ভিস্তিওয়ালা : ভিস্তি হল এক ধরনের বস্তার মত দেখতে ব্যাগ যা ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরি বিশেষ থলে যাকে ‘মশক’ও বলা হত।এতে জল রাখলে ফ্রিজের মতোই ঠান্ডা থাকত।আর স্বয়ং জলদাতা হয়ে এই ভিস্তির জল যারা বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতেন তাদের বলা হত ভিস্তিওয়ালা।
পালকি বেহারা : পালকি ছিল এক সময়ে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন বাহন। মানুষ বহন করার কাজেই এর ব্যবহার হতো। সাধারণত ধনীগোষ্ঠী এবং সম্ভ্রান্ত বংশের লোকেরা এর মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতেন।তখনকার বিয়েতে কনে যাতায়াতে ব্যবহৃত হতো পালকি। কিন্তু এখন তা প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্ত।
ধুনারি : তুলা ধুনা একটি অতি প্রাচীন পেশা। তুলা ধুনা করা পেশাজীবীরা লেপ, বালিশ ও তোষক প্রস্তুত করতেন। অতীতে তারা গ্রামে-শহরে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তুলা ধুনা এবং লেপ, বালিশ ইত্যাদি তৈরির কাজ করতেন। বর্তমানে কিছু কিছু গ্রামাঞ্চলে তাদের দেখা যায়।
গোয়ালা : এক সময় ঢাকা শহরে গোয়ালাদের বসবাস ছিল। তারা গরু লালন-পালন করত এবং শহরবাসীর নিকট দুধ সরবরাহ করত। দুধ সরবরাহ ছাড়াও তারা দুধ দিয়ে ঘি, দই,ছানা তৈরি করত। ঢাকার মিষ্টি তৈরির কারিগরেরা দুধের জন্য গোয়ালাদের উপর দারুণভাবে নির্ভরশীল ছিল।বর্তমানে এই পেশাটি বিলুপ্ত।
সাপুড়ে : নৌকায় করে ভাসমান জনগোষ্ঠীটি সাপুড়ে নামে পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে শহর থেকে এই পেশা হারিয়ে গেছে। তাদের কাজ ছিল বাড়ি থেকে সাপ বের করা এবং সাপের খেলা দেখানো। বিশেষ করে গ্রামে বর্ষার শেষে সাপের প্রকোপ বেড়ে গেলে তখন বাড়ত তাদের কদর। তবে বর্তমানে রাস্তা ঘাটে ছোটো ছোটো বাক্স হাতে সাপ আছে বলে ভয় দেখিয়ে এখন যারা টাকা তোলে তাদের সাপুড়ে বললে ভুল হবে। বরং তাদের পরিচয় ‘বেদে’ হিসেবে।
নৈচাবন্দ ও টিকাওয়ালা : হুঁকা এক সময় খুব জনপ্রিয় ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হুঁকা নামের ধূমপানের বস্তুটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু একসময় ঢাকা শহরেই ছিল উপমহাদেশের বৃহত্তম হুঁকা বানানোর শিল্প। হুঁকার নল যারা বানাতো তাদের বলা হতো ‘নৈচাবন্দ’। আজকের ঢাকার যে টিকাটুলি এলাকা তা ছিল মূলত হুঁকার টিকাদারদের আবাসস্থল। টিকাটুলির এই টিকাদাররা অতিসাধারণ টিকিয়াকে অসাধারণ শিল্পে পরিণত করেছিল। তাদের তৈরি টিকিয়ার কোনো তুলনা ছিল না। এগুলো এতো হাল্কা ও দাহ্য ছিল যে, দিয়াশলাইয়ের একটা শলা দিয়েই অনেকগুলো টিকিয়াতে আগুন ধরানো যেতো।
পাঙ্খাওয়ালা : হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা এই পেশাজীবীরা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।রাজা-জমিদারদের আমলে এই পেশাজীবীদের অনেক কদর ছিল। বড় আকারের তালপাখার নাম ছিল আরানি,ছোটগুলোর নাম আরবাকি।
রানার/ডাকপিয়ন : মোটামুটি মুঘল যুগের সময় থেকেই এই ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা হয়।প্রথমদিকে রাজা- বাদশাদের প্রশাসনিক কাজের জন্য রানারদের নিয়োগ করা হতো।খুব প্রত্যন্ত অঞ্চলেই কাজ করতেন এই রানাররা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করে চিঠির বোঝা পৌঁছে দিতেন অন্য আরেক রানারের হাতে। শুধু চিঠিই নয় বরং খামে করে টাকা পয়সার পরিবহনের কাজও করতেন রানার।
বায়োস্কোপওয়ালা : “কি চমৎকার দেখা গেলো
এইবারেতে আইসা গেলো”
মাথায় ছোট লাল রঙের কাঠের অথবা টিনের বাক্স নিয়ে রংবেরঙের অদ্ভুত পোশাক পরে গ্রামের পথেঘাটে হেঁটে বেড়াত বায়োস্কোপ দেখানোর উদ্দেশ্যে। তাদের হাতে বাজতে থাকা খঞ্জনি বা করতালের শব্দ আর কণ্ঠে ছন্দোময় বাক্য জনতাকে আকৃষ্ট করত। আর পেছনে পেছনে ঘুরত একদল ছেলেমেয়ে।এটিতে গল্পের পাশাপাশি কয়েকটি স্থিরচিত্রও দেখানো হতো। যাকে গ্রামবাংলার সিনেমা হল বলা হয়
পুঁথিকার : পুঁথি-সাহিত্য আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। দিনের আলো নিভে গেলেই কুপি জ্বালিয়ে শুরু হত পুঁথি-পাঠ। পুঁথি-পাঠককে ঘিরে সকলেই জড়ো হতেন এবং মনোযোগ সহকারে শুনতেনপ্রাচীনকালে মূলত প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষেরাই ছিল পুঁথি অনুরাগী।
বাউল :তোমরা একতারা বাজাইয়ো না
দোতারা বাজাইয়ো না…………………….
একদিন বাঙ্গালী ছিলাম রে
বাউল একটি বিশেষ ধরনের লোকসংগীত যা বাংলাদেশের এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের গ্রামীণ এলাকায় প্রচলিত। বাউলদের পোশাক সাধারণত সাদামাটা এবং তারা এক ধরনের সঙ্গীত যন্ত্র ব্যবহার করেন, যা একতারা নামে পরিচিত। বাউল গান সাধারনত একতারা, দোতারা, খমক, বাঁশি ইত্যাদি যন্ত্রের সুরে গাওয়া হত। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র আর প্রযুক্তির ভীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই গোষ্ঠীটি।
কালের বিবর্তন আর প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে মূলত বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে পেশাগুলি।