ঢাকা ১০:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশের জেন-জি: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাজনৈতিক জাগরণ? প্যারিসে এফবিজেএর ‘জুলাই ডায়লগ স্মৃতি থেকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রত্যাশা। ফেনীর চার অপহরণ মামলার পলাতক আসামি টেকনাফে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করেননি, এখনো মহাসচিব: সমাজকল্যাণমন্ত্রী কক্সবাজারে আবাসিক হোটেল থেকে পুলিশ সদস্যের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার মাদারীপুরে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও জবাবদিহিতার দাবিতে সাবেক শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন চকরিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ যাত্রী নিহত, আহত ৫ নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুবি ছাত্রশিবিরের নবীন বরণ অনুষ্ঠিত নিজ শহরের মানুষের পাশে উছলাপাড়ার সন্তান ডা. ফাহিম ফাত্তাহ, দেবেন শিশু চিকিৎসাসেবা কক্সবাজারের মাতামুহুরীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫১০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিল আইএসডিই বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জেন-জি: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাজনৈতিক জাগরণ?

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৫০:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ ৩৯ বার পড়া হয়েছে
নিউজ ভিশনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

 

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই প্রবীণ নেতৃত্ব, ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল এবং
পরিচিত ক্ষমতার কাঠামোর চারপাশে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্রে একটি
গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রাজনীতির আলোচনায় এখন ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে নতুন
একটি প্রজন্ম জেনারেশন জেড বা জেন জি। তারা শুধু ভোটার হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের
সক্রিয় অংশীদার হিসেবেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যে মাত্রায় বেড়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার
ইঙ্গিত দেয়। ফলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে বাংলাদেশের জেন জি কি এই আঞ্চলিক
রাজনৈতিক জাগরণের অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর দিকে
তাকাতে হবে।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী
মুহূর্ত তৈরি করে। খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধের সংকটে বিপর্যস্ত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিশেষ
করে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা “আরাগালায়া” আন্দোলন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে
পরিণত হয়। আন্দোলনকারীরা প্রেসিডেন্টের বাসভবন পর্যন্ত দখল করে নেয় এবং শেষ পর্যন্ত
সরকারকে বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলে। এটি ছিল অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া
একটি গণআন্দোলন।

বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল ভিন্ন চরিত্রের। এখানে তরুণদের শক্তি শুধু রাজপথে নয়,
ডিজিটাল জগতেও সমানভাবে দৃশ্যমান ছিল। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, টেলিগ্রাম এবং বিভিন্ন অনলাইন
প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, মতামত বিনিময় এবং সমন্বয়ের কাজ
করেছে। প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে থেকেও হাজার হাজার তরুণ একটি সাধারণ লক্ষ্যকে
কেন্দ্র করে নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

এখানেই বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কারণ বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষা শুধু বই, সংবাদপত্র বা রাজনৈতিক সভা থেকে আসে না।
তারা শিখে স্মার্টফোনের পর্দা থেকে। একটি দেশের আন্দোলনের ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যেই
আরেক দেশের তরুণদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে আজকের বিশ্বে রাজনৈতিক অনুপ্রেরণাও সীমান্ত মানে
না।

নেপালের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটির তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ
দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি হতাশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা নতুন
রাজনৈতিক শক্তি এবং বিকল্প নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের
রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের মতো
তারাও ক্রমশ প্রশ্ন করতে শিখছে, জবাবদিহিতা দাবি করতে শিখছে এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে
নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

ভারতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যদিও দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সেখানে রাজনীতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। তারপরও একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভারতের জেন-জি প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয়। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক মত প্রকাশ, জনমত গঠন এবং সামাজিক আন্দোলনের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)’-এর উত্থান এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। শুরুতে এটি ছিল তরুণদের ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গের একটি প্রকাশ; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ক্ষোভ সংগঠিত রাজনৈতিক চাপের রূপ নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই তরুণদের আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজপথেও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষার অনিয়ম এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষ তাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও পৌঁছায়। আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধমেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। পরবর্তীতে ২৫ জুলাই ২০২৬ ধমেন্দ্র প্রধান শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তরুণদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত একটি তরুণ প্রজন্মও প্রয়োজনে রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর বাস্তব চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্দোলনকারীদের দাবি কেবল প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সরকার বিকল্প হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পরিবর্তন বা মন্ত্রণালয় বদলের মতো সমাধানের প্রস্তাব দিলেও ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) সেই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট হয়নি এবং পদত্যাগের দাবিতে অনড় থেকেছে। অর্থাৎ, তরুণদের আন্দোলন শুধু ক্ষোভ প্রকাশের জায়গায় থেমে থাকেনি; তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবি তৈরি করেছে, সেই দাবিকে জনসমর্থনের জায়গায় নিয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত তার বাস্তব রাজনৈতিক ফলাফলও দেখেছে।

