‘নারী নিগ্রহ :একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা’–মুহম্মদ হেলাল উদ্দিন

IMG_20190625_003602.jpg

—————————
সাম্প্রতিক সময়ে দুনিয়াময় ধর্ষণ,শ্লীলতাহানী,টিজিং সর্বোপরি নারীরা নিগৃহীত হওয়ার হার যেভাবে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা বেশ উদ্বেগজনক।এ জন্য কেউ নারীর উপর,কেউ পুরুষের উপর,কেউ প্রচলিত আইনের উপর,কেউ পরিবেশের উপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের অবস্হান জানান দিচ্ছি।এ রকম জগন্য অপরাধের প্রতিবাদ করতেছি নিজের মত করে।সামগ্রীক কোন ভাবনা বা ধারনা থেকে আমরা চলে যাচ্ছি অনেক দূরে।যত ভাবেই প্রতিবাদ হোক না কেন,এ অপরাধের মাত্রা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে।যেন লাগামহীন দূরন্ত ঘোড়া।ছয় বছরের শিশু, আপাদমস্তক বোরকাবৃতা কিংবা ৬০ বছরের বৃদ্ধা ধর্ষিত হচ্ছে অহরহ। এ সংক্রান্ত মেডিকেল ব্যাখ্যাটা অনেক পুরনো এবং তা প্রায় সকলেই অবগত আছেন।

অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলেও সত্য ১৩৮ বছর আগে রাশিয়ান বিজ্ঞানী পাভলভ্ এই সংক্রান্ত একটি ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন। বিজ্ঞানী পাভলভ্’র এই কনসেপ্ট অনেকেরই জানা থাকতে পারে। নন-মেডিকেলদের জন্য বিষয়টি সহজভাবে বলার চেষ্টা করব।মেডিকেল বিষয়ে যাদের জ্ঞান আছে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি,তারা বিষয়টি অনেক বেশি জানেন এবং বুঝেন।

বিজ্ঞানী পাভলভ্ একদল কুকুরকে ল্যাবে বেঁধে রেখে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তাদের খাবার দিতেন। কুকুরের সামনে থাকত খাবারের বাটি এবং আয়না। সেখানে পাভলভ কুকুরের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রতিদিন ঠিক একই সময়গুলোতে কুকুরগুলোকে খাবার দেয়া হতো। পাভলভ্’র সঙ্গে থাকতেন তার ল্যাব সহকারী। খাবার গ্রহণের সময় কুকুরের কী পরিমাণ লালা ঝরত সেটি একটি ধারকে(যেমনঃবালতি) মাপা হতো।

ব্রেইনের স্বাভাবিক প্রতিফলন (রিফ্লেক্স) হলো খাবার গ্রহণের সময় লালা ঝরা। কিন্তু পাভলভ্ দেখলেন যে, খাবার গ্রহণ নয়, খাবার দেখেও এবার কুকুরের লালা ঝরতে শুরু করেছে। পাভলভ্ খাবার দেখে কুকুরের কী পরিমাণ লালা ঝরত সেটিও ধারকে (কন্টেইনার) মাপার ব্যবস্থা করলেন।

বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর পাভলভ্ দেখলেন তিনি ল্যাবে ঢুকলেই কুকুরের মুখ থেকে লালা বের হচ্ছে। সঙ্গে খাবার থাক আর না থাক।

পাভলভ্ এবার নিজে ল্যাবে না গিয়ে খাবারবিহীন অবস্থায় তার ল্যাব সহকারীকে ল্যাবে পাঠালেন। ল্যাব সহকারী অবাক হয়ে দেখলেন তাকে দেখেও (ল্যাব সহকারী) কুকুরের লালা ঝরছে। পাভলভ্ এবার ভিন্ন কিছু করলেন। তিনি কুকুরকে খাবার দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে একটি ঘণ্টি বাজাতে থাকলেন। খাবার দেয়া হচ্ছে এবং ঘণ্টি বাজানো হচ্ছে।
এরপর পাভলভ্ এবং সহকারী একদিন খাবার ছাড়াই ল্যাবে আসলেন এবং ঘণ্টি বাজাতে শুরু করলেন। দেখলেন খাবার না দেয়া সত্ত্বেও কুকুরগুলোর একই পরিমাণ লালা ক্ষরণ হচ্ছে।

