ঢাকা: মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এখন মাদকের এক বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন চলছে। প্রায় সাড়ে ১৭ একর আয়তনের এই বিহারি পল্লিতে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিলের মতো মাদকদ্রব্য প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অবৈধ ব্যবসার বার্ষিক আয় দেড়শ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। রাজনৈতিক মদদ এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে মাদক গডফাদাররা নির্বিঘ্নে তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
নতুন গডফাদারদের হাতে মাদকের নিয়ন্ত্রণ
ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার নেতৃত্ব একসময় দুই প্রভাবশালী গডফাদারের হাতে ছিল, যাদের মৃত্যুর পর এখন প্রায় এক ডজন ছোট-বড় মাদক সম্রাট তাদের রাজত্ব চালাচ্ছে। এদের অধীনে ৫০০-এরও বেশি খুচরা বিক্রেতা রয়েছে। এসব গডফাদারদের মধ্যে রয়েছে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, টুনটুন, উলটা সালাম, হেরোইন সীমা এবং ইমতিয়াজের মতো কুখ্যাত নাম। মাদকের এই সাম্রাজ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষ হয়, যার ফলে গত এক বছরে আটজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে।
অপরাধের কালো ছায়া: মাদকের পাশাপাশি মানবপাচার ও অন্যান্য অপরাধ
মাদকের এই বিষাক্ত পরিবেশে তরুণ-তরুণীদের জোর করে মাদক এবং দেহ ব্যবসার মতো অনৈতিক কাজে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পের প্রায় দেড় হাজার অপরাধী মাদক ব্যবসার পাশাপাশি অস্ত্র কেনাবেচা, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের এই কর্মকাণ্ড ক্যাম্পের ৫০ হাজার নিরীহ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসনের সঙ্গে গোপন আঁতাতের কারণেই এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অভিযান শুরুর আগেই গডফাদারদের কাছে খবর পৌঁছে যায়।
প্রশাসনের ব্যর্থতা ও আইনি দুর্বলতা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও চিহ্নিত গডফাদাররা প্রায়শই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আর যারা ধরা পড়ে, তারা দুর্বল এজাহার বা আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে খুব সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসে। ফলে তারা আবার পুরোদমে মাদক ব্যবসায় সক্রিয় হয়। সমাজ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, কেবল পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে এই চক্র ভাঙা সম্ভব।
ডিএমপি তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান অবশ্য মাদকের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা জানিয়েছেন। তবে জামিনে বেরিয়ে আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ।
মিনি বারে নারী ও মাদক ব্যবসা
মাদক ব্যবসায়ীরা ক্যাম্পের কিছু খুপরি ঘরকে মিনি বারে পরিণত করেছে, যেখানে তারা মাদক সেবন করে এবং তরুণীদের জোর করে যৌন ব্যবসায় বাধ্য করে। এই ধরনের অন্তত ১০টি মিনি বারের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে বুনিয়া সোহেলের ৫টি এবং পিচ্চি রাজার ৪টি রয়েছে। এই সব অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে নিরীহ পরিবারগুলো চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে।