শিশু শ্রম বন্ধে প্রয়োজন শিশু বান্ধব সমাজ ব্যবস্থা

IMG_20190706_162129.jpg

———-+–
মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন খালেদ
এডভোকেট, বাংলাদশ সুপ্রীম কোর্ট।

গ্রীষ্মের প্রখর রোদ। মাথার ওপর প্রখর রোদের তাপ কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না শিশুটির। দারিদ্রের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত তার পরিবার। জীবন সম্পর্কে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অর্থ উপার্জনের জন্য পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। খোলা আকাশের নীচে গাড়ীর ধোয়া ও ধুলোবালি উপেক্ষা করে গাড়ীর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি খোলা সহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করছে। কেউবা মাথায় ইট বা ভারি বস্তু নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। কেউ লোহা কাটার কাজে ব্যস্ত। আমাদের দেশে ভয়াবহ সমস্যা হলো এই শিশু শ্রম। তারা অসহায় ও দুর্বল বিধায় সকল নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করে এবং তাদের শ্রমের সঠিক মূল্য না দিয়ে ঠকানো যায়। এতিম, অসহায়, গৃহহীন, দুঃস্থ, দরিদ্র, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারনে তাদের এসব ঝুঁকিপূন কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় তাদের নিয়োগের অন্যতম কারন হচ্ছে- তাদের দিনরাত খাটানো যায়। এতে তারা শিক্ষা বঞ্চিত হওয়া ছাড়াও পঙ্গুত্ব বরন সহ অকালে মৃত্যুর মুখেও পতিত হয় অনেকে। আইন থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ এবং গণসচেতনতার অভাবে শিশুদের এসব কাজে ব্যবহার রোধ করা যাচ্ছে না। এসব ঝুঁকিপূর্ন পেশার মধ্যে রয়েছে- পরিবহন (শ্রমিক টেম্পু, রাইডার, বাস, ট্রাক ইত্যাদিতে), মোটর ওর্য়াকসপ ও গ্রীল ওয়াকসপ, লেইদ মেশিন ইত্যাদিতে, শীপ ইয়ার্ডে, ইঞ্চিন বোট ও মাছ ধরার ট্রলারে, নির্মান শ্রমিক হিসাবে, ক্যামিকেল কারখানায়. রাজনৈতিক সহিংসতায় ও কর্মসূচীতে ব্যবহার, ধুমপান ও মাদক ব্যবসায় নিয়োগ, ইট ভাটায় ইত্যাদিতে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ, আমাদের সংবিধান, শিশু আইন-১৯৭৪, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আইনে শিশুদের প্রতি সকল প্রকার নিষ্টুরতা, জোর জবর দস্তি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক শোষন থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং যে কোন ঝুঁকিপূর্ন কাজ, যেখানে দুঘর্টনার সম্ভাবনা রয়েছে এবং যার ফলে তার শিক্ষার ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এমন ধরনের কাজ থেকে শিশুর নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে। যেসব কাজ শিশুর স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর এবং যে কাজ তার শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, নৈতিক বা সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যে সকল কাজ থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকারও শিশুর রয়েছে। আমাদের শ্রম আইনেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুসারে কর্মরত শিশু বলতে বোঝায়, ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী বা কিশোর যারা সপ্তাহে ৪২ ঘন্টা পর্যন্ত হালকা পরিশ্রম বা ঝুঁকিহীন কাজ করে। তবে কোন শিশু (চৌদ্দ বছর পূর্ণ হয় নাই এমন কোন ব্যক্তি) যদি কোন ধরণের ঝুঁকিহীন কাজও করে, তবে সেটা শিশুশ্রম হবে। তারাও কর্মরত শিশুদের মধ্যে পড়ে যায়। আর ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কেউ যদি সপ্তাহে ৪২ ঘন্টার বেশি কাজ করে, সেটা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হিসেবে স্বীকৃত। ঝুঁকিপূর্ন শিশু শ্রম বন্ধে একটি শিশু বান্ধব সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন এবং সর্বস্থরের নাগরিদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুদের লেখাপড়া, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও মেধা বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা ছাড়া শিশুশ্রম কিভাবে বন্ধ হবে। তবে আশার কথা হচ্ছে, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে ইতোমধ্যে অনেক দরিদ্র পিতামাতাই তাদের সন্তানদের কর্মস্থলের পরিবর্তে বিদ্যালয়ে পাঠাতে শুরু করেছেন।

লেখক ঃ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

Top