পাভলভ্ সিদ্ধান্তে আসলেন খাবারের প্যাকেট, ল্যাব সহকারী,ঘণ্টির শব্দ,এগুলো সব নিরপেক্ষ প্রভাবক/উপাদান (নিউট্রাল স্টিমুলেশন)। এগুলোর সঙ্গে লালা ক্ষরণের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু কুকুর তার লার্নিং বিহেভিয়ারে খাবারের সঙ্গে খাবারের প্যাকেট, পাভলভ্, ল্যাব সহকারী বা ঘণ্টির শব্দকে কো-রিলেট করে ফেলেছে এবং খাবারের সঙ্গে যা যা ঘটে সব কিছুকেই লালা ক্ষরণের উপাদান হিসেবে তার ব্রেইন শনাক্ত করছে।

ব্রেইনের এই লার্নিং মেথডকে তিনি “কন্ডিশনিং” এবং “কন্ডিশন্ড রিফ্লেক্স” বলেছেন। অর্থাৎ ব্রেইন এমন একটি স্টিমুলেশনের প্রতি সাড়া দিচ্ছে, যেটিতে ব্রেইনের আদৌ সাড়া দেয়া উচিত না, কিন্তু সাড়া দেওয়ার কারণ হচ্ছে ব্রেইন এই স্টিমুলেশনকে আরেকটি স্টিমুলেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ফেলেছে।

বর্তমানে পুরুষত্বের ব্যাধি এ পরীক্ষার ফলাফলের সাথে সমান্তরালভাবে চলতেছে। কুকুরের লালা ঝরার মতই নারী দেহ দেখলেই পুরুষের নষ্ট পুরুষত্ব জেগে উঠে।
মানুষ কুকুর নয় যে, নারী দেখলেই তাকে ধর্ষণ করবে।তবে মানুষের মধ্যে পশুত্ব আছে।

বিখ্যাত নিউরোলোজিস্ট এবং পরবর্তীতে সাইকিয়াট্রিস্ট সিগমন্ড ফ্রয়েড মন বিষয়ক ব্যাখ্যায় বলেন,যাকে আমরা মন বলি সেটি মূলত তিনটি সত্ত্বার সমন্বয়ে গঠিত – ইড, ইগো এবং সুপার ইগো।
অর্থাৎ মানব মন এই তিনটি গাঠনিক উপাদানে তৈরি।

‘ইড’ মূলত মানুষের জৈবিক সত্ত্বা।
মানব মনের স্বভাবজাত চাহিদা পূরণ করে ‘ইড’।এটিকে “মন যা চায় তাই” এর সাথে তুলনা করা যায়।
‘ইড’ মানুষ এবং পশু সবার মাঝেই সমানভাবে বিরাজমান। এর কোন মানবিক দিক বা বিকাশ নেই। ‘ইড’ এর পুরোটাই লোভ লালসা ও কাম চিন্তায় ভরপুর। ‘ইড’এমনভাবে মানুষকে প্ররোচিত করে যার ফলে মানুষ যে কোন অসামাজিক অপরাধ থেকে শুরু করে, খুন-ধর্ষণ পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করে না। এক কথায়, ‘ইড’ হচ্ছে আমাদের ভিতরের সুপ্ত পশু।

‘সুপার ইগো’ হচ্ছে মানুষের বিবেক।
‘ইড’ যখন জৈবিক কামনা বাসনা পুরণ করতে উদ্দীপ্ত করে, তখন ‘সুপার ইগো’ একে বাধা দেয়।
‘সুপার ইগো’ সব সময় মানবিক দুর্বলতার উর্ধ্বে উঠে ভাল কাজ করার জন্য মানুষকে উদ্দীপ্ত করে।
এই বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নির্ভর করে ব্যক্তির নৈতিক, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক শিক্ষা এবং মুল্যবোধের উপর।

অন্যদিকে ‘ইগো’ হচ্ছে এই দুই অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টিকারী একটি অবস্থা।
‘ইগো’ এবং ‘সুপার ইগো’র মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাই এর কাজ।
‘ইড’ বলবে – I need to get it.(আমাকে এটি পেতে/করতে হবে)।
‘সুপার ইগো’ বলবে – You have no right to get it.(তুমি এটি করতে পার না/উচিত না)।
‘ইগো’ বলবে – I need some plan to get it. (এটি পাওয়ার জন্য/কাজটি করার জন্য আমার কাছে সুন্দর পরিকল্পনা আছে)।অর্থাৎ ‘ইগো’ ‘ইড’র ইচ্ছাটা বাস্তবায়ন করবে একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে।

