সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে মেধার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ধৈর্য আর মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা। আলহামদুলিল্লাহ, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (এ-ইউনিট-১৬৫ তম)জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (ডি ইউনিট-৩১১ তম)শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বি ইউনিট-১৯৩ তম)রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (এ ইউনিট-১৫৯৬)এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়(ডি ইউনিট-৯১১ তম) বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমার পরিবারের কাছে, যারা আমার কঠিন সময়ে সবসময় পাশে ছিলেন। আমার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। এসএসসি পরীক্ষার মাত্র ১০ দিন আগে আমি আমার বাবাকে হারাই। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি দিয়েছেন আমার মা। যিনি আমার জীবনের ‘লাকি চ্যাম্প’। একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে আজ আমি যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার মায়ের এবং বড় বোনের।একজন মায়ের পক্ষে এই জার্নিটা মোটেও সহজ ছিল না। আমার জীবনে আল্লাহ তায়ালার পর আমার আম্মু আর বড় বোনের অবদান অপরিসীম। একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উনাদের অকুন্ঠ সমর্থন ছাড়া এই পথ পাড়ি দেওয়া কখনোই সম্ভব হতো না।
আমার ভর্তি যুদ্ধের দিনগুলো:
আমি এসএসসি পরিক্ষা দিয়েছি নিকলী থেকে এবং এইচএসসি কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে। এরপর ভর্তির প্রস্তুতির জন্য আমি ময়মনসিংহে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। প্রথমে ভেবেছিলাম পরিবেশের কারণে এমন হচ্ছে, কিন্তু এক মাস পার হওয়ার পরও আমি সুস্থ হচ্ছিলাম না। আমাদের হাতে সময় খুব কম ছিল, তাই বাড়ি তে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। আমি শুধু আল্লাহর কাছে বলতাম, “আল্লাহ আমাকে সুস্থ করে দাও, রহমত দান করো।” এমন দিনও গেছে যে, ওষুধ খেলে ঘুম আসবে তাই আমি ওষুধ খেতাম না। শুধু মনে মনে বিশ্বাস ছিল,আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব।
আমার এমন দিনও গেছে সন্ধ্যায় পড়তে বসলে ভোরের সূর্য দেখে তবেই উঠতাম। সেই সময়গুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে ফরজ নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজ করে তার রহমত ও অনুগ্রহ চেয়েছি।। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাজটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতাম।আমার জীবনে এই নামাজ অনেকটা ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে।আমার এক বড় ভাই ছিলেন,সাখাওয়াত হোসেন (ঢাবির ইংরেজি বিভাগ)। তিনি যখন আমাকে পড়াতেন, তখন একটা কথাই বারবার বলতেন: তুই শুধু তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে চাইবি। তিনি কখনোই কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। দেখ, আমাকেও তিনি নিরাশ করেননি।’
পরীক্ষার অভিজ্ঞতা ও হতাশা:
প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ছিল। হলে গিয়ে আমি এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম যে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যখন দেখলাম প্রশ্ন বইয়ের বাইরে থেকে এসেছে, আমি রীতিমতো কান্না করে দিয়েছিলাম। তখন ভেবেছিলাম এখানেই হয়তো সব শেষ। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার সময় জার্নি করে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।পরিক্ষার হলে গিয়ে কিছুই মনে করতে পারছিলাম না। জাবিতেও হলো না। আমি এতটাই হতাশ ছিলাম যে রুমে এসে চিৎকার করে কান্না করেছি। আমার আম্মু আর বড় বোন ভিডিও কলে আমার সাথে কান্না করেছে,কোনোমতেই নিজেকে তখন মানাতে পারতেছিলাম না।এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে আমার চোখে পানি চলে আসছে। আমার আম্মু শুধু একটা কথাই বলতেন, “আমি জানি আমার মেয়ে পারবে ইনশাআল্লাহ, আমার আল্লাহ আমার মেয়েকে কাঁদাবেন না।” আজ যেসব মেধাতালিকায় আমার নাম দেখছেন, এগুলোর পরীক্ষা আমি দিতেই চেয়েছিলাম না,সবই আমার আম্মুর জোরাজুরিতে দেওয়া। আজ যে আমি এই সাফল্যের কথা লিখতে পারছি, তার পুরো কৃতিত্ব আমার মায়ের। তিনি আমার জীবনের সেরা মা।
ছোট ভাই-বোনদের জন্য কিছু নির্দেশনা:
১. এখন যেহেতু সময় খুব কম, তাই টপিক ধরে পড়াশোনা করবে।
২. সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান শেষ করবে।
৩. ইংরেজির মেমোরাইজিং পার্ট খুব ভালো করে শেষ করবে।
৪. বাংলার মেমোরাইজিং পার্টও সমান গুরুত্ব দিয়ে শেষ করবে।
ভর্তিচ্ছুদের প্রতি আমার উপদেশ:
১. যদি বাড়ির আশেপাশে ভালো কোচিং থাকে, তবে সেখানেই ভর্তি হওয়া ভালো (মনে রাখবে, কোচিং কখনো কাউকে চান্স পাওয়াই দেয় না, নিজের পড়াশোনাই আসল)।
২. নিজের ডেডিকেশন এবং পরিবারের সমর্থন এই সময়ে খুব জরুরি।
৩. মেধার চেয়েও ধৈর্য এখানে বেশি দরকার।
৪. পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।
পরিশেষে বলবো, সবাই ‘স্মার্ট ওয়ার্ক’ করবে। জীবনের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করো না। আমার মনে হয়, বেশি বেশি পরীক্ষা দেওয়াটা আমার সাফল্যের জন্য খুব কার্যকর ছিল। সবাই আমার জন্য এবং আমার আম্মুর জন্য দোয়া করবেন।
-ফারিয়া ইসলাম
শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।