মোফাজ্জল হোসেন
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত বিজয়ের ৫৪ তম বছর পেরিয়ে ৫৫তম বছরে পদযাত্রা করেছি। বিজয়ের এত বছর পরেও সত্যিকারের স্বাধীনতা কি আমরা খুঁজে পেয়েছি, প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারি, কাগজে-কলমে স্বাধীন বাংলাদেশ পেলেও এখানকার মানুষের কিন্তু স্বাধীনতা নেই। শুধু তাই নয়, আমাদের বিজয়কে ভারতীয়রা নিজেদের বিজয় বলেও দাবি করছে, যার স্পষ্টতা আমরা গত ১৬ ডিসেম্বর নরেন্দ্র মোদি’র সোশ্যাল পোস্টের মধ্যে পেয়েছি, যা আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরুপ এবং চরম অপমানজনক।
আমরা যদি স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তখনও কিন্তু এদেশের মানুষের স্বাধীনতা ছিলো না। এই যেমন- শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. শহীদুল্লাহ কায়ছারের হত্যা অনুসন্ধানে তার ছোট ভাই, তখনকার জনপ্রিয় চিত্রশিল্প জহির রায়হান বিচারের স্বাধীনতা হারিয়ে তিনিও মিরপুরে গিয়ে জীবন হারান। দুই ভাই হত্যার শোক সামলাতে না পেরে বোন নাফিসা কবির বিচারের দাবিতে পত্র-পত্রিকায় বেশ সাড়া ফেলেন, কিন্তু কে জানে তখনও বিচারের স্বাধীনতা বাংলাদেশ পায়নি। তাইতো শেখ মুজিব সরকার কর্তৃক তাকেও গুম করার হুমকিতে তিনি বিচার চাওয়ার স্বাধীনতায় হারিয়ে ফেলে চুপ হয়ে যান। স্বাধীন পরবর্তী দেশে তৎকালীন আওয়ামী সরকার দলীয় নেতাদের ব্যাপক দুর্নীতি ও ভারতে চোরাচালানের কারণে সাধারণ জনগণ হারিয়ে ফেলে খাবারের স্বাধীনতা, শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষের কারণে অনাহারে থাকা মানুষগুলো হারিয়ে ফেলে বাঁচার স্বাধীনতা, গ্রহণ করে অনিশ্চিত মৃত্যু। ওদিকে কাপড়ের স্বাধীনতা হারিয়ে ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘বাসন্তি’র জাল দিয়ে লজ্জা ঢাকার কথা নাই বললাম। গণমানুষের নেতা ‘লাল মাওলানা’ নামে খ্যাত আমাদের সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্ম নেওয়া ‘মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী’ ১৯৭৪ এর ১৮ই অক্টোবরে ঈদের আনন্দের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেন, সাথে হারিয়েছিলেন ঈদের নামাজের স্বাধীনতাও। তৎকালীন সরকার তাঁর উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যক্তি স্বাধীনতার পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতাও কেড়ে নিয়েছিলেন। আবার ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় জাসদ নেতা-কর্মীরা রাজনীতি করার স্বাধীনতা হারিয়ে রাজপথে রক্ষীবাহিনীর গুলিতে মরে। এদিকে নিজ বাবার কারণে আট বছরের ছোট শেখ রাসেলও বাঁচার স্বাধীনতা হারিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।
সে না হয় পুরোনো কথা, এই যুগের কথায় যদি বলি, তাহলে স্বাধীনতা আর কোথায় পেলাম। জুলাই বিপ্লব পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট আমলে তো জনমানসের বাক স্বাধীনতায় ছিলো না, ছিলো না কলম স্বাধীনতাও। ছিলো না গুম হওয়া বাবা’র সন্তানের আদরের স্বাধীনতা, পরিবারগুলোর এক সাথে হাসিমুখে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। দেশকে ভালোবাসার স্বাধীনতা হারিয়ে পিলখানায় হত্যা হয় অফিসার সেনা। দাবী আদায়ের স্বাধীনতা হারিয়ে ৫ই মে শাপলা চত্বরে রক্ত ঝরিয়ে প্রাণ দেয় আলেম-ওলামা ও ইসলামপ্রিয় জনতা। ২০১২ সালে সাগর-রুনি দম্পতি সাংবাদিকতার স্বধীনতা হারিয়ে দাপটওয়ালাদের টার্গেটের স্বীকার হয়ে হন খুন। তাদের রেখে যাওয়া শিশু সন্তান বড় হলেও, ১৩ বছরেও পায়নি সে খুন হওয়া বাবা-মায়ের বিচারের স্বাধীনতা। এখন পর্যন্ত ১২৩ বার পেছানো হয়েছে দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ। ভাবা যায়, ১৩ বছরে ১২৩ বার, বিচার হবে বলে সন্ধিহান, বিচারের স্বাধীনতা কোথায়?