এখানেই ভারতের জেন-জি রাজনীতির পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট। এতদিন তরুণদের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হলে তাদের ভোটার হিসেবে দেখা হতো যারা নির্বাচনের সময় সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা সীমিত থাকবে। ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। নতুন প্রজন্ম শুধু ভোট দিতে চায় না; তারা কোন বিষয়ে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয় এবং পরিবর্তন কোথায় প্রয়োজন সেসব নিয়েও সরাসরি অবস্থান নিতে চাইছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। নেপাল বা ভারতের তরুণদের রাজনৈতিক
উত্থানের একমাত্র কারণ বাংলাদেশ নয়। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক অবস্থা
এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট আলাদা। কোনো আন্দোলন হুবহু আরেকটি আন্দোলনের অনুকরণে গড়ে ওঠে
না। কিন্তু ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় বারবার শিখিয়েছে সাহস সংক্রামক।

১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে আরব বসন্ত কিংবা হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী
আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে।
একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান প্রজন্মও প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক ঘটনাগুলো গভীরভাবে
পর্যবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশের জেন জি এই প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। তারা দেখিয়েছে যে
রাজনৈতিক অংশগ্রহণ মানেই কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া নয়। নাগরিক হিসেবে নিজের
অবস্থান জানানো, প্রশ্ন তোলা, সংগঠিত হওয়া এবং জনস্বার্থের বিষয়ে সোচ্চার হওয়াও রাজনৈতিক
অংশগ্রহণের অংশ।

তারা আরও দেখিয়েছে যে প্রযুক্তি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও শক্তিশালী
হাতিয়ার হতে পারে। একটি পোস্ট, একটি ভিডিও কিংবা একটি অনলাইন ক্যাম্পেইন কখনও কখনও
হাজারো মানুষকে একই আলোচনায় যুক্ত করতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এখন নেতৃত্বের নয়, প্রজন্মের। নতুন এই
প্রজন্ম আগের প্রজন্মের মতো শুধুমাত্র দর্শক হয়ে থাকতে চায় না। তারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের
প্রভাব নিজের জীবনে অনুভব করে এবং সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও নিজেদের উপস্থিতি
দেখতে চায়।

তাই বাংলাদেশের জেন জি-কে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক জাগরণের একমাত্র চালিকাশক্তি বলা
অতিরঞ্জন হবে। তবে তাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। তারা এমন
একটি উদাহরণ তৈরি করেছে, যা সীমান্ত পেরিয়ে আলোচিত হয়েছে এবং তরুণদের রাজনৈতিক
অংশগ্রহণ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

সম্ভবত ভবিষ্যতের ইতিহাস এই সময়কে কোনো একক দেশের বিজয় হিসেবে মনে রাখবে না। বরং এটি
স্মরণ করবে দক্ষিণ এশিয়ার এক নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ হিসেবে যে প্রজন্ম বিশ্বাস করে,
রাজনীতি শুধু নেতাদের বিষয় নয়; এটি নাগরিকদেরও বিষয়। আর সেই গল্পে বাংলাদেশের তরুণদের
অবদান নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নাকিবুর রহমান সরকার
শিক্ষার্থী
মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বাংলাদেশের জেন-জি: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন রাজনৈতিক জাগরণ?

আপডেট সময় : ০৭:৫০:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
🖼️ ফটো কার্ড তৈরি করুন

 

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই প্রবীণ নেতৃত্ব, ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল এবং
পরিচিত ক্ষমতার কাঠামোর চারপাশে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্রে একটি
গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রাজনীতির আলোচনায় এখন ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে নতুন
একটি প্রজন্ম জেনারেশন জেড বা জেন জি। তারা শুধু ভোটার হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনের
সক্রিয় অংশীদার হিসেবেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল কিংবা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যে মাত্রায় বেড়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার
ইঙ্গিত দেয়। ফলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে বাংলাদেশের জেন জি কি এই আঞ্চলিক
রাজনৈতিক জাগরণের অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর দিকে
তাকাতে হবে।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী
মুহূর্ত তৈরি করে। খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধের সংকটে বিপর্যস্ত মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিশেষ
করে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা “আরাগালায়া” আন্দোলন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে
পরিণত হয়। আন্দোলনকারীরা প্রেসিডেন্টের বাসভবন পর্যন্ত দখল করে নেয় এবং শেষ পর্যন্ত
সরকারকে বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলে। এটি ছিল অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া
একটি গণআন্দোলন।

বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল ভিন্ন চরিত্রের। এখানে তরুণদের শক্তি শুধু রাজপথে নয়,
ডিজিটাল জগতেও সমানভাবে দৃশ্যমান ছিল। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, টেলিগ্রাম এবং বিভিন্ন অনলাইন
প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, মতামত বিনিময় এবং সমন্বয়ের কাজ
করেছে। প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে থেকেও হাজার হাজার তরুণ একটি সাধারণ লক্ষ্যকে
কেন্দ্র করে নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

এখানেই বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কারণ বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষা শুধু বই, সংবাদপত্র বা রাজনৈতিক সভা থেকে আসে না।
তারা শিখে স্মার্টফোনের পর্দা থেকে। একটি দেশের আন্দোলনের ভিডিও কয়েক মিনিটের মধ্যেই
আরেক দেশের তরুণদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে আজকের বিশ্বে রাজনৈতিক অনুপ্রেরণাও সীমান্ত মানে
না।

