ইসলামে এতিম ও বিধবাদের অধিকার এবং আমাদের দায়িত্ব

received_358732424826816.jpeg

আমজাদ হোসাইন হৃদয়।

ইসলাম ধর্মে সকলের অধিকার সংরক্ষিত রয়েছে। ইসলামপূর্ব যুগে এতিম ও বিধবাদের কোনো অধিকার সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অসহায় সন্তানদের প্রতি শুরু হতো অত্যাচার-অবিচার ও জুলুম-নিপীড়ন। তাদের অধিকার দেওয়া তো হতোই না, বরং এতিম শিশুদের জন্য বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ কেড়ে নেওয়ার জন্য শুরু হতো ষড়যন্ত্র। অনুরূপভাবে স্বামী মারা যাওয়ার পর বিধবা স্ত্রী মানুষের কটু কথার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতো। কিন্তু ইসলাম তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট অধিকার প্রণয়ন করেছে। তাদের সাথে সুন্দর ব্যবহার, ভালোভাবে দেখাশুনা করা, তাদের সম্পদের ব্যাপারে যথেষ্ট তাগিদ ইসলামে রয়েছে।

এতিমদের ব্যাপারে ইসলাম:-
রাসূল সঃ একদিন দুই আঙ্গুল প্রদর্শনের মাধ্যমে বলেন, আমি এবং এতিম লালন পালন কারী এইভাবে পাশাপাশি অবস্থান করবো (ইবনে মাজাহ হাদিস)। এতিমদের ধন-সম্পদ রক্ষার সার্বিক বিষয়ে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন, ‘আর এতিমদের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে। যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনা দেখা যায়, তাহলে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পণ করতে পারবে। এতিমের সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করো না অথবা তারা বড় হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না। যখন তাদের কাছে তাদের সম্পদ তাদের হাতে হস্তান্তর করবে তখন সাক্ষী রাখবে। অবশ্যই আল্লাহ হিসাব নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।‘ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬)
আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেও একজন এতিম ছিলেন। তাই তিনি এতিমের দুঃখ-কষ্ট অন্তর দিয়ে অনুভব করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এতিমদের মাথায় শুধু আল্লাহর উদ্দেশ্যে হাত বুলায়, তবে যেসব চুলের ওপর দিয়ে হাত বুলিয়েছে তার প্রত্যেকটি চুলের বিনিময়ে কয়েকটি করে নেকি লাভ করবে।‘ তিনি আরও বলেছেন, ‘সর্বোত্তম ঘর হলো সেই ঘর, যেখানে এতিমদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয়, আর নিকৃষ্টতম ঘর হলো সেই ঘর, যেখানে এতিম বসবাস করে কিন্তু তার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়।

বিধবাদের ব্যাপারে ইসলাম:-
ইসলামের নারীর মর্যাদার পাশাপাশি বিধবার সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন বিধবা কখনোই সমাজ-সংসারের বোঝা নয়। ইসলামের শুরু থেকেই বিধবাকে ইসলাম মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সা. এর স্ত্রীদের মধ্যে আয়েশা (রা.) ছাড়া অন্য সব স্ত্রী ছিলেন বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তা। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর থেকে প্রায় অর্ধেক বয়স বেশি ৪০ বছর বয়স্কা বিধবা নারী হজরত খাদিজাকে (রা.) সর্বপ্রথম বিয়ে করেন। খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর ক্রমান্বয়ে দশজন নারীকে বিয়ে করেন, যাদের আটজনই ছিলেন বিধবা। তিনি ইসলামের প্রচার-প্রসার, মানবিক কারণ, বিশেষ করে তৎকালীন আরবের কুসংস্কার উচ্ছেদ করে বিধবাদের অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য এসব বিয়ে করেছিলেন।
পবিত্র আল কোরআনে বলা হয়েছে- তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে এবং তাদের নিজেদের স্ত্রীদের রেখে যাবে, সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো নিজেরা চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা (ইদ্দত পালন) করবে। তারপর যখন ইদ্দত পূর্ণ করে নেবে, তখন নিজের ব্যাপারে ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নিলে কোনো পাপ নেই। আর তোমাদের যাবতীয় কাজের ব্যাপারেই আল্লাহর অবগতি রয়েছে।’ {সূরা আল বাকারা : ২৩৪}। বিধবার অধিকারের বিষয়ে পবিত্র কোরআনপাকে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ, নারীদের জোরপূর্বক উত্তরাধিকারের পণ্য হিসেবে গ্রহণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয় এবং তোমরা তাদের যা প্রদান করেছ তার কোনো অংশ তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেয়ার জন্য তাদের আটকে রেখো না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর, এমনকি তোমরা যদি তাদের পছন্দ নাও কর, এমনো তো হতে পারে যা তোমরা অপছন্দ কর, তাতেই আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন’। (সূরা নিসা : ১৯)।

আমাদের দায়িত্ব:-
ইসলাম এতিম ও বিধবাদের যথেষ্ট সম্মান ও অধিকার প্রদান করলেও আমরা অনেক সময় তাদের প্রাপ্য সে সম্মান দিতে পারিনা। দেখা যায় এতিমকে অবহেলা করি, নিম্ম চোখে দেখি, দাসের মত কাজ করিয়ে নি ইত্যাদি। একইভাবে বিধবাদেরকেও অবহেলা করি, তাদের অন্যত্র বিবাহতে বাধা সৃষ্টি করি, তাদের সুন্দরভাবে বাঁচাকে আমরা অন্য দৃষ্টিতে দেখি অথচ আমাদের উচিত ছিল ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের উচিত তাদের পাশে থাকা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। আসুন আমরা তাদের অধিকার আদায় করি এবং অধিকার প্রতিষ্টায় একসঙ্গে কাজ করি।

এভাবে ইসলাম এতিম, বিধবা ও মিসকিনদের যাবতীয় নৈতিক ও বস্তুগত অধিকারের সুরক্ষা প্রদান করেছে। ইসলামি মানবসভ্যতায় তাদের অবস্থান সংহত করেছে। ইসলামী রীতি অনুযায়ী বিধবা নারী ও এতিমদের অধিকার প্রতিষ্টায় সকলকে সচেতন হতে হবে।

আমজাদ হোসেন হৃদয়
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top