশীল বাজার চীনা ও অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তিস্তা প্রকল্পও আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্প শুধু পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। চীনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। কারণ তিস্তা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গেও জড়িত।

এখানেই ভারতের ভিসা নীতিতে পরিবর্তনের বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। চীন সফরের ঠিক আগে ভারতের এই নমনীয় অবস্থানকে অনেক পর্যবেক্ষক কেবল মানবিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না। বরং এটিকে বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক বার্তা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ আজ আর শুধুমাত্র কোনো একটি আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভৌগোলিক অবস্থান, বৃহৎ বাজার এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করত যে দেশটি অতিরিক্তভাবে ভারতকেন্দ্রিক কূটনৈতিক বলয়ের মধ্যে অবস্থান করছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে চীন, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। এই বহুমুখী কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে অন্তত এই বার্তাই পাওয়া যায় যে দেশটি এখন নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছে এবং সেই সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

অবশ্য কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধুমাত্র সফর, বৈঠক বা নীতিগত ঘোষণার মাধ্যমে করা যায় না। এর প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করে কতটা বিদেশি বিনিয়োগ আসে, কত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, রপ্তানি কতটা বাড়ে এবং জাতীয় উন্নয়নে এসব উদ্যোগ কতটা অবদান রাখে তার ওপর। তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করে বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের ভিসা নীতিতে পরিবর্তন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা সব মিলিয়ে এটি এমন এক পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত দেয়, যা ক্রমশ আরও বহুমাত্রিক, বাস্তববাদী এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই আত্মবিশ্বাসই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

লেখক
নাকিবুর রহমান সরকার
শিক্ষার্থী
মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা, বাংলাদেশ