সেখানে ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে হওয়া সাত খুনের রায়ের কার্যকারিতায় প্রহসনের কথা নাই বললাম। এদিকে জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদ খুনি হাসিনা পালাইছে, তারপরও কোথায় যেন স্বাধীনতা হারায়। সত্য বলার স্বাধীনতা নাই, সত্য জানার স্বাধীনতাও হারায়। দেশীয় সংস্কৃতি চর্চার স্বাধীনতা হারিয়ে, ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে কথা বলে বেঁচে থাকার স্বাধীনতাটুকুও নাই। তাইতো আমাদের ভাই শহীদ শরীফ ওসমান হাদি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী লড়াইয়ে গত ১২ই ডিসেম্বরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৮ই ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি জানতেন, ইনসাফের এ লড়াইয়ে তাকে খুন করা হবে, তাইতো তিনি খুনের বিচার যেন করা হয়, এটুকুই চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় ১ মাস কেটে গেলো, বিচারের দাবিতে আন্দোলনও করতে হলো এবং হচ্ছে, কিন্তু সেই বিচারের স্বাধীনতাটুকু আমরা এখনো পায়নি। বিচার নিয়ে চলছে প্রহসন। ওদিকে নারীরা ইভটিজিং-ধর্ষণের আতঙ্ক থেকে বাঁচার স্বাধীনতা চায়। বেকাররা চাকরির স্বাধীনতা চায়। উদ্যোক্তরা চাঁদামুক্ত ব্যবসার স্বধীনতা চায়। রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের স্বাধীনতা চাই। সাধারণ জনগণ সুস্থ-স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার চায়।
অতএব আমরা যদি সত্যিকারের স্বাধনতা পেতে চাই, তাহলে এখন থেকেই এই স্বাধীনতার জন্য দরকার জবাবদিহিতামূলক সরকার গঠন করা। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা। দরকার সুস্থ বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা, বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে চলা, বিচারে ধনী ও গরীবের মধ্যেকার বৈষম্যতা দূর করা। বিচার স্বাধনতাকে এমনভাবে গঠন করা, যেন স্বয়ং সরকার প্রধানও যদি অপরাধ বা দূর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন, এর জন্য তাকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করা। প্রহসনমুক্ত কার্যকরী বিচারব্যবস্থা গড়তে পারলেই ৯০ ভাগ অপরাধ এ দেশ থেকে পালাবে।
এছাড়াও সচেতন ও দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা, যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা, মেধা পাচার বন্ধ করা। অন্য দেশের প্রতি নির্ভরতা কমিয়ে, নিজ দেশের জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে মিসাইল, পারমানবিক অস্ত্রসহ আধুনিক অস্ত্র বানাতে সক্ষমতা অর্জন করা। প্রযুক্তিতে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা। নিজ দেশে অন্য কোনো দেশ আধিপত্য বিস্তার করতে চাইলে তাকে প্রতিহত করার সক্ষমতা গড়ে তোলা। সর্বশেষ নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ জনশক্তি গড়ে তোলা, মতের পার্থক্য থাকলেও যেন আমরা দেশ ও দেশের মানুষের স্বাধীনতা রক্ষায় এক হয়ে কাজ করতে পারি। তবেই আমরা এখনো না পাওয়া স্বাধীনতাটুকু পেতে পারি বলে আশাবাদী।
সবশেষে বিজয়ের ৫৫ তম বছরে এসে একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের ন্যায় স্বাধীনতাটুকুই চাই।’
লেখক: শিক্ষার্থী ও তরুণ লেখক