পশুরা ‘ইড’ চালিত।
তাই তারা কেবল জৈবিক চাহিদা (খাবার এবং যৌনতা) পূরণেই ব্যস্ত। আবার মানুষের মধ্যে যখন ‘ইড’ প্রকট হয়ে যায়, তখন সে উন্মাদ ও অমানুষ হয়ে যায়। আর যখন কেবল ‘সুপার ইগো’ কাজ করে – তখন সে সাধু, সন্যাসী, পবিত্র হয়ে যায়।’ইগো’ এই দুই অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।

মানুষের মধ্যে যখন ‘সুপার ইগো’প্রকট হয়, তখন অনেক সময় তাদের মধ্যে হতাশা (ডিপ্রেশন) চলে আসে। ‘ইগো’ তখন সমন্বয় করে। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা ‘সুপার ইগো’কে মানতে গিয়ে আমরা আমাদের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করতে পারি না। আমাদের এই অপূরণীয় চাহিদায় মন তখন বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তখন বিক্ষিপ্ত মনকে শান্ত করতে ইগো কাজ করে।

জীব বিজ্ঞানীদের মতে,জীব হিসেবে মানুষের সাথে অন্য প্রাণীর তেমন বেশি পার্থক্য নেই। উভয়েরই ‘ইড’ আছে। কিন্তু মানুষের সাথে দুইটা জিনিস আছে ‘ইগো’ এবং ‘সুপার ইগো’।

কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি-

পর্ণ মুভি দেখতে চমৎকার, অতএব পর্ণ দেখ > ‘ইড’।
পর্ণ মুভি দেখা নৈতিকতা বিরোধী, মানুষ এটাকে খারাপ বলবে, অতএব দেখা যাবে না > ‘সুপার ইগো’।
লুকিয়ে পর্ণ মুভি দেখ, অসুবিধা কী? মানুষ তো জানবে না, আর মনের চাহিদা ও মিটল > ‘ইগো’।( ‘ইগো’ সমন্বয় করতেছে দুই দিক)।

মেয়েটি সুন্দরী, অতএব ওকে টিজ বা রেইপ করো > ‘ইড’।
রেইপ, ইভটিজিং অপরাধ, অতএব করা যাবে না> ‘সুপার ইগো’।
মেয়েটির সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করো, সম্ভব হলে প্রেমের প্রস্তাব দাও, মন পাওয়ার চেষ্টা করো, মন পেলে শরীর কোন এক সময় পাবে > ‘ইগো’।

‘ইড’, ‘ইগো’ এবং ‘সুপার ইগো’র আপেক্ষিক তীব্রতা স্থিতিশীল নয়, বরং পারিপার্শ্বিকতার সাথে পরিবর্তনশীল।

যেমন ‘সুপার ইগো’ তথা বিবেক অসুস্থ হয়ে গেলে তখন সে তার কাজ অর্থাৎ অন্যায় কাজে বাধা দিতে পারে না।
দেহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – খাবার না খেলে/পেটে খাবার না থাকলে ক্ষুধার অনুভূতি সৃষ্টি করে সেটি জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু ক্রমাগত না খেয়ে থাকলে, দেহের দাবী অস্বীকার করলে দেহ অসুস্থ হয়ে যায়, তখন সে স্বাভাবিক ক্ষুধার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না।
তেমনি ‘সুপার ইগো’ তথা বিবেকের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – সে খারাপ কাজে আপনাকে বাধা দিবে, কিন্তু যখন আপনি নিয়মিতভাবেই ‘সুপার ইগো’কে অস্বীকার করবেন, অমান্য করবেন – তখন এটি দুর্বল হয়ে যাবে এবং অন্যায় কাজে কার্যকর বাধা দিতে পারে না।

