রাফিউল ইসলাম রাব্বি, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট:
ভোর হওয়ার আগেই পাম্পের সামনে দীর্ঘ সারি। মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক আর সিএনজির লাইনে কয়েক কিলোমিটার রাস্তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তেলের দাম চড়া থাকা সত্ত্বেও এখন বাজারে টাকা দিয়েও তেল মিলছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না প্রয়োজনীয় জ্বালানি। রাজধানীসহ সারাদেশে তেলের এই তীব্র সংকট এখন সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, অপচয় হচ্ছে শ্রমঘণ্টা
তেলের পাম্পগুলোতে এখন কর্মব্যস্ত মানুষের দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস। একজন ট্রাক চালক দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কিত। অফিসগামী মানুষ মোটরসাইকেল নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে হারচ্ছেন মূল্যবান কর্মঘণ্টা। সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই বলা হলেও, মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অপেক্ষার কারণে স্থবির হয়ে পড়ছে দেশের সরবরাহ চেইন (Supply Chain)।
কৃত্রিম সংকট নাকি অব্যবস্থাপনা
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বাজারে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। অনেক পাম্প মালিক তেল মজুদ করে রাখছেন অথবা সরকারের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো ত্রুটি রয়েছে। যখনই তেলের অভাব দেখা দেয়, তখনই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—আমদানির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? সরকারের পক্ষ থেকে স্বচ্ছ ব্যাখ্যার অভাব এই গুজবকে আরও ডালপালা মেলতে সাহায্য করছে।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ
পাম্পের লাইনে দাঁড়ানো এক ভুক্তভোগীর মতে:
> “আমরা দাম বেশি দিয়েও তেল কিনতে রাজি আছি, কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে দিনের অর্ধেক সময় নষ্ট করার বিলাসিতা আমাদের নেই। গাড়ি না চললে ইনকাম বন্ধ, আর পাম্পে তেল না থাকলে গাড়ি বন্ধ। আমরা এখন উভয় সংকটে।”
>
যানজট ও জনদুর্ভোগ
তেলের পাম্পগুলোর সামনে এই দীর্ঘ লাইনের কারণে প্রধান সড়কগুলোতে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট। অ্যাম্বুলেন্স থেকে শুরু করে জরুরি সেবার যানবাহনগুলোও এই কৃত্রিম জটে আটকা পড়ছে। ট্রাফিক পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই জট খোলার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও বাস্তবতা
জ্বালানি বিভাগ থেকে বারবার ‘সব স্বাভাবিক’ বলে আশ্বস্ত করা হলেও পাম্প মালিকরা বলছেন চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। তেলের এই অভাব কেবল ব্যক্তিগত যানবাহনেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কলকারখানাতেও।
আমাদের পর্যবেক্ষণ:
সরকারের উচিত এখনই সত্য তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা। যদি আমদানিতে সমস্যা থাকে, তবে তা স্বীকার করে রেশনিং বা বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবা উচিত। দীর্ঘ লাইন মানে কেবল তেলের অভাব নয়, এটি সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এই লাইন যতো দীর্ঘ হবে, সরকারের ওপর জনগণের আস্থার সংকট ততোই গভীর হবে।