নিউজ ভিশন ডেস্ক :
কোরবানি শুধু একটি পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার এক মহান প্রতীক। এই মহান ইবাদতকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন মহানবী (সা.)।
তিনি নিজ হাতে কোরবানি করেছেন, উম্মতকে কোরবানির শিক্ষা দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ দেখিয়েছেন। মহানবী (সা.)-এর কোরবানি ছিল নিখাদ ইখলাস, গভীর তাকওয়া ও অসীম দানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মূলত, মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর কোরবানির বিধান অবতীর্ণ হয়। তবে কোরবানি নতুন কোনো বিষয় নয়।
এর ধারাবাহিকতা আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই চালু হয়েছে। পবিত্র কোরআনে কাবিল ও হাবিলের কোরবানির কথা এসেছে। তাঁদের দুজনের কোরবানি থেকে হাবিলের কোরবানি কবুল হয়েছিল। আর মুসলিম সমাজের কোরবানি মিল্লাতে ইব্রাহিমের অনুসরণ।
তাঁর স্মৃতি ধারণের জন্য এ উম্মতের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.)-এর কোরবানির নানাদিক-
১. কোরবানির ফজিলত :
মহানবী (সা.) কোরবানির অনেক মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানি প্রথাটা কী?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এতে আমাদের কী লাভ রয়েছে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে।’ সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! সওফ তথা দুম্বা, ভেড়া ও উটের পশমের বিনিময়ে কি এ পরিমাণ সওয়াব পাওয়া যাবে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হ্যাঁ, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি দেওয়া হবে। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩১২৭)
২. প্রতিবছর মহানবী (সা.)-এর কোরবানি :
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার ১০ বছর জীবনের প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ১৫০৭)
৩. মহানবী (সা.)-এর কোরবানি :
মহানবী (সা.) ঈদগাহেই কোরবানির পশু জবেহ করতেন। আর তিনি উট, গরু ও ভেড়া—সবই কোরবানি করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজেই জবেহ করতেন। প্রখ্যাত তাবেয়ি নাফে (রহ.) ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদগাহে (কোরবানির পশু) জবেহ করতেন ও নাহর (উটের কোরবানি) করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৫৫২)
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, তিনি সাধারণত প্রতিবছর দুটি ভেড়া জবেহ করতেন। একটি নিজের জন্য, অন্যটি উম্মতের জন্য। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করিম (সা.) দুটি ভেড়া কোরবানি দিতেন। আর আমি দুটি ভেড়া কোরবানি দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৫৫৩)
মোটাতাজা ও সুন্দর পশু কোরবানি :
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোরবানি করতে ইচ্ছা করতেন, তিনি চিত্রবিচিত্র, শিংবিশিষ্ট, মোটাতাজা দুটি খাসি-ভেড়া কোরবানি দিতেন। এর একটি তিনি ওই সব উম্মতের জন্য কোরবানি করতেন, যারা আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেবে ও তাঁর দায়িত্ব পালনের কথা স্বীকার করবে। অন্যটি তিনি নিজের ও তাঁর পরিবারের নামে জবেহ করতেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩১২২)
৫. স্ত্রীদের পক্ষ থেকে মহানবী (সা.)-এর কোরবানি :
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে জিলকদের ২৫ তারিখে বের হলাম, তখন আমরা হজের নিয়ত করেছি। যখন আমরা মক্কার কাছে গেলাম তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের মধ্যে যারা ‘হাদি’র প্রাণী আনেনি, তাদের ইহরাম খুলে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তখন আমাদের মধ্যে কোরবানির দিন গরুর গোশত বিতরণ করা হলো। আমি (বাহককে) বললাম, এটা কী? বাহক বলল, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবিদের পক্ষ থেকে গরু কোরবানি করেছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৭০৯)
৬. শরিকানায় মহানবী (সা.)-এর কোরবানি :
বিদায় হজে মহানবী (সা.) ‘দমে শোকর’ হিসেবে ১০০টি উট কোরবানি করেছেন। ৬৩টি উট তিনি নিজে জবেহ করেছেন আর বাকিগুলো আলী (রা.) জবেহ করেছেন। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) একটি উট হাদি দিলেন। আর জবেহতে এক-তৃতীয়াংশে আলী (রা.)-কে শরিক করলেন।’ (ত্বহাবি, হাদিস নং : ৬২৩৬)
৭. কোরবানির গোশত বিতরণ :
মহানবী (সা.) তাঁর কোরবানি থেকে নিজেও খেতেন, পরিবারকেও আহার করাতেন, গরিব ও আত্মীয়স্বজনকেও আহার করাতেন। বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ আবু দাউদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আউনুল মাবুদে এসেছে—‘মহানবী (সা.)-এর নিয়মিত অভ্যাস ছিল কোরবানির গোশত তিনি নিজে খেতেন, পরিবারকে আহার করাতেন ও মিসকিনদের মধ্যে সদকা করতেন আর তিনি উম্মতকেও তার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (আউনুল মাবুদ, খণ্ড ৭, পৃ-৩৪৫)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারকে কোরবানির এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন, প্রতিবেশীদের এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন আর ভিক্ষুকদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ সদকা করতেন।’ (মুগনি, খণ্ড ৯, পৃ-৪৪৯)
এসব বর্ণনার আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, কোরবানির গোশত তিন ভাগ করা মুস্তাহাব। এক ভাগ নিজের ও নিজের পরিবারের জন্য, আরেক ভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য, আরেক ভাগ গরিবদের জন্য। তবে কারো পরিবারের সদস্য বেশি হলে সবটুকু গোশত রেখে দিলেও কোনো ক্ষতি হবে না।
৮. কোরবানির পশু :
কোরবানির জন্তু—উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। অন্যান্য জন্তু দ্বারা কোরবানি নাজায়েজ। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছর পূর্ণ হতে হবে, গরু-মহিষ দুই বছর পূর্ণ হতে হবে, উট পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে। (হিদায়া, খণ্ড ৪, পৃ-১০৩)
সাধারণত যেসব পশু দামি তা-ই উত্তম। দামে সমান হলে যে পশুর গোশত বেশি তা উত্তম। তাতেও সমান হলে যে পশুর গোশত ভালো তা উত্তম। নিতাফ ফিল ফতওয়া কিতাবে এসেছে—‘সবচেয়ে উত্তম হলো উট কোরবানি, অতঃপর গরু (ও মহিষ), অতঃপর ভেড়া (ও দুম্বা), অতঃপর ছাগল। আর উট, গরু (ও মহিষ)-এ সাতজন শরিক হতে পারে, ভেড়া (ও দুম্বা) ও ছাগলে একজনই করতে পারে।’ (নিতাফ ফিল ফতওয়া, খণ্ড ১, পৃ-২৩৮)।
সুতারাং মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কোরবানি আমাদের জন্য এক অনুপম আদর্শ। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখি, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য পশুর রক্ত বা গোশত নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্তরের তাকওয়া ও আত্মত্যাগ। তিনি কোরবানির মাধ্যমে উম্মতকে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা, দানশীলতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিয়েছেন। আজও যদি মুসলমানরা মহানবী (সা.)-এর কোরবানির প্রকৃত চেতনা হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, তবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে ত্যাগ, মানবতা ও ঈমানের সৌন্দর্য আরও বিকশিত হবে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী কোরবানি আদায় করা এবং এর প্রকৃত শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।