একজন মাদকাসক্ত প্রথম যে দিন মাদক সেবন করে, তখন ‘সুপার ইগো’র জন্য তার মধ্যে কিন্তু প্রচন্ড অনুশোচনাবোধ হয়। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে মাদক সেবন তার এই অনুশোচনার তীব্রতা কমিয়ে দেয়।যে ব্যক্তি প্রথম পর্ণ দেখে, ‘সুপার ইগো’র জন্য তার মধ্যে প্রচন্ড অনুশোচনাবোধ হয়। কিন্তু সে যখন আসক্ত হয়ে যায়, তখন ধারাবাহিকভাবে অনুশোচনাবোধ কমে আসে।
সুতরাং মানুষ যদিও ‘ইগো’ এবং ‘সুপার ইগো’ দিয়ে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা, কিন্তু ‘সুপার ইগো’ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হওয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পশুত্ব জেগে উঠে।

একটি নির্দিষ্ট অবস্হা বা পরিবেশে কোন ব্যক্তির মনের মধ্যে এই তিনটি অবস্থার কোনটি প্রাধান্য বিস্তার করবে বা প্রকট আচরন করবে – সেটি নির্ভর করেঃ
১। ইড এবং সুপার ইগোর তুলনামূলক তীব্রতা
২। ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব আর
৩। ওই নির্দিষ্ট পরিবেশ – এই তিনটির ওপর।

কিছু উদ্ভ্রান্ত বাসের মধ্যে মোবাইলে পর্ণ দেখে (‘ইড’ প্রকট)।
কেউ কেউ লুকিয়ে একাকীত্বে পর্ণ দেখে (‘ইগো’ প্রকট )।
আদর্শবান মানুষেরা কোন অবস্থাতেই পর্ণ দেখে না (‘সুপার ইগো’ প্রকট)।

হজ্বের মহাসম্মেলনে নারী পুরুষের বিশাল সমাগমে কোন নারী ধর্ষিত হয় না (পরিবেশ প্রভাব)।
টিএসসির বৈশাখ উদযাপনে বা অনুরূপ অন্য উদযাপনে শিক্ষিতদের দ্বারা নারীরা লাঞ্চিত হয় (পরিবেশ প্রভাব)।

বিষয়টি প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে একইভাবে উন্নত হয় । পাভলভ্ কুকুর নিয়ে যে গবেষণা করেছিলেন বিহেভিয়ার কন্ডিশনিং এর এই বিহেভিয়ার (‘ইড’) কন্ডিশনিং হুবহু মানুষের জন্য প্রযোজ্য এবং নিউরোলজিতে কন্ডিশন রিফ্লেক্স এর জন্য পাভলভ্’র এই ব্যাখ্যাকে আদর্শ মানা হয়। এটা বলে রাখা খুবই প্রয়োজন এবং যৌক্তিক যে,এটির অর্থ মানুষের সাথে কুকুরের তুলনা না, বরং মানুষের বায়োলোজিক দিকের সাথে কুকুরের তুলনা। ড্রাগ ডেভেলপম্যান্ট, নিউ বায়োলোজিক রিসার্স সবগুলোই প্রথমে প্রাণীর উপর করে তারপর সেইফটি দেখে মানুষের উপর করা হয়।
৬ বছরের মেয়ে, বোরকাবৃতা মেয়ে কিংবা ৬০ বছরের বৃদ্ধা স্বাভাবিকভাবে যৌনানুভুতি সৃষ্টি করে না। কিন্তু লার্নিং মেথডের কন্ডিশনিং এর কারনে একজন ধর্ষকের ব্রেইনে এটি মারাত্মক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। বাড়িয়ে দিচ্ছে ‘ইড’ এর প্রকটতা। দুর্বল হয়ে যাচ্ছে ‘সুপার ইগো’।

প্রশ্ন হচ্ছে,কীভাবে এই কন্ডিশনিং হচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের ডিরেক্টর ড. আলিয়াস বলেছেন, মানুষের পার্সোনালিটি লার্নিং হয় শিক্ষা, সঙ্গ এবং পরিবেশ- এই তিনটি প্রধান ফ্যাক্টর দ্বারা।এবার দেখি শিক্ষা, সঙ্গ এবং পরিবেশ থেকে আমরা নারীদের ব্যাপারে কী ধারনা পাচ্ছি?

