প্রযুক্তি আমাদের জীবনে যেভাবে ঢুকে পড়েছে, তা একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অন্যদিকে আবার এক অদৃশ্য অভিশাপও বটে। ডিজিটাল বিপ্লব আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজতর করেছে, কিন্তু সেই সঙ্গে জন্ম দিয়েছে নতুন নতুন সমস্যা—তারই একটি ভয়ংকর রূপ হলো অনলাইন জুয়া।
আগে জুয়া ছিল নির্দিষ্ট কিছু জায়গা বা ক্লাব কেন্দ্রিক। সেখানে যাওয়ার জন্য একটি সামাজিক ভয় ছিল, আত্মসম্মানের প্রশ্ন ছিল, আইনগত ভয়ও কাজ করত। কিন্তু আজকের দিনে স্মার্টফোনে মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই মানুষ প্রবেশ করে ফেলছে এক বিশাল ভার্চুয়াল জুয়ার দুনিয়ায়। এখানকার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এর অদৃশ্যতা ও সহজলভ্যতা।
যেভাবে মানুষ আকৃষ্ট হয়:
অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো সহজে ‘বড় অঙ্কের টাকা’ জেতার প্রলোভন। প্রথম দিকে খেলোয়াড়কে কিছু টাকা জেতাতে দেওয়া হয়—এটা এক ধরনের কৌশল, যাকে বলা হয় ‘হুকিং’। এরপর ধীরে ধীরে সে চক্রের মধ্যে ঢুকে পড়ে। অনেকে মনে করে, “এবার যদি আরেকবার খেলা যায়, সব হারানো টাকা আবার ফিরে আসবে।” এই মনস্তত্ত্বই একজন মানুষকে বারবার চেষ্টা করতে বাধ্য করে।
যাদের মধ্যে ভয়াবহ বিস্তার:
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে এই আসক্তি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গেমের মধ্যেই বিভিন্ন “বেটিং অপশন” ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইউটিউবে দেখা যাচ্ছে কিছু তথাকথিত “গেমিং ইনফ্লুয়েন্সার” নিজেই অনলাইন ক্যাসিনো খেলছে এবং জয়ী হওয়ার ভান করে দর্শকদের উৎসাহিত করছে।
কেউ কেউ শুরু করে ‘ক্রিপ্টো জুয়া’ দিয়ে, কেউ আবার ফেসবুক বা টেলিগ্রাম গ্রুপে গিয়ে ‘বেটিং টিপস’ নেওয়ার মাধ্যমে। এর ফলে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার টাকা, টিউশন ফি এমনকি অভিভাবকদের জমানো সঞ্চয় পর্যন্ত জুয়ার পেছনে খরচ করে ফেলছে।
পরিণতি:
অনলাইন জুয়ার আসক্তির ফল শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়; মানসিক স্বাস্থ্যেও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। অবসাদ, নিদ্রাহীনতা, আত্মবিশ্বাস হারানো, হতাশা—সব মিলিয়ে একজন মানুষ ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়ে। অনেক সময় পরিবার ভেঙে যায়, আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটে।
আইন ও বাস্তবতা:
বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে জুয়া নিষিদ্ধ হলেও অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে এখনো কোনও সুস্পষ্ট, কার্যকর নীতিমালা গড়ে ওঠেনি। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিছু ওয়েবসাইট ব্লক করলেও, জুয়ার সাইটগুলো প্রায়ই নতুন ঠিকানায় চলে যায় বা ভিপিএন ব্যবহার করে সহজেই খুলে ফেলা যায়। ফলে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে পড়ে আরও কঠিন।
সমাধানের পথ:
১. আইনের আধুনিকায়ন: অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে একটি আলাদা ডিজিটাল আইন প্রণয়ন জরুরি।
২. প্রযুক্তি নির্ভর মনিটরিং: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অনলাইন বেটিং সাইটগুলো চিহ্নিত করে ব্লক করা যেতে পারে।
৩. শিক্ষা ও সচেতনতা: স্কুল-কলেজে অনলাইন আসক্তি ও জুয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
৪. পারিবারিক নজরদারি: অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নজর রাখা এবং নিয়মিত মানসিক যোগাযোগ বজায় রাখা।
লেখক: আল আমিন
শিক্ষার্থী, পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয়,সিলেট।