“দাজ্জালের আবির্ভাব ও মুমিনের করণীয়”

received_338138283785743.jpeg

আরিফ ইকবাল নূর :
—————-
কিয়ামাত বা মহাপ্রলয়ের পূর্বেই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। বনি আদমেরই একজন মানুষ দাজ্জাল। শেষ জামানায় তার আবির্ভাব ঘটবে এবং সে নিজেকে রব বলে দাবি করবে। পূর্ব তথা খোরাসান থেকে সে বের হবে। অতঃপর মসজিদে আকসা, তূর পাহাড়, পবিত্র নগরী মক্কা ও মাদিনা ছাড়া সে সমস্ত পৃথিবী বিচরণ করবে। মসজিদে আকসা, তূর পাহাড়, দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মাদিনাকে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা দ্বারা পাহারা দিয়ে রাখবেন। মানুষ ঘুমে বেঁহুশ হয়ে পড়বে। দাজ্জালের আবির্ভাবের সময় মদীনায় তিনটি কম্পন সৃষ্টি হবে। এ কম্পনের ফলে মাদিনা থেকে কাফের ও মুনাফেক বের হয়ে চলে যাবে।

যুগে যুগে সকল নবী রাসূল নিজ নিজ উম্মতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সর্তক করে গিয়েছেন। তেমনি হযরত মোহাম্মদ (স) দাজ্জাল চেনার উপায় সম্পর্কে হাদিস শরীফে বর্ণনা করেছেন।
বুখারী শরীফে রয়েছে, দাজ্জালের ডান চোখ এমন ত্রুটিপূর্ণ হবে যে, যেন আঙ্গুর গুচ্ছের একটা বিরিয়ে পড়া আঙ্গুর। তার গায়ের রং হবে লালা, মাথার চুল কোঁকড়ানো।

দাজ্জাল আবির্ভাবের আগে ও পরে কি হবে এবং দাজ্জালের কর্মকাণ্ড কেমন হবে সে সম্পর্কে মুসলিম শরীফের একটি হাদিসে রাসুল (স) ইরশাদ করেছেন, দাজ্জাল আবির্ভাবের পূর্বের তিন বছর এরূপ হবে যেঃ
প্রথম বছর আসমান তার তিনভাগের একভাগ বর্ষণ এবং জমিন তার এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন বন্ধ করে দিবে।
দ্বিতীয় বছর আসমান দুই-তৃতীয়াংশ বর্ষণ এবং জমিন তার দুই-তৃতীয়াংশ উৎপাদন বন্ধ করে দিবে।
আর তৃতীয় বছর আসমান তার সমস্ত বর্ষণ এবং জমিন তার সব উৎপাদন বন্ধ করে দিবে। ফলে খুরবিশিষ্ট প্রাণী এবং শিকারি দাঁতবিশিষ্ট প্রাণী ধ্বংস হয়ে যাবে। দাজ্জালের সবচেয়ে মারাত্মক ফিতনা এমন হবে যে, সে বেদুইনের নিকট গিয়ে বলবে, যদি আমি তোমার মৃত্যু উটগুলো জীবিত করে দেই, তাহলে তুমি কি আামকে তোমার প্রভু হিসেবে বিশ্বাস করবে? বেদুইন বলবে, হ্যা।
তখন শয়তান তার উটের আকৃতিতে উত্তম স্তন এবং মোটাতাজা কুঁজবিশিষ্ট অবস্থায় তার সম্মুখে উপস্থিত হবে।
রাসুল (স) বলেন,অতঃপর দাজ্জাল এমন এক ব্যক্তির নিকট আসবে, যার ভাই এবং বাবা মৃত্যুবরণ করেছে। তাকে বলবে, আমি যদি তোমার ভাই ও বাবাকে জীবিত করি তাহলে কি আমাকে তোমার প্রভু বলে বিশ্বাস করবে?
সে বলবে,হ্যাঁ। তখন শয়তান তার পিতা ও ভাইয়ের আকৃতি ধারণ করে আসবে।

দাজ্জাল মানুষকে ধোঁকা দিয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দিবে। তার সাথে ঠান্ডা পানি ও আগুন থাকবে। আমাদের মধ্যে যদি কেউ দাজ্জালের দেখা পাই তাহলে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছেন রাসুল (স)। কারণ দাজ্জালের আগুন প্রকৃত পক্ষে শীতল ও সুস্বাদু পানি হবে আর ঠান্ডা পানিই হবে আগুন। তার সাথে আরো থাকবে একটি জান্নাত ও একটি জাহান্নাম। তবে তার জান্নাত হবে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম এবং জাহান্নাম হবে জান্নাত।

*মুমিনের করণীয়ঃ
যখন দাজ্জালের আবির্ভাব হবে তখন মুমিনদের কি করুণীয় সে সম্পর্কে রাসুল (স) ইরশাদ করেছেন। তিনি বলেন, যদি দাজ্জালের আবির্ভাব হয়, তখন যদি আমি তোমাদের মাঝে বর্তমান থাকি তোমাদের মধ্যে আমিই তার সাথে দলিল-প্রমাণে জয়ী হব। আর যদি আমি বিদ্যমান না থাকি তখন তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তিই সরাসরি দলিল-প্রমাণ দিয়ে তার সাথে মোকাবিলা করবে। তখন মুসলমানদের জন্য আমার পরিবর্তে আল্লাহই সহায়ক হবে। সে হবে যুবক, মাথার চুল কোঁকড়ানে, ফোলা চক্ষুবিশিষ্ট। আমি তাকে আবদুল উযযা ইবনু কাতানের সাথে তুলনা করতে পারি। সুতরাং যে তাকে পাবে, সে যেন তার সুম্মুখে সূরা কাহফের শুরুর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে।
অপর এক বর্ণনায় আছে, সে যেন তার সম্মুখে সূরা কাহফের প্রথমাংশ তিলাওয়াত করে। কেননা এই আয়াতগুলো তোমাদেরকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদে রাখবে।