প্রতিদিনের পড়া থেকে আমরা কী শিখছি?
-পরস্পরের সম্মতিতে যৌন অনুভূতি প্রকাশ দোষণীয় নয়।

কাসেম বিন আবু বাকার থেকে আমরা কি শিখছি?
-স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে অন্যের সঙ্গে সহীহ পরকীয়ার কলাকৌশল।

তের-চৌদ্দ বছর বয়সে একটা ছেলে যখন সাহিত্যের নামে নগ্নতা পড়ে, সেখানে টুনি মন্টুর প্রেমকাহিনী পড়তে পড়তে সে অবচেতনভাবে নিজেকে মন্টু আর মেয়েকে টুনি ভাবে এবং এই ভাবনা নিউরোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু স্বাভাবিকই নয়, বরং না ভাবাটাই অস্বাভাবিক।

“পদ্মা নদীর মাঝি” উপন্যাস থেকে সাহিত্যের রসটা না নিয়ে আমরা কি শিখছি?
-বউকে ফাঁকি দিয়ে শালীর সঙ্গে সহীহ পরকীয়ার কলাকৌশল।
কুবের কপিলার সম্পর্ক পড়ার পর,’ইড’ প্রভাবে শালীকে কী চোখে দেখেন?

বাংলা সাহিত্যের নামে চালিয়ে দেয়া নষ্ট গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতায় নারীকে কী হিসেবে চিত্রিত করেছেন তথাকথিত কবি সাহিত্যিকরা? এই গল্প/সাহিত্য আপনার মস্তিষ্কে কী ধরনের চিত্রকল্প তৈরি করে?

“শকুন্তলা” নিবন্ধ থেকে আমরা সাহিত্যের সৌন্দর্যরূপটা গ্রহণ না করে গ্রহণ করছি কোনটা?
“শকুন্তলা’র অধরে নবপল্লবশোভার সম্পূর্ণ আবির্ভাব; বাহুযুগল কোমল বিটপের বিচিত্র শোভায় বিভূষিত; আর, নব যৌবন, বিকশিত কুসুমরাশির ন্যায়, সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া রহিয়াছে”। গাছের বাকলপড়া শকুন্তলার বর্ণনা আপনার মনের মধ্যে কী ধরনের ছবি উপস্থাপন করে?
-শকুন্তলা’র নগ্ন দেহের রগরগে বর্ণনা।
শকুন্তলা’র দেহের বর্ণনার এই লাইনগুলো আপনার কল্পনার চিত্রনাট্যে কী ধরনের ছবি তুলে ধরে?

সাহিত্য(?)গুলোতে নারীকে কী রূপে উপস্থাপন করা হচ্ছে?
-ভোগ-বিলাসের সামগ্রী।

বিজ্ঞাপনে নারীকে কী হিসেবে উপস্থাপন করছি?
-ভোগপণ্য।

নাটক, টেলিফিল্ম, ছায়াছবিতে নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করছি?
-ভোগপণ্য, কামনার প্রতিমা।

স্বাংস্কৃতিক অঙ্গন আর মিডিয়ায় নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করছি?
-ভোগপণ্য, কামনার প্রতিমা।

এইডসের বিজ্ঞাপনে কী বলতেছি?
-বাঁচতে হলে জানতে হবে (মানামানির দরকার নেই, জানলেই হবে। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে তো এইডসের জ্ঞান নেই বললেই চলে, তাই তাদের মধ্যে এত এইডস!)

একজন মিথ্যাবাদী, প্রতারক, উচ্চাভিলাষী, অল্প শিক্ষিত, চরিত্রহীন, কোয়ালিটিলেস ব্যক্তিকে দেশের সেরা করার নষ্ট প্রতিযোগিতা নিয়ে অনলাইন, অফলাইন মিডিয়ার গোষ্ঠী উদ্ধার আর তার পেছনে পতিতার খদ্দের দেশের তামাম বিখ্যাত সব কর্পোরেট হাউজের ছুটে চলার মাধ্যমে কী শিখাচ্ছি পরবর্তী প্রজন্মকে?

আমাদের সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, বিজ্ঞাপন, সংস্কৃতি(অবশ্যই সব ক্ষেত্রে নয়) একটা ছেলের মনে একটা মেয়ে সম্পর্কে কি ধরনের ইমেজ দিচ্ছে? এই একটা বিশেষ ছাঁচেই ছেলেদের চেতনা গড়ে উঠছে, এটাই ব্রেইনের স্মৃতিভাণ্ডারে জমা হচ্ছে। আসলে ব্রেইনের প্রি-কনসেপশনে বা স্মৃতিভাণ্ডারে নারী মানেই এমন একটি সত্ত্বা, যাকে দিয়ে দেহের এবং মনের ক্ষুধা মেটানো যায়।

