ভারতের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের ক্ষোভের এক তুলনামূলক বিশ্লেষণ
একটি ছাত্র আন্দোলন কখন সরকারকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে, আর কখন তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়? শুধু রাজপথে মানুষের সংখ্যা দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। এর পেছনে কাজ করে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ভারতের সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনকে পাশাপাশি রাখলে এই বিষয়গুলোই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
ভারতে তরুণদের ক্ষোভের পেছনে রয়েছে বেকারত্ব, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক। ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP-কে ঘিরে আন্দোলনও এই অসন্তোষের একটি প্রকাশ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে ভারতের এই আন্দোলন বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের মতো পরিণতির দিকে যাবে কি না, তা বুঝতে হলে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা দুটোই বিবেচনায় নিতে হবে।
ভারতের অতীত আন্দোলনগুলো কী শেখায়?
১৯৭৪ সালের জে.পি. আন্দোলন ভারতের ছাত্র রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর সরকারবিরোধী সংগ্রামে রূপ নেয়। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার পরাজিত হয়।
এই ঘটনা দেখায়, ভারতেও ছাত্র আন্দোলন জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন একদিনে আসেনি। দীর্ঘদিনের জনঅসন্তোষ, বিরোধী দলগুলোর ঐক্য এবং নির্বাচনী রাজনীতি এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
২০১১ সালের আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনও ছিল উল্লেখযোগ্য। ব্যাপক জনসমর্থন সরকারকে চাপের মুখে ফেলেছিল এবং পরবর্তী সময়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পথ তৈরি করেছিল। ২০১২ সালে দিল্লিতে নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ আবারও দেখিয়ে দেয়, একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের দাবি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদ সত্ত্বেও দেখিয়েছে যে ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেই সব দাবি পূরণ হয় না। অর্থাৎ ভারতের ইতিহাসে আন্দোলনের পরিণতি সব সময় এক রকম ছিল না। কখনো সরকার বদলেছে, কখনো নীতিগত পরিবর্তন এসেছে, আবার কখনো আন্দোলন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেও প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান কেন আলাদা?
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে। কিন্তু আন্দোলন চলাকালে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, প্রাণহানি এবং সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে দ্রুত বদলে দেয়। শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট দাবি ক্রমেই বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন সরকার পতনের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এই দ্রুত পরিবর্তন। আন্দোলনের শুরুতে দাবি ছিল কোটা সংস্কার, কিন্তু পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় প্রশ্নটি গিয়ে দাঁড়ায় সরকারের ক্ষমতায় থাকা নিয়েই।
ভারতের বর্তমান আন্দোলনের ক্ষেত্রে একই ধরনের রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভোটাধিকার নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও এসব দাবির পেছনে থাকা মানুষ কতটা অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার চাওয়া আর কেন্দ্রীয় সরকারের পতন দাবি করা এক বিষয় নয়। জনসমর্থনের পাশাপাশি আন্দোলনের লক্ষ্য ও নেতৃত্ব কতটা স্পষ্ট, সেটিও এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
ভারতের বৈচিত্র্য আন্দোলনের শক্তি, আবার সীমাবদ্ধতাও
বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। দিল্লি জাতীয় ক্ষমতার কেন্দ্র হলেও মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, কলকাতা ও হায়দরাবাদের মতো শহরগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এক নয়।
ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় রাজ্য সরকারগুলোর নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। ফলে দিল্লিতে বড় আন্দোলন হলেই দেশের সব অঞ্চলে একই ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হবে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।
তরুণদের মধ্যেও রয়েছে নানা পার্থক্য। বিহারের চাকরিপ্রার্থী, দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, তামিলনাড়ুর তরুণ কর্মী কিংবা পশ্চিমবঙ্গের বেকার স্নাতকের অভিজ্ঞতা এক নয়। কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মতো সমস্যায় তাদের মধ্যে মিল থাকলেও ভাষা, ধর্ম, শ্রেণি, সামাজিক প্রতিনিধিত্ব এবং আঞ্চলিক পরিচয় রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে।
এই বৈচিত্র্যের কারণে দেশজুড়ে একই দাবিতে মানুষকে একত্র করা কঠিন। তবে বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণেরা যদি কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মতো অভিন্ন প্রশ্নে একমত হতে পারেন, তাহলে এই বৈচিত্র্যই আন্দোলনের বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি করতে পারে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দাবিতে রূপ দেওয়া।
শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান কি সরকার পতন ঠেকাতে পারে?
