বুকের জমিন চিঁড়ে রেলপথের জায়গা করে দিয়েছি আমরা—চকরিয়াবাসী। শুধু জমি নয়, এই রেললাইনের জন্য কোথাও হারিয়েছে ফসলি জমি, কোথাও চিংড়িঘের, কোথাও বসতভিটা। পাহাড়ের বুক কেটেছি, বন-জঙ্গল সরিয়েছি, প্রকৃতির শরীরের ওপর টেনে দিয়েছি লোহার দুইটি সরল রেখা। উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছি। ভেবেছি—একদিন এই লাইন ধরে ছুটে যাবে আমাদের স্বপ্ন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, ব্যবসার পণ্য, অসুস্থ মানুষের দ্রুত চিকিৎসার পথ, পর্যটকের কৌতূহলী চোখ।
এই জনপদ তো এমনিতেই কম দেয়নি রাষ্ট্র ও জাতিকে।
মাতামুহুরী নদীকে পাশে নিয়ে, পাহাড়ের ছায়ায়, সাগরের নোনা হাওয়া আর সবুজের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে চকরিয়া। একসময় এই ভূখণ্ডের বুকজুড়ে ছিল চকরিয়া সুন্দরবনের সবুজ সাম্রাজ্য। গাছের পাতায় পাতায় বাতাস কথা বলতো, জোয়ারের পানিতে নদী তার নিজস্ব ভাষায় গান গাইতো। কেওড়া, গেওয়া, সুন্দরী আর ম্যানগ্রোভের হারানো জগৎ আজ অনেকটাই স্মৃতি। প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা নিয়েছি অনেক; বিনিময়ে উন্নয়নের নামে তাকে বারবার কুরবানি দিয়েছি।
রেললাইনও এসেছে এই বিসর্জনের পথ ধরে। এসেছে স্টেশন। কিন্তু আমাদের জন্য আসেনি আন্তঃনগর ট্রেন।
চকরিয়া রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালে কখনো কখনো মনে হয়—এ যেন এক অদ্ভুত পরিহাস! মাথার ওপর আকাশ, চোখের সামনে লোহার লাইন, পাশে প্ল্যাটফর্ম, নিয়মিত চলাচল করছে ট্রেন, যাত্রী ওঠা-নামার জন্য সব আয়োজন সবর্তমান। শুধু আন্তঃনগর ট্রেন ছোঁয়ার অধিকার নেই।
ট্রেন আছে। প্রতিদিন আছে। চোখের সামনে দিয়ে যায় বুকের জমিনে কম্পন তুলে যায়। দূর থেকে ভেসে আসে হুইসেলের শব্দ। কোনো কোনো মুহূর্তে মনে হয়, হাতির ডাকের মতো দীর্ঘ হুইসেল যেন চকরিয়ার মানুষের বুকের ভেতরকার অধিকারহীনতার দীর্ঘশ্বাসকে আরও দীর্ঘ করে দিয়ে যাচ্ছে।
ট্রেন চলে যায়। আমরা নীরব তাকিয়ে থাকি। প্রতিটা জানালায় মানুষ দেখি। দেখি যাত্রী। কেউ যাচ্ছে কক্সবাজার, কেউ ফিরছে ঢাকা। কেউ হয়তো চিকিৎসার জন্য ছুটছে, কেউ ব্যবসার কাজে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়, কেউ বহুদিন পর প্রিয়জনের কাছে।
আর আমরা? আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। স্টেশন আছে, ট্রেন আছে—তবু উঠতে পারি না। ধরার অধিকার নেই। অনুমোদন নেই।
যদি একান্তই আন্তনগরে ঢাকা-চট্টগ্রাম যেতে হয়, তবে আমাদের পেছাতে হয় ষাট কিলোমিটার দূরত্ব। চকরিয়া থেকে ষাট কিলোমিটার পথ পেছনে গিয়ে ককসবাজার থেকে ট্রেনে উঠতে হয়। যে ট্রেনে ওঠার জন্য এতটা পথ পেছনে যেতে হয়, সেই ট্রেনই আবার কিছুক্ষণ পর দাপটের সঙ্গে চকরিয়া স্টেশনের বুকের ওপর দিয়ে ছুটে যায়।
কী অদ্ভুত নিয়তি!
