ডা. মিরু ইন্টার্ন ডাক্তার। ইন্টার্নশিপ শুরু করেছেন মাত্র ২ মাস হলো, কিন্তু কাজের প্রতি ভীষণ দায়িত্বশীল। সবাই তার যত্নশীলতা, দায়িত্ববোধ ও মনোযোগের প্রশংসা করত।
রোস্টারে মিরুর নাইট ডিউটি পড়ল। একজন বৃদ্ধ রোগী বাদে বাকি সবার ভাইটালস মোটামুটি ভালো ছিল। রাত ১টার দিকে মিরু ফলোআপ শেষ করে গ্রামের পথ ধরে ইন্টার্ন হোস্টেলের দিকে যাচ্ছিলেন একটু বিশ্রামের জন্য। রাত ১১টার পর ওই পথে রিকশা চলে না, মানুষের আনাগোনাও থাকে না—রাতের বেলায় পথটা বেশ ভয়ংকর।
মিরু রুমে পৌঁছেই একটু শুয়ে পড়লেন। হঠাৎ ফোন এল নার্স স্টেশন থেকে—
“ডা. মিরু, আপনার রোগীর অবস্থা ভালো না। স্যাচুরেশন কমে যাচ্ছে, অক্সিজেন দিয়েও কাজ হচ্ছে না।”
ক্লান্ত শরীরে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। ভাবলেন, ১০ মিনিট শুয়ে তারপর যাবেন। কিন্তু প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেল। আবার ফোন—
“ডা. মিরু, তাড়াতাড়ি আসেন, রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল!”
মিরু তড়িঘড়ি সাদা অ্যাপ্রোন পরে ভয়ে ভয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাসপাতালে রওনা দিলেন।
দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। সাদা পাঞ্জাবি পরা। অদ্ভুত শান্ত চেহারা।
বৃদ্ধকে দেখে মিরুর সাহস হলো।
— “চাচা, এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
— “একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।”
— “কে আসবে?”
— “যার সাথে আজ আমার যাওয়ার কথা।”
মিরু ভেবেছিলেন পরিবারের কেউ। বললেন—
— “চলুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।”
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন—
— “বাড়ি তো সামনে…”
কথাটা শুনে মিরু একটু থমকে গেলেন, কিন্তু সময় নষ্ট না করে দ্রুত এগোলেন। ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল—
“ডা. মিরু, বেড নং ১৩ — রোগীটি একটু আগে মারা গেছেন।”
মিরুর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। চারদিকে তাকালেন—বৃদ্ধ লোকটি নেই। ফাঁকা রাস্তা, হালকা বাতাস। যেন কানে কানে ভেসে আসছে—
“দেরি করো না… সময় কম…”
মিরু হাসপাতালে পৌঁছে ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে গেলেন। মৃত রোগীর মুখের দিকে তাকাতেই বুক কেঁপে উঠল—
রাস্তায় দেখা সেই বৃদ্ধ মানুষটিই!
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মিরু। মনে হতে লাগল—আর একটু আগে পৌঁছালে হয়তো মানুষটা বেঁচে যেতেন…
সেই রাতের পর থেকে মিরু আর কখনো ডিউটির সময় ওয়ার্ড ছেড়ে যান না। নাইট ডিউটিতে থাকলে পুরো রাত রোগীদের পাশে বসে থাকেন।
রোগীর জন্য আপনার উপস্থিতি কখনো কখনো ওষুধের থেকেও বেশি জরুরি।
ক্লান্তি থাকবে, চাপ থাকবে—তবু ডিউটির সময়টুকু জীবন-মৃত্যুর সীমানা হতে পারে।
একটু দ্রুত সাড়া, একটু বাড়তি মনোযোগ, একটা সময়মতো সিদ্ধান্ত—একটা জীবন বাঁচাতে পারে।
“Duty first — because someone’s last hope is you.”
লেখক:
ডা: ওসমান গনি ভূঁইয়া
ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