সঙ্গ’র কথায় আসি।

একটা শিশু প্রথম প্রথম ২৪ ঘন্টা পরিবারের মধ্যে থাকে, ক্রমান্বয়ে পরিবারের সাথে থাকার সময় কমে যায় আর বাইরে সময় কাটানো বেড়ে যায়।এখন বাইরের জগতে তারা প্রতিনিয়ত যেসব সার্কেলে মিশে, সেখানে নারী প্রসঙ্গে কী আলাপ করে তারা? বন্ধুদের আড্ডায় বান্ধবীদের নিয়ে বা বান্ধবীদের আড্ডায় বন্ধুদের নিয়ে যেই আলাপ হয় সেই আলাপ দিয়ে পুরুষের মস্তিষ্কে নারীর ব্যাপারে কী ধরণের চিত্রকল্প তৈরি হয়?
তা আর যাই হোক অবশ্যই ইতিবাচক কিছু নয়।সঙ্গ এভাবেই আমাদেরকে নষ্টাভিমূখ করতেছে।

এবার আসি পরিবেশ নিয়ে।

দু’প্রকার পরিবেশ এখানে আলোচনা করতে হবে–

ফিজিক্যাল এনভাইরনমেন্ট এবং ভার্চুয়াল এনভাইরনমেন্ট (ইন্টারনেট)।

ফিজিক্যাল এনভাইরনম্যান্টঃএকটা ছেলে আমাদের পরিবেশ থেকে নারী সম্পর্কে কী ধরণের চিত্রকল্প লাভ করে? রাস্তাঘাটে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীকে কী ভূমিকায় আপনি দেখেন? আর একজন নারীই বা নিজেকে কীভাবে মুল্যায়ণ করেন?

ভারতে চলন্ত বাসে তরুনী ধর্ষিত হলেন।ব্যাপক আকারে মিডিয়া প্রচার করল।ফল কি হল?
খেয়াল করে দেখেন,এর পর পরই ভারত পাড়ি দিয়ে অনুরূপ ঘটনা বাংলাদেশেও চর্চিত হয়েছে।একই কায়দায়,একই পরিবেশে,একই বয়সীদের এবং পেশার মধ্যে।প্রশ্ন জাগতে পারে কেন এমনটি হল?আমার স্পষ্ট মন্তব্য হবে,পরবর্তী ঘটনা সমূহের জন্য মিডিয়ার প্রচারনা দায়ি,এখান থেকে তারা উৎসাহিত হয়েছে।মনের মধ্যে কল্পনাশক্তিতে পূর্বের ঘটনা জাগ্রত করে অনুরূপ ঘটনার জন্ম দিয়েছে।’ইড’ এর প্রকটতা এবং মিডিয়ায় প্রচারিত ঘটনার বর্ণনা অপরাধীকে অনুরূপ অপরাধে মগ্ন হবার জন্য ভালভাবেই উৎসাহিত করেছে।তাই বলে মিডিয়া এ খবর প্রচার বন্ধ করে দিবে?
না বন্ধ করবে না।অনুরূপ ঘটনা প্রচারের নীতিমালা অধিক উন্নত করতে হবে,অবলম্বন করতে হবে ব্যতিক্রমী কৌশল।

ভার্চুয়াল এনভাইরনমেন্টেঃ ভার্চুয়াল এনভাইরনমেন্ট এখন আমাদের হাতের মুটোয়। ইন্টারনেট সুদূর গ্রামে গঞ্জে সবার হাতে হাতে চলে গেছে। যৌনতা একটি স্বাভাবিক চাহিদা। ইন্টারনেট সাইটগুলো নারী সম্পর্কে কী কনসেপ্ট দিচ্ছে?
দু’টি পরিবেশই নৈতিক শিক্ষা থেকে আমাদেরকে দিন দিন দূরে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে।অথচ এখানে ইতিবাচক অনেক কিছুই করার ছিল।আমারা সেটি লিড় করতে পারছি না।

আমাদের শিক্ষা, সঙ্গ এবং পরিবেশ, কোনটি নারীকে মানুষ হিসেবে চিন্তা করতে শেখাচ্ছে?
বরং ভোগের সামগ্রী হিসেবে চিন্তা করতে শেখায়।
এরপর এই অবস্হায় যখন বলেন, নারীকে সম্মান করতে হবে, মায়ের-বোনের দৃষ্টিতে তাকাতে হবে, সেটা অনেকের মগজ মেনে নেয় না। কারণ পরিবেশ থেকে নারী সম্পর্কে তার মগজে একটা ধারনা প্রতিষ্টিত হয়েই আছে – ভোগ্যপণ্য!

