মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত চাম্পারাই চা-বাগানে বেড়ে ওঠা পল্লী চৌহানের জীবনে এসেছে নতুন সম্ভাবনার ছোঁয়া। একসময় অনিয়মিতভাবে সেলাইয়ের কাজ করে মাসে প্রায় ৫০০ টাকা আয় করতেন তিনি। এখন বাটিক ও ব্লক প্রিন্টিংয়ের কাজ করে মাসে প্রায় ২ হাজার টাকা আয় করছেন। তাঁর স্বপ্ন—নিজের একটি উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং তাঁর মতো আরও নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি করা।
চাম্পারাই চা-বাগানে প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় চা-পাতা সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। পিঠে ঝুড়ি নিয়ে সারি সারি চা-গাছের ফাঁকে কাজ করেন শ্রমিকেরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা-পাতা তোলাই এখানকার শ্রমিক পরিবারের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। এই পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন ২৪ বছর বয়সী পল্লী চৌহান।
ছোটবেলা থেকেই পল্লী দেখেছেন চা-বাগানের নারীদের কঠোর পরিশ্রম। অনেকের বিভিন্ন কাজের দক্ষতা থাকলেও সেই দক্ষতাকে আয়ের উৎসে পরিণত করার সুযোগ সীমিত। চা-বাগানের প্রত্যন্ত অবস্থান, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে নতুন দক্ষতা শেখার সুযোগও সহজে পাওয়া যায় না।
পল্লীর নিজেরও ছিল কিছু করার আগ্রহ। হাতে-কলমে শেখা সেলাইয়ের কাজ দিয়ে প্রতিবেশীদের ছোটখাটো অর্ডার নিতেন। কাজ পেলে কিছু আয় হতো। মাসে প্রায় ৫০০ টাকা। তবে আয় ছিল অনিয়মিত। ফলে নিজের প্রয়োজন মেটানো কিংবা পরিবারে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা করা কঠিন ছিল।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের মার্চে পল্লীর সামনে নতুন একটি সুযোগ আসে। ‘নাগরিক সমন্বয়’ প্রকল্পের উদ্যোগে স্থানীয় সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে চাম্পারাই চা-বাগানে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
বাগানের ভেতরেই ছয় দিনব্যাপী বাটিক ও ব্লক প্রিন্টিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে অংশ নেন ৩০ জন নারী। তাঁদের একজন পল্লী চৌহান।
প্রশিক্ষণে পল্লী বাটিক ও ব্লক প্রিন্টিংয়ের বিভিন্ন কৌশল শেখার পাশাপাশি নিজের দক্ষতাকে কীভাবে আয়ের কাজে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে ধারণা পান। অর্ডার নেওয়া, পণ্য তৈরি এবং কাজের মাধ্যমে আয় করার বিষয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।
প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর ঘরে বসেই কাজ শুরু করেন পল্লী। আশপাশের চা-বাগান, শ্রীমঙ্গলসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে তৈরি করতে থাকেন ব্লক প্রিন্টের বিভিন্ন সামগ্রী।
শুরুটা ছোট হলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কাজের পরিধি। একসময় যে কাজ থেকে মাসে প্রায় ৫০০ টাকা আয় হতো, এখন তাঁর মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার টাকা।
পল্লীর কাছে এই আয় শুধু টাকার হিসাব নয়। নিজের শ্রমের মূল্য পাওয়া এবং নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারার আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয়েছে তাঁর মধ্যে।
পল্লী চৌহান বলেন, প্রশিক্ষণের আগে আমি ভাবতাম, নিজের দক্ষতা দিয়ে নিয়মিত আয় করা হয়তো আমার জন্য কঠিন। প্রশিক্ষণের পর বুঝতে পেরেছি, আমি চাইলে নিজের কাজ দিয়েই এগিয়ে যেতে পারি। এখন আমার স্বপ্ন নিজের একটি উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং আমার মতো আরও নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি করা।
পল্লীর এই অগ্রগতি একই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া অন্য নারীদেরও উৎসাহিত করছে। কেউ আয় শুরু করেছেন, আবার কেউ নিজের উদ্যোগ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একজনের অগ্রগতি অন্যদের সামনে সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বাটিক ও ব্লক প্রিন্টিংয়ের মধ্যেই থেমে থাকতে চান না পল্লী। নিজের দক্ষতা আরও বাড়াতে বর্তমানে Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program (SICIP)-এর আওতায় ফ্যাশন গার্মেন্টস বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তিনি।
নতুন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজের কাজকে আরও বড় পরিসরে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন পল্লী। ভবিষ্যতে নিজের একটি উদ্যোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি চা-বাগানের আরও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি।
পল্লী চৌহানের গল্প তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ নিয়ে আয় বাড়ানোর গল্প নয়। এটি একজন চা-বাগানের তরুণীর নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
চা-বাগানের সীমিত পরিসর থেকে শুরু করে এখন নিজের কাজ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন পল্লী। তাঁর পথচলা দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে প্রান্তিক এলাকার নারীরাও নিজেদের দক্ষতাকে আয়ের পথে কাজে লাগাতে পারেন।
চাম্পারাই চা-বাগানের পল্লী চৌহানের সামনে এখন নতুন পথ। নিজের উদ্যোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি তাঁর মতো আরও নারীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করাই তাঁর পরবর্তী স্বপ্ন।