স্টাফ রিপোর্টারঃ
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় ডুবছে হাওরের সোনালী ফসল, কাঁদছে কৃষক। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলোও চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) উপজেলার বিভিন্ন হাওরে অতিবৃষ্টিও ঢলের পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে সোনালী ফসলগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শুকানোর জন্য খলায় রাখা ধান নষ্ট হচ্ছে। ত্রি-মূখী সংকটে কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে৷ বৃষ্টির কারণে জমির পাকা ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। আর কেটেই বা কি হবে? রোদ না ছাড়া ধান শুকানো সম্ভব হবে না। এতে কাটা ধান খলায় পঁচে নষ্ট হবে। যেগুলো কাটা ছিল সেগুলোই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিক সংকট অনেকটা পিছিয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ তৈরি ও পানি নিস্কাশনে সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবেই এদুরবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জে গত সোম ও মঙ্গলবার দুই দিনে মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৩৭ মিলিমিটার। একই সঙ্গে নদীতে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল নামছে। এতে কৃষকের চোখের সামনেই জমির ধান তলিয়ে যাচ্ছে।
কৃষকেরা বলছেন, টানা বৃষ্টিতে অনেক হাওরে আগেই জলাবদ্ধতা ছিল। অনেক ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। ধান কাটা-মাড়াই, শুকানোর সুবিধা নেই। এর মধ্যে ধান কাটা শ্রমিকের সংকট আছে। হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটার অনুপযোগী। ধানের মায়ায় বন্যা, ভারী বৃষ্টি আর বজ্রপাত আতঙ্ক মাথায় নিয়ে হাওরে যাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলছেন, এখন পর্যন্ত শান্তিগঞ্জে হাওরের ৬১ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলায় জামখলা ও খাই হাওরের ৩ টি স্হায়ী বাঁধ প্রকল্পে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করে পাউবো। উক্ত বাঁধের কাজ ২০২৫ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড আরো এক বছর সময় বৃদ্ধি করে কিন্তু বর্ধিত সময়েও শেষ হয়নি ৬০ ভাগ কাজ।
তাছাড়া কাবিটা স্কীম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাওর এলাকায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ মেরামত ও সংস্কার স্কীম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৭ টি হাওরে ৬৭ টি পিআইসি গঠন করা হয়। সরকার হাওর রক্ষা বাঁধ তৈরি করতে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ১২ কোটি টাকার উপরে বরাদ্দ প্রদান করে কিন্তু এখানেও ৩০-৩৫ ভাগ কাজ হয়েছে মর্মে তথ্য পাওয়া যায়। অক্ষত বাঁধে অতিরিক্ত বরাদ্দ, অপ্রয়োজনীয় পিআইসি অনুমোদন, পুরাতন বাঁধের মাটি মেশিন দিয়ে কুড়ে জাগার মাটি জাগাত ফেলে পরিপাটি করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ জানতে পারেনা শত কোটি টাকার প্রকল্প পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় সুনামগঞ্জ চলছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে আগামী তিন দিনও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার জামখলা হাওরের কৃষক বিলাল হোসেনসহ অনেক কৃষক বলেন, হাওরের জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকের প্রায় ৫০% বোরো পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকের আহাজারি দেখে দুঃখ লাগে। তাই কৃষকের এহেন অবস্থায় পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের
দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি বলেন, আমি চার কেদার জমি রোপন করেছিলাম কিন্তু এক কেদার জমির ধানও কাটতে পারিনি। আর কাটতে পারব না। পানির অনেক নিচে চলে গেছে। এখন বাড়ীর নিকটেই পানি।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন শান্তিগঞ্জ উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন,আমাদের কৃষকেরা অস্বস্তিতে দিনাতিপাত করছেন। সারা বছরের কষ্টের ফসল জলাবদ্ধতায় রেখে কৃষকের শান্তুি নেই। পাউবোর পরিকল্পনা সঠিক নয়। তাই
অপরিকল্পিত পিআইসির কার্যক্রম জলাবদ্ধতার মূল কারণ। কৃষকের ৬০ ভাগ ধান জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত। তাদের কন্ঠে এখন হাহাকার।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারী প্রকৌশলী (বাপাউবো) মনিরুজ্জামান মোহন বলেন- শান্তিগঞ্জ উপজেলায় সব কয়টি পিআইসির বাঁধের অবস্থা ভাল। কোন বাঁধে ঝুঁকি নেই। স্থায়ী বাঁধগুলোর কাজ নির্ধারিত সময়ে সম্ভব হবে না। যেখানে ত্রুটি ছিল আমরা সেখানে কাজ করতেছি।যেখানে সমস্যা আমরা আপনাদের মাধ্যমে জানতেছি এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আহসান হাবিব বলেন, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ৬১ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে। বাকি ৩৯ ভাগ এর মধ্যে ৪৫০ হেক্টর পানির নিচে রয়েছে। আমরা সবার সহযোগিতা চাইতেছি। আজ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সহ সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় পত্র মাধ্যমে অবহিত করেছি। আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে সব ধান কাটা সম্ভব হবে। উপজেলায় ধান শুকানোর জন্য একটি মিশিন রয়েছে। আগামীতে আরো কয়েকটি মিশিনের জন্য প্রস্তাব করা হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বিভাগ-২(বাপাউবো) এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ এমদাদুল হক বলেন, শান্তিগঞ্জে ৬৭ টি পিআইসির কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এগুলোতে আমাদের সার্বক্ষনিক মনিটরিং ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। কোন সমস্যা অবহিত হলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারব।
স্থায়ী বাঁধ সম্পর্কে বলেন, এখন ও বর্ধিত সময় বাকি আছে। পানি কমলে কাজ করতে পারব নতুবা বিহিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে কোন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ নেই। পানির ওয়াটার লেভেল অতিক্রম করলে আমরা বুঝতে পারব কোন বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। সদ্য আবহাওয়ার প্রাপ্ত প্রতিবেদনে অনুযায়ী আগামী ৩ দিন ভারী থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হবে। ৩য় দিনে সুনামগঞ্জে বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে।