ম্যাক্সের ‘বালু সাম্রাজ্য’ ঘিরে বিতর্ক: পরিবেশ অধিদপ্তরের ৩ কোটি টাকার দণ্ড
- আপডেট সময় : ১০:৩৩:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬ ৪৭ বার পড়া হয়েছে
পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই মহেশখালী চ্যানেল ও কোহেলিয়া নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে ৩ কোটি টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু জরিমানার এই ঘটনা কেবল পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর আড়ালে উঠে এসেছে শত শত কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ।
গত ২ জুন অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আর্থিক দণ্ড আরোপ করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় পরিবেশ ছাড়পত্র ও পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চলছিল। বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহেশখালী চ্যানেল ও কোহেলিয়া নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এভাবে নিয়ন্ত্রণহীন বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, উপকূলীয় বেড়িবাঁধ এবং আশপাশের জনপদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
১৩ শর্তের মধ্যে মানা হয়েছে মাত্র একটি!
অভিযোগ রয়েছে, টোকিও কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত টোকিও-ম্যাক্স জেভিকে ১৩টি শর্তে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলেও সরকারি কোষাগারে রয়্যালটি জমা দেওয়া ছাড়া বাকি অধিকাংশ শর্তই উপেক্ষা করা হয়েছে।
অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী ১৮ ইঞ্চি সাকশন ড্রেজার ব্যবহার করার কথা থাকলেও বাস্তবে ১২ ইঞ্চি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদিত প্রযুক্তি ব্যবহার না করায় পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পরিবেশ ছাড়পত্র ও ইআইএ বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এসবের জন্য কোনো আবেদনই করেনি।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, “পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া এ ধরনের বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কোনো আবেদন করেনি। আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।”
রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগে নতুন বিতর্ক
বালু উত্তোলনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বালু উত্তোলনে এমন একটি আর্থিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রের পরিবর্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই বেশি সুবিধা পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতি ঘনফুট বালুর বাজারমূল্য ৬ টাকা ৯৪ পয়সা হলেও সরকার পাচ্ছে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা। বিপরীতে ড্রেজিং ব্যয় বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ১০০ থেকে ১৪০ কোটি ঘনফুট বালুর হিসাব ধরলে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলেও তাদের প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, পরিবেশ ছাড়পত্র, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মতামত এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে বিশেষ সুবিধায় টোকিও-ম্যাক্স জেভিকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ মান্নান বলেন, “ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন বিধি অনুযায়ী কাজ করেছে।”
তবে প্রকল্পে মোট কত বালু লাগবে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কী দামে তা সরবরাহ করবে—এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলেও তিনি স্বীকার করেন।
উন্নয়নের আড়ালে পরিবেশ ও অর্থনীতির ঝুঁকি?
১২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন হাঁসের দীঘি- মাতারবাড়ী সংযোগ সড়ক দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। কিন্তু প্রকল্পের জন্য বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগ এখন উন্নয়নের স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বালু উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে ভাঙন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং সামুদ্রিক পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
টিআইবির তদন্ত দাবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “যদি সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো গোষ্ঠীকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির গুরুতর উদাহরণ। বিষয়টি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।”
পরিবেশ আইন লঙ্ঘন, শত কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি, অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এবং উপকূলীয় পরিবেশের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে মহেশখালীর বালু উত্তোলন ইস্যু এখন স্থানীয় সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত সত্য উদঘাটনে উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সময়ের দাবি।