ভারতের সংসদ, নির্বাচন কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট, রাজ্য সরকার এবং বহুদলীয় নির্বাচনী ব্যবস্থা রাজনৈতিক বিরোধিতা প্রকাশের একাধিক পথ তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে, তাদের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবু নির্বাচনী প্রতিযোগিতা, আদালত এবং রাজ্যভিত্তিক রাজনীতি ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং জোটের শরিকদের সমর্থনে সরকার গঠন করে। এই ফলাফল দেখিয়েছে যে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্য দিয়েও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানো সম্ভব।
তবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকলেই সরকার সব ধরনের সংকট থেকে নিরাপদ থাকবে, এমন নয়। নাগরিকের অভিযোগের সমাধান না হলে, ভোটপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ দূর করা না গেলে কিংবা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ সংকুচিত হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমতে পারে। তখন রাজপথের আন্দোলনও আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসতে পারে।
ভারতের তরুণ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু আন্দোলনকারীদের শক্তির ওপর নির্ভর করবে না। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দাবির প্রতি কীভাবে সাড়া দেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কারের সুযোগ থাকলে আন্দোলন সেই পথ বেছে নিতে পারে। আর দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কোনো বিশ্বাসযোগ্য সমাধান না মিললে অসন্তোষ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ থাকে।
CJP আন্দোলনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ
ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP-কে ঘিরে আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ডিজিটাল সংস্কৃতি ও ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, অসন্তোষ ছড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু অনলাইনে জনপ্রিয়তা অর্জন আর দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা এক বিষয় নয়।
কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ আন্দোলনের একটি অর্জন হতে পারে, কিন্তু তা সরকার পতনের সমার্থক নয়। একইভাবে, কোনো দাবিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ হওয়া মানেই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে একমত, এমনও নয়।
দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব রাখতে হলে CJP-কে ঘিরে আন্দোলনের সামনে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর থাকা প্রয়োজন। পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ভোটাধিকার নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবি কী? বিভিন্ন রাজ্যের তরুণদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কতটা বিস্তৃত? আর প্রচলিত রাজনীতির সমালোচনার বাইরে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে তাদের অবস্থান কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষোভকে স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া কঠিন। কারণ মানুষকে একত্র করা আন্দোলনের প্রথম ধাপ; সেই ঐক্য ধরে রাখা এবং বাস্তব পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নেওয়াই আরও বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, ভারতের নিজস্ব বাস্তবতা
ভারতের তরুণ আন্দোলন বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের মতো সরকার পতনের দিকে এগোবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ভারতের ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে, যেখানে ছাত্র আন্দোলন সরকার পরিবর্তন, নির্বাচনী ফলাফল কিংবা নীতিগত সংস্কারে ভূমিকা রেখেছে। আবার দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনও সব সময় প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।ু
বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানকে ভারতের জন্য সরাসরি একটি ছক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, সামাজিক বাস্তবতা এবং আন্দোলনের পরিস্থিতি আলাদা। ভারতের ক্ষেত্রে আন্দোলন কতটা বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে, কতটা বিস্তৃত সামাজিক সমর্থন পায়, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো জনঅসন্তোষের সমাধান দিতে পারে কি না, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সরকার পতন একটি আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে, কিন্তু সেটিই একমাত্র মাপকাঠি নয়। নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করাও রাজনৈতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান ভারতের তরুণদের অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে তার নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। আসল প্রশ্ন তাই শুধু নরেন্দ্র মোদি সরকারের পতন হবে কি না, তা নয়। ভারতের তরুণেরা তাদের ক্ষোভকে কতটা সুসংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক দাবিতে রূপ দিতে পারবেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান, ন্যায্যতা, ভোটাধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিয়ে তাদের দাবি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য।
লেখকঃ
নাকিবুর রহমান সরকার
শিক্ষার্থী, মিডিয়া কমিউনিকেশন এন্ড জার্নালিজম বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।