নেপালের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটির তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ
দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি হতাশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা নতুন
রাজনৈতিক শক্তি এবং বিকল্প নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের
রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের মতো
তারাও ক্রমশ প্রশ্ন করতে শিখছে, জবাবদিহিতা দাবি করতে শিখছে এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে
নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

ভারতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যদিও দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সেখানে রাজনীতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। তারপরও একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভারতের জেন-জি প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয়। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক মত প্রকাশ, জনমত গঠন এবং সামাজিক আন্দোলনের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)’-এর উত্থান এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। শুরুতে এটি ছিল তরুণদের ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গের একটি প্রকাশ; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ক্ষোভ সংগঠিত রাজনৈতিক চাপের রূপ নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই তরুণদের আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজপথেও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিক্ষা ব্যবস্থা, পরীক্ষার অনিয়ম এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষ তাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও পৌঁছায়। আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধমেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। পরবর্তীতে ২৫ জুলাই ২০২৬ ধমেন্দ্র প্রধান শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তরুণদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ এটি দেখিয়ে দিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত একটি তরুণ প্রজন্মও প্রয়োজনে রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর বাস্তব চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আন্দোলনকারীদের দাবি কেবল প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সরকার বিকল্প হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পরিবর্তন বা মন্ত্রণালয় বদলের মতো সমাধানের প্রস্তাব দিলেও ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) সেই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট হয়নি এবং পদত্যাগের দাবিতে অনড় থেকেছে। অর্থাৎ, তরুণদের আন্দোলন শুধু ক্ষোভ প্রকাশের জায়গায় থেমে থাকেনি; তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবি তৈরি করেছে, সেই দাবিকে জনসমর্থনের জায়গায় নিয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত তার বাস্তব রাজনৈতিক ফলাফলও দেখেছে।

এখানেই ভারতের জেন-জি রাজনীতির পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট। এতদিন তরুণদের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হলে তাদের ভোটার হিসেবে দেখা হতো যারা নির্বাচনের সময় সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা সীমিত থাকবে। ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। নতুন প্রজন্ম শুধু ভোট দিতে চায় না; তারা কোন বিষয়ে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয় এবং পরিবর্তন কোথায় প্রয়োজন সেসব নিয়েও সরাসরি অবস্থান নিতে চাইছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। নেপাল বা ভারতের তরুণদের রাজনৈতিক
উত্থানের একমাত্র কারণ বাংলাদেশ নয়। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক অবস্থা
এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট আলাদা। কোনো আন্দোলন হুবহু আরেকটি আন্দোলনের অনুকরণে গড়ে ওঠে
না। কিন্তু ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় বারবার শিখিয়েছে সাহস সংক্রামক।

১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে আরব বসন্ত কিংবা হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী
আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে।
একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান প্রজন্মও প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক ঘটনাগুলো গভীরভাবে
পর্যবেক্ষণ করছে।

বাংলাদেশের জেন জি এই প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। তারা দেখিয়েছে যে
রাজনৈতিক অংশগ্রহণ মানেই কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া নয়। নাগরিক হিসেবে নিজের
অবস্থান জানানো, প্রশ্ন তোলা, সংগঠিত হওয়া এবং জনস্বার্থের বিষয়ে সোচ্চার হওয়াও রাজনৈতিক
অংশগ্রহণের অংশ।

তারা আরও দেখিয়েছে যে প্রযুক্তি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও শক্তিশালী
হাতিয়ার হতে পারে। একটি পোস্ট, একটি ভিডিও কিংবা একটি অনলাইন ক্যাম্পেইন কখনও কখনও
হাজারো মানুষকে একই আলোচনায় যুক্ত করতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এখন নেতৃত্বের নয়, প্রজন্মের। নতুন এই
প্রজন্ম আগের প্রজন্মের মতো শুধুমাত্র দর্শক হয়ে থাকতে চায় না। তারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের
প্রভাব নিজের জীবনে অনুভব করে এবং সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও নিজেদের উপস্থিতি
দেখতে চায়।

তাই বাংলাদেশের জেন জি-কে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক জাগরণের একমাত্র চালিকাশক্তি বলা
অতিরঞ্জন হবে। তবে তাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। তারা এমন
একটি উদাহরণ তৈরি করেছে, যা সীমান্ত পেরিয়ে আলোচিত হয়েছে এবং তরুণদের রাজনৈতিক
অংশগ্রহণ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

সম্ভবত ভবিষ্যতের ইতিহাস এই সময়কে কোনো একক দেশের বিজয় হিসেবে মনে রাখবে না। বরং এটি
স্মরণ করবে দক্ষিণ এশিয়ার এক নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ হিসেবে যে প্রজন্ম বিশ্বাস করে,
রাজনীতি শুধু নেতাদের বিষয় নয়; এটি নাগরিকদেরও বিষয়। আর সেই গল্পে বাংলাদেশের তরুণদের
অবদান নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নাকিবুর রহমান সরকার
শিক্ষার্থী
মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়