এই ধারনা বা বিশ্বাস থেকেই থেকেই ৬ বছর, ৬০ বছরের নারী কিংবা বোরকাবৃতা, যেই হোক ধর্ষণেচ্ছা থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না।

মেডিকেলীয় টার্ম তথা প্যাথলজিতে প্রত্যেক রোগের তিনটি ডায়মেনশন আছে–Agent (রোগের কারণ), Host (যার মধ্যে রোগের কারণ বা জীবাণু আক্রমণ করে) এবং Environment (যে পরিবেশে রোগ হয়)।

উদাহরণস্বরূপঃ টাইফয়েড রোগের এজেন্ট- হচ্ছে সালমনেলা ব্যাকটেরিয়া। হোস্ট– টাইফয়েড রোগী, যিনি ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত পানি/খাবার ভক্ষণ করেছেন। আর পরিবেশ হচ্ছে–দূষিত পানি/খাবার।
আবার সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এজেন্ট– অদক্ষ/মাদকাসক্ত ড্রাইভার। হোস্ট– ফিটনেসহীন গাড়ি আর এনভায়রনমেন্ট– আঁকাবাঁকা রাস্তা, রং পার্কিং, অস্পষ্ট রোড সাইন।

এই এজেন্ট, হোস্ট এবং পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ায় রোগ হয়।

ধর্ষণ একটি নৈতিকতা জনিত রোগ, যার এজেন্ট– বিকৃত কাম নৈতিকতা বিবর্জিত পুরুষ। হোস্ট– নারী আর পরিবেশ– যৌন সুড়সুড়িময় পরিবেশ যেটির কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

এখন মেডিকেলীয় পদ্ধতিতে টাইফয়েড নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে (সালমনেলা ব্যাক্টেরিয়াকে মেরে ফেলার জন্য তথা এজেন্ট কন্ট্রোল করার জন্য)। দূষিত খাবার খাওয়া/পানি পান করা যাবে না (হোস্ট কন্ট্রোল) এবং পানিদূষণ ও খাবারদূষণ বন্ধ করতে হবে (এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল)।

তেমনি সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে ড্রাইভারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, তাদের মধ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণ (এজেন্ট কন্ট্রোল), ফিটনেসবিহীন গাড়ির রুট পারমিট বাতিল (হোস্ট কন্ট্রোল), আঁকাবাঁকা রাস্তা, রং পার্কিং, অস্পষ্ট রোড সাইন বন্ধ করতে হবে (এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল)।

তেমনি ধর্ষণ বন্ধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক উন্নত শাস্তি,
পুরুষদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা জাগ্রত করা (এজেন্ট কন্ট্রোল)। নারীদের সভ্যভাবে চলতে উদ্বুদ্ধকরণ (হোস্ট কন্ট্রোল) এবং নাটক, গান, গল্প সাহিত্য, বিজ্ঞাপনসহ সমস্ত পরিবেশে নারীকে পণ্যরূপে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে (এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল)।

আমার আছে অ্যান্টিবায়োটিক, আমি ইচ্ছামতো বিশুদ্ধ, দূষিত সব খাবো কিন্তু টাইফয়েড হবে না– এটা হয় না।

তেমনি নৈতিকতাবোধ জাগ্রত না করে, নারীদের সভ্যভাবে চলতে না বলে, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ না করে, শুধু পুরুষদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ হবে না।সব অনুষঙ্গ সমন্বয় করতে হবে।’সুপার ইগো’প্রকটতা উন্নত করতে হবে।

কারণ আইনের দৌড় খুব সীমিত। সন্তান মাকে হত্যা করছে, মা সন্তানকে হত্যা করছে, স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করছে– আইন এখানে কী ই বা করবে? পাহারা দিয়ে, আইন করে অন্যায় বন্ধ করা যায় না; যদি না মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। ধর্ষণে প্রথম স্থান (সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী) অধিকার করে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে।

———–+—-
লেখক :
ইন্সপেক্টর অব পুলিশ।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ।

Top