মোসাঃতানজিলা, ঢাকাঃ
রাজধানী ঢাকার স্বনামধন্য ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসন ও নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে নতুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে “কেমন ক্যাম্পাস চাই” শীর্ষক এক নজিরবিহীন আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঢাকা কলেজ ক্যাফেটেরিয়ায় হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস সোসাইটি ঢাকা কলেজের (HRDSDC) উদ্যোগে আয়োজিত সভায় ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল প্রায় সকল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হয়ে একটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও সৃজনশীল ক্যাম্পাসের রূপরেখা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস সোসাইটি ঢাকা কলেজের সভাপতি মুহাম্মদ ওমায়ের। সংগঠনের সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম তুহিন-এর সঞ্চালনায় সভায় ঢাকা কলেজ ডিবেটিং সোসাইটি, আবৃত্তি সংসদ, ক্যারিয়ার ক্লাব, CYB, আমার দেশ পাঠকমেলা, ইউথ ম্যাপস, বসুন্ধরা শুভসংঘ, বাঁধন, রোভার স্কাউট ও শহীদ রুমি সংসদসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা তাদের সুনির্দিষ্ট মতামত ব্যক্ত করেন।
সভার শুরুতেই জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। বিশেষ করে ১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের ফটকে শহীদ হওয়া পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সবুজ আলীর সহ ঢাকা কলেজে বিভিন্ন মবে নিহত হওয়া শহিদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বক্তারা বলেন, শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন পরিবেশে আর কোনো ‘গেস্টরুম কালচার’ বা ‘টর্চার সেল’ ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। ১৭ বছরের ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে এখন বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সময় এসেছে।
সভায় উপস্থিত সকল সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত যৌক্তিক দাবি ও প্রস্তাবনাগুলো প্রশাসনের প্রতি পেশ করা হয়:
১. প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও বৈষম্যহীনতা: রাজনৈতিক সংগঠনের লেজুড়বৃত্তি না করে কলেজ প্রশাসনকে স্বাধীন হতে হবে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে অবহেলা না করে তাদের প্রতিটি আয়োজনে প্রশাসনিক সহযোগিতা, আর্থিক বরাদ্দ এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।
২. মেধাভিত্তিক আবাসন ও দখলদারিত্ব মুক্ত হল: হলের সিট বরাদ্দ হবে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করবে কেবল প্রশাসন। কোনো রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ বা বিশেষ সংগঠনের খবরদারি হলে চলবে না। সাধারণ ছাত্রদের মিছিলে যেতে বাধ্য করা বা রাজনৈতিক দাসত্বে বন্দি করা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
৩. নিরাপত্তা ও বাক-স্বাধীনতা: ক্যাম্পাসে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মৃতি রক্ষা এবং বিশেষ করে শহীদ রুমি ও শহীদ সবুজ আলীদের স্মরণে ক্যাম্পাসে স্মৃতিস্তম্ভ বা হলের নামকরণ করতে হবে।
৪. বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন: সংগঠনগুলোর কাজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা (রুম), অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আধুনিক লাইব্রেরি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধনে সকল সংগঠনের সমন্বয়ে একটি ‘ছাত্র সংসদ’ বা ‘সমন্বয় কাউন্সিল’ গঠন করতে হবে।
৫. একাডেমিক স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ: সম্প্রতি রসায়ন বিভাগের প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনা ঢাকা কলেজের ঐতিহ্যের পরিপন্থী। একাডেমিক যেকোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে সৃজনশীল ও প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রামের অবাধ অনুমতি দিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ ওমায়ের বলেন, “পরিবর্তন কেবল শুরু হয়েছে, কিন্তু লড়াই শেষ হয়নি। আমরা এমন একটি ঢাকা কলেজ চাই যেখানে একজন শিক্ষার্থী মাথা উঁচু করে হাঁটবে। সামনের জাতীয় নির্বাচনের পর যেন কোনোভাবেই পুরোনো দখলদারিত্ব ফিরে না আসে, সেজন্য সকল সামাজিক সংগঠনকে একতাবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের জন্য অতন্ত্রপ্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে।”
সভায় উপস্থিত সকল নেতৃবৃন্দ একমত হন যে, ক্যাম্পাসে যেকোনো সংগঠনের ওপর আঘাত বা বাধা আসলে তারা সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করবেন। ঢাকা কলেজকে একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই হবে আগামীর মূল লক্ষ্য।