*দাজ্জালের বিরুদ্ধে এক মুমিনের যুদ্ধঃ
একজন মুমিন দাজ্জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। সেই মুমিন ব্যক্তি দাজ্জালের কাছে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হবে। পথের মধ্যে তার সাথে দাজ্জাল বাহিনীর সাথে সাক্ষাৎ হবে। তারা জিজ্ঞেস করবে, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
সে বলবে ঐ ব্যক্তির কাছে যেতে চাই যে বের হয়েছে। তখন তারা বলবে, তুমি কি আমাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছো? সে বলবে, আমাদের প্রকৃত রব অজানা নন। তখন তারা পরস্পর বলবে, আমাদের রব কি এই বলে নিষেধ করেনি যে, তার সম্মুখে উপস্থিত করা ব্যতিত যেন কাউকে আমরা হত্যা না করি? তখন তারা মুমিন ব্যক্তিকে দাজ্জালের নিকট নিয়ে যাবে।
যখন সেই মুমিন দাজ্জালকে দেখবে, তখনই সে লোকদের উদ্দেশ্য করে বলবে, হে লোকসকল, এ সেই দাজ্জাল যার সম্পর্কে রাসুল (স) সর্তক করেছেন। তার মুখে রাসুলুল্লাহ এর নাম শুনে দাজ্জাল ঐ মুমিনকে কঠোরতম সাজা দেওয়ার নির্দেশ দিবে এবং বলবে, তাকে ধরো এবং তার মাথায় জোরে আঘাত করো। তখন তাকে এমনভাবে প্রহার করা হবে যে, তার পিঠ ও পেট চ্যাপ্টা হয়ে যাবে। তখন দাজ্জাল বলবে, তুমি কি এখনো আমার প্রতি ঈমান আনবে না? জবাবে বলবে, তুমিই তো মিথ্যাবাাদী। এবার দাজ্জাল লোকটিকে করাত দ্বারা চিরে ফেলার নির্দেশ দিবে। তখন সেই মুমিনকে মাথা হতে চিরা হবে, এমনকি তার পদদ্বয় পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত করা হবে। অতঃপর দাজ্জাল সেই খণ্ডিত দুই টুকরার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাবে। তারপর সে উক্ত খণ্ডকে লক্ষ্য করে বলবে, তুমি দাঁড়িয়ে যাও। এবার লোকটি জীবিত হয়ে সোজাভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। তখন দাজ্জাল তাকে বলবে, এখন কি তুমি আমার প্রতি ঈমান আনবে? সেই মুমিন বলবে, এখন আমার বিশ্বাসের দৃঢ়তাই বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাসুল (স) বলেন, অতঃপর সে এ মর্মে মুমিন লোকদের সম্বোধন করে বলবে, হে লোকসকল! তোমরা জেনে রাখো এ-ই দাজ্জাল। সে এতক্ষণ পর্যন্ত আমার সাথে যা কিছু করেছে, আমার পরে আর কোন মানুষের সাথে তা করতে সক্ষম হবে না।
এবার দাজ্জাল তাকে পুনরায় জবাই করতে উদ্যত হবে। কিন্তু তার গর্দান ও সিনার মধ্যবর্তী স্থান তামায় পরিণত করে দেওয়া হবে, ফলে দাজ্জাল তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। দাজ্জাল তাকে হাত-পা বেঁধে ফেলবে এবং আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। উপস্থিত লোকরা মনে করবে দাজ্জাল তাকে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে, অথচ প্রকৃতপক্ষে তাকে জান্নাতে নিক্ষেপ করা হয়েছে। অতঃপর রাসুল (স) বলেন, এই মুমিনই হবে আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা বড় শহীদ ব্যক্তি।

মুমিন ব্যক্তির জন্য দাজ্জালের আবির্ভাব সবচেয়ে বড় ফেতনা। অনেক মুসলিম দাজ্জালের ধোঁকায় পড়ে ঈমান হারা হয়ে যাবে। তাই যে মুমিন ব্যক্তি দাজ্জালের দেখা পায় সে যেন রাসুল (স) এর নির্দেশ অনুযায়ী তার সাথে মোকাবিলা করে। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে অভিশপ্ত দাজ্জালের ফিতনা থেকে হিফাজত করুন। পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের সফলতা লাভে মজবুত ঈমানে অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

*মিশকাত শরীফ ১০ম খন্ড, হাদিস-৫২৫৭
*বুখারীঃ তৃতীয় খন্ড, হাদিস নং-৩১৯৫
*মুসলিম শরীফ, হাদিস নং-৬৯৪
*মিশকাত শরীফ ১০ম খন্ড, হাদিস-৫২৪১

আরিফ ইকবাল নূর
শিক্ষার্থীঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top