ইমরান হাসান
নতুন বছর কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদলের নাম নয় এটি একটি জাতির জন্য আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও নতুন প্রত্যয়ের সূচনাবিন্দু। পুরোনো বছরের অর্জন ও ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে সুযোগ নতুন বছর এনে দেয়, তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলেই জাতির অগ্রযাত্রা নিশ্চিত হয়। তাই নতুন বছরের শুরুতে আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই বছরে জাতি হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা কী?
একটি জাতির দায়বদ্ধতা শুরু হয় তার নাগরিকদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে। সমাজে শালীনতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যত দুর্বল হয়, ততই রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। নতুন বছরে আমাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক পরিসরে সততা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া। দুর্নীতি, মিথ্যাচার ও স্বার্থপরতা যে কোনো জাতির অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়। এগুলো প্রতিহত করতে কেবল আইন নয়, প্রয়োজন নৈতিক দৃঢ়তা ও সামাজিক প্রতিরোধ।
নতুন বছরে আরেকটি বড় দায়বদ্ধতা হলো আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সচেতন ভূমিকা রাখা। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে হতাশা ও ক্ষোভ জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে। তাই নতুন বছরে নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব না থাকা।
তরুণ সমাজ একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। নতুন বছরে তরুণদের প্রতি জাতির দায়বদ্ধতা যেমন রয়েছে, তেমনি তরুণদেরও জাতির প্রতি দায় রয়েছে। কেবল চাকরি বা ব্যক্তিগত সাফল্যের পেছনে ছুটে যাওয়া নয়; বরং দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই হওয়া উচিত তরুণদের লক্ষ্য। দক্ষতা অর্জন, জ্ঞানচর্চা এবং প্রযুক্তিকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার এই তিনটি বিষয়ে তরুণ সমাজ সচেতন হলে দেশ এগিয়ে যাবে বহুগুণ দ্রুত।
নতুন বছরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়বদ্ধতা হলো সামাজিক ঐক্য ও সম্প্রীতি রক্ষা করা। ধর্ম, মত ও আদর্শের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা একটি সভ্য জাতির পরিচয়। বিভাজনের রাজনীতি ও বিদ্বেষমূলক আচরণ সমাজকে পিছিয়ে দেয়। তাই নতুন বছরে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত ভেদাভেদ নয়, ঐক্য; সংঘাত নয়, সংলাপ।
একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব আরও বেশি। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাদের নতুন বছরে শপথ নেওয়া উচিত ক্ষমতা নয়, সেবা হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। জনগণের আস্থা অর্জন ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করাই হোক নতুন বছরের অঙ্গীকার।
অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও নতুন বছরে আমাদের দায়বদ্ধতা স্পষ্ট। কেবল পরিসংখ্যানভিত্তিক উন্নয়ন নয়, মানুষের জীবনমানের বাস্তব পরিবর্তনই হওয়া উচিত অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষা যেন কেবল সনদনির্ভর না হয়ে নৈতিক ও মানবিক গুণাবলি তৈরির মাধ্যম হয়, সে দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, নতুন বছর আমাদের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে তখনই, যখন আমরা প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হব। রাষ্ট্র একা কিছু নয়; রাষ্ট্র গঠিত হয় নাগরিকদের আচরণ, চিন্তা ও চর্চার মাধ্যমে। নতুন বছরে তাই জাতির সামনে সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা নিজেকে বদলানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার জন্য একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।
লেখকঃ তরুণ কলাম লেখক ও
গ্রাজুয়েট, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।