আর কত অশ্রু ঝরলে, তোমারও কান্না পাবে!

received_381169072536515.jpeg

————–
বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উৎকণ্ঠার যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে ধর্ষন। ধর্ষণ যেন সবচেয়ে পরিচিত শব্দ। প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে ধর্ষিত হচ্ছে আমার বোনেরা। এর থেকে বাদ যেন নেই কোনো বয়সের নারীই। পত্রিকার পাতা খুললেই এমন কিছু সংবাদ আমাদের কপালে ভাঁজ এনে দেয় প্রতিনিয়ত। আজ শিক্ষক থেকে শুরু করে, বখাটে, গাড়ির চালক,হেলপারও ধর্ষণ করতে উম্মুখ হয়ে আছে এমনকি অনেকাংশে নিজ পরিবারেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ধর্ষকের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলছে। আজ নিরাপদ নয় বৃদ্ধা থেকে ৩-১০ বছরের শিশু পর্যন্ত! আর কত ধর্ষণ! আর কত রক্তের বিনিময়ে থামবে এই নিষ্ঠুরতা!

ধর্ষণের পরিসংখ্যান:
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ছয় মাসে ৬৩০ নারী ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে এবং পাশাপাশি হত্যা করা হয়েছে ৩৭ নারীকে। তার চেয়েও নির্মম ছয় মাসে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ৩৯৯! যার মধ্যে মারা গেছে ১৬টি শিশু। শুধু মাত্র গত মে মাসের প্রথম আট দিনে সারা দেশে ৪১টি শিশু ধর্ষণ ও ৩টি শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। মারা গেছে ৩টি মেয়েশিশু। ধর্ষণের ঘটনায় আঁতকে ওঠার মতো পরিসংখ্যানটি দিয়েছে সাউথ এশিয়ান লইয়ার্স ফোরাম। তাদের দেয়া তথ্য মতে ২০১২ সালে বাংলাদেশে ৭৭১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১০৬ নারীকে। গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৫৭ জন। এ চিত্রটি কেবলই বিভিন্ন কোর্টে মামলা অথবা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণের প্রকৃত পরিসংখ্যান এর কয়েকগুণ বেশি হতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মনে হচ্ছে ধর্ষকদের প্রধান টার্গেটই শিশু। মৃত্যু কত সুলভ এ দেশে! আর ধর্ষণ যেন এক মামুলি অপরাধ!

সাম্প্রতিক চিত্র:
অতি সম্প্রতি মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কর্তৃক এক ছাত্রীকে টানা এক বছর ধর্ষণ, মাদ্রাসা অধ্যক্ষ কর্তৃক শিশু শ্রেণীর ছাত্রী ধর্ষণ চেষ্টা, ঢাকার ওয়ারিতে এক যুবক কর্তৃক সাত বছরের শিশু সায়মা ধর্ষণ, চট্টগ্রামে কেইপিজেড এ বখাটে কর্তৃক ১৫ বছরের তরুণী ধর্ষন, নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ, রাজধানীর ভাটারার জগন্নাথপুরে সৎ বাবা কর্তৃক মেয়ে ধর্ষণ,ফেনীতে অধ্যক্ষ কর্তৃক ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নুসরাতের মৃত্যুসহ এমন অসংখ্য ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টা হচ্ছে যা অজানাই রয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ চলছে অবিরাম এটি যেন একটি রীতিতে পরিণত হচ্ছে। ধর্ষকের ভয়াল থাবা থেকে মুক্তি চায় মুক্তিকামী নারী এবং মুক্তি চায় বাংলাদেশ।

ধর্ষণের প্রকৃত কারণ:
ধর্ষণের প্রকৃত কারণ গুলো খুঁজে আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। ধর্ষণের কারণ হিসেবে আমরা অনেকে অবাধ মেলামেশা, বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন, অশালীন আবেদনময়ী ফ্যাশন, অসুস্থ মানসিকতাকে, মাদক ইত্যাদি কারণকে আমরা চিহ্নিত করি। ধর্ষণের পেছনের অদৃশ্যমান আরেকটি কারণ কিছুটা হলেও উন্মোচন করেছে নারীপক্ষ নামক একটি সংস্থা তাদের গবেষণার মাধ্যমে। নারীপক্ষ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে , ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে করা তিন হাজার ৬৭১টি মামলায় মাত্র ৪ জনের সাজা হয়েছে। ধর্ষণ মামলায় হাজারে সাজা হচ্ছে মাত্র চার জনের। মহিলা আইনজীবী সমিতির আরেক জরিপে দেখা যায় ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়। এসব মামলার ভেতরে যেগুলোর রায় হচ্ছে সেখানেও আছে দীর্ঘসূত্রিতা , এই সুদীর্ঘ সময়ে ধর্ষিতাকেও মনস্তাত্ত্বিক ধর্ষণের শিকার হতে হয় বছরের পর বছর জুড়ে। তাই সুষ্ঠ বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণের অন্যতম কারণ।

ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রদক্ষেপ:
ধর্ষকদের থামাতে প্রতিরোধ একমাত্র উপায় হলেও আরও কিছু পদক্ষেপ আমরা নিতে পারি যার দ্বারা সুস্থ মানসিকতা গড়ে ওঠবে এবং এইসব নোংরা কাজ থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করবে। তা হলো- দেশের মানুষকে নৈতিক শিক্ষায় বলিয়ান করা, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে বেশি জোড় দেয়া হয়নি। ধর্ম শিক্ষা নেই বললেই চলে। এক সময় স্কুল ও কলেজে সপ্তাহে এক দিন ধর্ম ও নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হতো। আর এখন ধর্ম চর্চা করা হলে তাকে উগ্রপন্থী অথবা মৌলবাদী বলে সন্দেহ করা হয়। এখন পবিত্র কোরআন, গীতা, বেদ ও বাইবেলসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলো অধ্যয়ণ করেন না এসব গ্রন্থের কথিত অনুসারীরা। ফলে সমাজে নানাবিদ অঘটন ঘটে। অনেকে আইনের শাসনের কথা বলে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে নারী আর ধর্ষণের শিকার হবে না। অধিকার ফিরে পাবে প্রত্যেক নারী। কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে দরকার নৈতিকতা। তাছাড়াও মাদক থেকে দূরে রাখা, ধর্ষণের সুষ্ঠু বিচার এবং বাংলাদেশ থেকে পর্ন সাইট গুলোকে চিরতরে মুছে দেওয়ার মত ইত্যাদি কার্যক্রম হাতে নিলে ধর্ষন অনেকটা হ্রাস পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

ইসলাম ধর্মে ধর্ষণের শাস্তি:
কোনো ধর্মেই ধর্ষণকে সাপোর্ট করে না। প্রত্যেক ধর্মেই ধর্ষণকে তিরস্কার এবং শাস্তি ঘোষণা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে ধর্ষণের শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে তিনটি অপরাধ সংঘটিত হয়। এক. ব্যভিচার। দুই. বল প্রয়োগ। তিন. সম্ভ্রম লুণ্ঠন। ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি ব্যক্তিভেদে একটু ভিন্ন। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে ১০০ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরকরণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সূরা নূর : ২)। হাদিসে এসেছে, ‘অবিবাহিতের ক্ষেত্রে শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে ১০০ বেত্রাঘাত ও রজম বা পাথর মেরে মৃত্যুদ-।’ (মুসলিম : ৪৫১১)। এ হাদিস থেকে জানা গেল ব্যভিচারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে পাথর মেরে মৃত্যুদ- দেওয়া হবে। কিন্তু সে বিবাহিত না হলে তাকে ১০০ বেত্রাঘাতের পাশাপাশি বিচারক চাইলে দেশান্তর করতে পারেন। হিন্দু ধর্মেও অবৈধ যৌনতা এবং মেয়েদের ঠকানোর শাস্তি হিসেবে রক্ত ও পুঁজে পূর্ণ পয়োকদম নামক কূপে নিক্ষেপ করা হয়।

ধর্ষণ প্রতিরোধে আমাদের দায়িত্ব:
ধর্ষণ প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় প্রদক্ষেপ হচ্ছে কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ। ধর্ষকগুলোকে ভয় দেখাতে হবে। এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে যাতে ধর্ষণ করে পার পাবার কোনো সুযোগ নেই। কঠোর পরিণতির ভয়ে যাতে কারো মনে ধর্ষণের মনোভাবও জাগ্রত না হয়। তাই আমাদেরকে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে যাতে ধর্ষকরা মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে কাউকে আতঙ্কে থাকতে না হয়, সবার অধিকার নিয়েই বাঁচতে পারার মত পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব এই সমাজ ও রাষ্ট্রের। আমাকে ও আপনাকে নিয়ে এই সমাজ। তাই ধর্ষণ প্রতিরোধে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে সর্বাগ্রে।

সবুজ-শ্যামল এই দেশটি সবার কাছে সৌন্দর্য ও নিরাপদের বধ্যভূমি। তাদের কারণে আমাদের এই দেশকে কলুষিত হতে দিতে পারি না, বিনষ্ট হতে দিতে পারি না দেশের ও সরকারের সুনাম। আসুন সচেতন নাগরিক হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। তারা এই দেশের সুনাম,এই দেশের সরকারের সুনাম বিনষ্ট করছে এদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা খুবই জরুরি। ধর্ষণ অপরাধে মৃত্যুদণ্ড আইন চালু করা এখন সময়ের দাবী।
—————-
আমজাদ হোসাইন হৃদয়
শিক্ষার্থী,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top