ঢাকা১৮ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বন্যা আক্তারের লেখা “টিকটকের জোয়ারে নতুন প্রজন্ম”

প্রতিবেদক
নিউজ ভিশন

মার্চ ৩, ২০২১ ৫:৩৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সুস্থ সুন্দর জীবনের জন্য বিনোদন অত্যাবশ্যক। কিন্তু এই বিনোদন যদি হয় অসুস্থ আর আতংকের কারণ তবে তা একটি সভ্য সমাজের জন্য কতোটুকু যৌক্তিক?

ইন্টারনেট দুনিয়ায় বর্তমানে জনপ্রিয়তার শীর্ষে টিকটক। জনপ্রিয় এই অ্যাপটির যাএা শুরু হয় ২০১৬ সাথে, চীনে। উদ্ভাবক ঝাং ইয়েমিং। চীনা ভাষায় একে বলে ডুইয়িন। যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় গলা কম্পন ছোট ভিডিও। অ্যাপটির স্লোগান হলো,মেক ইওর ডে,রিয়েল পিপল,রিয়েল ভিডিও। জনপ্রিয় এই অ্যাপটির উদ্দেশ্য ছিলো একাকিত্ব আর হতাশায় থাকা মানুষ কে বিনোদন দেওয়া। অ্যাপটি এশিয়ার নেতৃস্থানীয় ছোট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম। এবং বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় সঙ্গীত ভিডিও সম্প্রদায় হিসেবে স্বল্প সময়ে ক্রমবর্ধমান অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০১৮ সালে অ্যাপটি আনুমানিক ডাউনলোড করা হয় ৪৫.৮ মিলিয়ন। ২০১৯ সালে ইন্সটাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাট কে পেছনে ফেলে বিশ্বের চতুর্থ সর্ব্বোচ্চ ডাউনলোডকারী অ্যাপে পরিণত হয়। এবং বর্তমান সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০ কোটিরও অধিক। ১৫৫ টি দেশে মোট ৪০ টি ভাষায় চলে এটি।ব্যবহারকারীদের ৪১%এর বয়স ১৬-২৪বছর।

 

অ্যাপটির বহুল জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে এর সহজলভ্যতা এবং স্বল্প সময়ে পরিচিতি লাভের আশা। টিকটকে মাএ ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও ধারণ করে পরিচিতি পাওয়া যেনো অনেকের কাছেই আলাদীনের চেরাগ। অ্যাপটি ডাউনলোড করে একটি একাউন্ট তৈরি করে খুব সহজেই ভিডিও শেয়ার করা যায় মূহুর্তেই। একটি স্মার্ট ফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগেই করা যায় টিকটক ভিডিও। তারকাখ্যাতি বা সেলিব্রেটি হতে প্রয়োজন হয় না কোনো টিভি চ্যানেলে অডিশন দেওয়ার। এই প্রসঙ্গে জনপ্রিয় টিকটকার রাসয়াত রহমান জিকো (মূলত লেখক, বছর দুয়েক হলো যুক্ত হয়েছেন টিকটকে)বলেন, “টিকটক খুব সহজ। ধরুন একটি বই লিখতে দুই তিন মাস কষ্ট করে রাত জেগে লিখতে হয়। তারপর বই প্রকাশ করে পাঠক পড়ার পর আমি তার ফিডব্যাক পাচ্ছি। কিন্তু টিকটকের ক্ষেত্রে আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন টিকটক করবেন, ১মিনিটে ভিডিও তৈরি করে, শেয়ার করলেই আপনি সবার কাছে সেটি রিচ করতে পারবেন, সাথে সাথেই পাচ্ছেন প্রতিক্রিয়া।” কোভিড ১৯, বৈশ্বিক মহামারীর সময় পৃথিবীতে যখন নিস্তব্ধতা দেখা দেয়, কর্মব্যস্ত মানুষ যখন দিনের পর দিন লকডাউনে অবসর দিন যাপন করছে, বিনোদন হিসেবে টিকটক অ্যাপ টি চলে আসে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে সম্পৃক্ততা গড়ে তুলেছে টিকটক। বড় বড় তারকা, ডাক্তার, লেখক, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ে চা ওয়ালা কে ও দেখা যায় টিকটকে। সব শ্রেণীর মানুষের সাথে রয়েছে সব বয়সের মানুষও। ভারতীয় অভিনেএী নুসরাত, শ্রাবন্তী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জনপ্রিয় তারকা মৌসুমী, মেহে্জাবিন এর মতো আরও অনেকের দেখা মিলবে টিকটকে। বহুল সম্প্রসারিত এই অ্যাপটিতে রয়েছে ভিডিও তৈরীর বিভিন্ন ফিল্টার, অডিও সংযোগ অপশন এবং জুম এর মতো সুবিধা। বিভিন্ন ওয়াজ, মাহফিল,রাজনৈতিক ভাষণ, বিখ্যাত সিনেমা বা নাটকের সংলাপ, গান এর সাথে ঠোঁট মিলিয়ে বা নাচের ভিডিও দিয়ে হাস্যরসাত্বক, ব্যাঙ্গাত্বক অঙ্গভঙ্গি করে তৈরি করা হয় টিকটক ভিডিও। টিকটকারদের রয়েছে ফ্যান,ফলোয়ার, হেইটারস(প্রত্যাখানকারী)।কোনো পেইজের ফলোয়ার সংখ্যা ২৫-৩০ লাখের ও অধিক। বিয়ে বাড়ি থেকে শুরু করে রাজধানী শহরের পার্ক, সব জায়গায় তৈরি হচ্ছে টিকটক ভিডিও। নতুন কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য ও অনেকে জনপ্রিয় টিকটকারদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। ইউটিউবার, ব্লগারদের মতো টিকটকেও আছে মুনাফা লাভের সুযোগ। তবে তাতে ফলোয়ার সংখ্যা হতে হবে অসংখ্য।