এ যেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও ঘরে ঢুকতে না পারার গল্প। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থেকেও পানির অধিকার না পাওয়ার গল্প। নিজের বুকের ওপর রাস্তা বানিয়ে অন্যের যাত্রাপথ সহজ করে দেওয়া, অথচ নিজের পথটুকু আগের মতোই দুর্গম রেখে দেওয়া।
চকরিয়াকে কেন্দ্র করে মাতামুহুরী, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, লামা, আলীকদম ও থানচিসহ বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষের চলাচল ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা জড়িয়ে আছে। বিশাল জনপদের মানুষ প্রতিদিন রেললাইন দেখে। কিন্তু রেলসেবা পায় না।
শিক্ষার্থীরা দেখে ট্রেন ছুটে যায়—তারপর তারা বাসের ধুলোয় পথ মাপে। ব্যবসায়ী দেখে ট্রেন চলে যায়—তারপর পণ্য পরিবহনের বাড়তি খরচ গুনে। চিকিৎসাপ্রত্যাশী অসহায় চোখগুলো দেখে ট্রেন চলে যায়—তারপর সড়কপথে সময়ের সঙ্গে লড়াই করে। একজন মা হয়তো সন্তানের হাত ধরে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হয়তো ভাবেন—এই আন্তঃনগর ট্রেন যদি এখানেই থামত!
ট্রেন চলে যায়। চকরিয়াবাসীর বুকের জমিনের ওপর শব্দ হয়। লোহার চাকার শব্দে কেঁপে ওঠে মাটি। কেঁপে ওঠে প্ল্যাটফর্ম। আলোকিত হয় লৌহলাইন। কিন্তু সেই আলোর রেখা পড়ে না আমাদের ভাগ্যে।
চকরিয়ার মানুষ রেললাইনকে বাধা দেয়নি কখনো। বরং রেললাইনকে জায়গা করে দিতে নিজেদের জমি দিয়েছে, প্রকৃতি দিয়েছে, স্মৃতি দিয়েছে। যে জনপদ রেললাইনের প্রস্তুতকাল থেকে তার সবুজ, বন, নদী, পাহাড় ও জীবিকার অনেক কিছু বিসর্জন দিয়ে উন্নয়নের এই পথ তৈরি করেছে, সেই জনপদের মানুষের কাছে রেলসেবা কোনো বিলাসী চাওয়া নয়; এটি প্রাপ্য। এটি তাদের অধিকার।
রেললাইন আছে। স্টেশন আছে। ট্রেন আছে। শুধু দরকার—একটি পাঁচমিনিটের যাত্রাবিরতি।
কর্তৃপক্ষের সামান্য সদিচ্ছা, রাষ্ট্রের এতটুকুন মনোযোগ আর নীরেট বাস্তবতার সামান্য স্বীকৃতি—এই তিনটি জিনিসই পারে বিশ লাখ মানুষের প্রায় ষাট কিলোমিটারের অতিরিক্ত কষ্ট কমিয়ে দিতে।
একটি ট্রেন থামবে। কিছু মানুষ উঠবে। কিছু মানুষ নামবে।
কেউ পড়তে যাবে, কেউ চিকিৎসা নিতে, কেউ যাবে ব্যবসার কাজে, কেউ প্রিয়জনের সান্নিধ্যে। কেউ হয়তো সমুদ্র গাহনে, কেউ মাতামুহুরীর তীরে, কেউ পাহাড়ের সবুজে হারাবে। আর চকরিয়ার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো প্রথমবারের মতো অনুভব করবে—রেললাইনটি শুধু তাদের বুকের জমিন কেটে হৃদয় রক্তাক্ত করে স্বার্থপরের মতো চলে যায়নি; একদিন সেটি তাদের জীবনেও এসে থেমেছে।
সেদিন হয়তো চকরিয়ার মানুষ ট্রেনের হুইসেল শুনে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলবে না। বলবে—“এই আন্তঃনগর ট্রেন আমাদেরও।”