কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার আলহাজ্ব কবির আহমেদ চৌধুরী বাজারের ছালেহা কবির প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন খেলার মাঠটি
দীর্ঘ তিন দশক ধরে দখল ও অবহেলায় পড়ে থাকা আছে।এই শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠটি পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন।বর্তমানে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় যুবদল নেতা কামরান জাদিদ মুকুটের যৌথ উদ্যোগে মাঠটি দখলমুক্ত ও সংস্কারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে স্থানীয় ক্রীড়াবিদ, শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে আনন্দ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রায় একশ বছর ধরে উন্মুক্ত থাকা এই ঐতিহাসিক মাঠটিতে নিয়মিত ক্রিকেট ও ফুটবল টুর্নামেন্টসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং জুনিয়র পর্যায়ের টুর্নামেন্টেও মাঠটি ব্যবহার করা হতো। এমনকি বিভিন্ন সময় জানাজার নামাজও অনুষ্ঠিত হয়েছে এখানে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাঠটির ৯৪ শতক জমি বিএস ৪৮৬ খতিয়ানের ৪৬৪৯ দাগে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। তবে প্রায় ৩০ বছর আগে মাঠের বিভিন্ন অংশ দখল করে দোকান ও মার্কেট নির্মাণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে মাঠটির স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হয়। দীর্ঘদিন ধরে খেলাধুলার পরিবেশ না থাকায় স্থানীয় শিশু-কিশোর ও তরুণেরা একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠের জমি দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে একসময় প্রাণচঞ্চল এই মাঠ ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত অবস্থায় চলে যায়। বিশেষ করে গত প্রায় ৩০ বছর ধরে মাঠটিতে নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।
এ অবস্থায় মাঠটি দখলমুক্ত করে আগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেন পেকুয়া উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কামরান জাদিদ মুকুট। তাঁর লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেয়। গত কয়েক দিন ধরে মাঠটি সংস্কার ও খেলার উপযোগী করার কার্যক্রমও চলছে।
সর্বশেষ রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম, পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান, যুবদল নেতা কামরান জাদিদ মুকুট এবং স্থানীয় সাংবাদিকেরা মাঠটি পরিদর্শন করেন। এ সময় মাঠের জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
পরিদর্শনকালে মাঠের কিছু অংশের দখল নিয়ে আপত্তি ও বাধার মুখে পড়তে হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। বিএনপি নেতা সরওয়ার আলমসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে তাঁদের দখলে থাকা জমির বৈধ কাগজপত্র নিয়ে হাজির হতে বলা হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দখলে থাকা দোকান ও মার্কেটের বৈধ কাগজপত্র থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উপজেলা ভূমি অফিসে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ছালেহা কবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য এমরান জাদিদ বলেন, “একটি খেলার মাঠ শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়, এটি শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দীর্ঘদিন মাঠটি ব্যবহার করতে না পারায় নতুন প্রজন্ম খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমরা চাই, সরকারি জমির সঠিক সীমানা নির্ধারণ করে মাঠটি দখলমুক্ত করা হোক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হোক। প্রশাসনের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থী ও তরুণদের পাশাপাশি পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।
মাঠটির ঐতিহ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমিদার পরিবারের সদস্য ফরহাদ চৌধুরী বলেন, “আমাদের দাদা কবির আহমদ চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত পেকুয়া বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী মাঠটি ফিরে পাওয়ার উদ্যোগ দেখে আমরা আনন্দিত। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি খাসজমি যাঁরা দখলে রেখেছেন, তাঁদের প্রতি অনুরোধ—সরকারি নির্দেশনা মেনে মাঠটি উন্মুক্ত করার কাজে সহযোগিতা করুন।
পেকুয়া উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কামরান জাদিদ মুকুট বলেন, পেকুয়া বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী মাঠটি দীর্ঘ ১৮ থেকে ৩০ বছর ধরে কার্যত পরিত্যক্ত ছিল। চারপাশের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় মাঠটি খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাজারের আশপাশে উন্মুক্ত খেলার মাঠের সংকট রয়েছে। ফলে শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। জনস্বার্থে মাঠটির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতায় কাজ করছি। মাঠটি সবার জন্য উন্মুক্ত ও খেলাধুলার উপযোগী করাই আমাদের লক্ষ্য।
পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, “মাঠটি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। জমির দখলসংক্রান্ত বিষয়টি যাচাই করে উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে মাঠটি দখলমুক্ত ও উন্মুক্ত করার কার্যক্রম চলছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম বলেন, “মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে খেলাধুলার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এটিকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যে আমরা পরিদর্শন করেছি। জমির দখলসংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বৈধ কাগজপত্র থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভূমি অফিসে জমা দিতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা চাই, মাঠটি আবারও সবার খেলাধুলার উপযোগী হয়ে উঠুক।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের উদ্যোগে মাঠটির জমির সীমানা নির্ধারণ, দখলসংক্রান্ত জটিলতার নিষ্পত্তি ও সংস্কারকাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে। এতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা খেলাধুলার পরিবেশ ফিরে আসবে এবং শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মাঠটি নতুন প্রজন্মের জন্য আবারও উন্মুক্ত হবে।