টিকটকের যাএা বিনোদনের জন্য হলেও এখন তা আর নেই ঠিকঠাক।অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কে তুলে ধরা হচ্ছে হাসির খোরাক হিসেবে। যেমন, মা কে শুধু মাদারস ডে তে নই,আদারস ডে তে ও একইভাবে ভালোবেসো।মনোযোগ লাভের আশায় বেশির ভাগ টিকটকারদের খোলামেলা পোশাক স্পষ্টতই যৌনতা কে উষ্কে দেয়। ফলে প্রতিনিয়তই বাড়ছে যৌন হয়রানি। অবহেলিত হচ্ছে ধর্মীয় দিক।কমছে হৃদ্যতা,বাড়ছে মানুষে মানুষে দুরত্ব আর সহিংসতা। গ্যাং করে উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা পার্কে, রেস্টুরেন্টে ভিডিও তৈরির ফলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আবার টিকটকের নামে গ্যাং রেফের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকবার।ফ্যাশনের নামে চর্চা করা হচ্ছে অপসংস্কৃতির,ঝুঁকছে পাশ্চাত্য সভ্যতার দিকে। অনেকেই ভিডিও তৈরির জন্য নিচ্ছে জীবনের ঝুঁকি। প্রায়ই বাইক রেস, দেয়াল থেকে লাফিয়ে পরার মতো ঘটনা দেখা যায় টিকটকে।ফলোয়ার কমে যাওয়াতে অনেক হতাশায় পরে যায়, অতিসম্প্রতি আত্মহত্যার ঘটনা ও দেখা গেছে। বাচ্চাদের দিয়ে টিকটক করানোর ফলে তাদের চোখ, মস্তিষ্কসহ শারিরীক ব্যাঘাত ঘটছে,তেমনি কোমলমতি এই শিশুরা আসক্ত হচ্ছে স্মার্ট ফোনে।টিকটকের করালগ্রাসের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে যুবসমাজ। এই ব্যাপারে বাংলাদেশ ভিডিও কন্টেন্ট স্ট্রিমিং সাইট বঙ্গবিডির অপারেসন্স বিষয়ক পরিচালক ফাইয়াজ তাহের বলেন, “বাংলাদেশের মূলত তরুণ প্রজন্ম, যাদের কে বলে মিলেনিয়াম তারাই এটি বেশি ব্যবহার করছে। এবং হাসির জিনিসই বানাতে দেখা যায় তাদের। ” একটি জরিপে দেখা যায় টিকটক ব্যবহারকারীদের ৯০% দৈনিক ৫১ মিনিট টিকটক ভিডিও দেখে। এইভাবে সমাজের একটি বৃহৎ অংশ প্রতিনিয়ত টিকটকের নামে অন্ধকার জগতে তাদের যোগাযোগ বৃদ্ধি করছে।গবেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মূলত পরিচিত হওয়ার আশায় মানুষ টিকটকে আসক্ত হচ্ছে। খুব সম্ভবত বাংলাদেশ তার পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের পথে হাঁটছে।কেননা,ভারতে এই অ্যাপটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তাই কিছুদিন পূর্বে অ্যাপটি বন্ধের দাবিতে হাইকোর্টে একটি রিট জারি করা হয়।

টিকটকের নামে একটি দেশের সংস্কৃতি কে বিপর্যস্ত করার যেই নৃশংসতা শুরু হয়েছে তার থেকে পরিত্রাণের উপায় ভার্চুয়াল জগতে থেকে বের হয়ে আসা।বাবা-মা কে সন্তানের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া সেই সাথে সংবেদনশীল হওয়াও জরুরি। বেশি বেশি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। খেলাধূলা করা,পরিবারের সাথে সময় কাটানো।অন্যথায়, যুবসমাজ হুমকির মুখে পরবে।এবং সরকারিভাবে অ্যাপটি বন্ধ করে দেওয়াই সময়ের সবথেকে বড় দাবি।

লেখক,
মোছাঃ বন্যা আক্তার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সম্পর্কিত পোস্ট