শিক্ষাঙ্গনে নুসরাত প্রতিবাদের এক নাম

IMG_20190621_194357.jpg

মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন খালেদ
এডভোকেট, বাংলাদশ সুপ্রীম কোর্ট।

নুসরাত প্রতিবাদের এক নাম; তার লিখা ‘আমি লড়বো, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়বো’। একজন শিক্ষকের যৌন সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করে জীবন দিতে হলো তাকে। পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে আজ শিক্ষার্থী কতটুকু নিরাপদে? মানবাধিকার, অগ্রগতি ও প্রগতির একুশ শতকে ধর্মীয় বাঁধা, সামাজিক কুসংস্কার কাটিয়ে নারীরা এগিয়ে আসছে মানুষের ভূমিকায়, আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে। কিন্তু তাদের অগ্রযাত্রায় যৌন নিপীড়ন ও ইভটিজিং বিশাল প্রতিবন্ধকতার ভূমিকা পালন করছে যা নারী শিক্ষা ও তাদের জীবন যাত্রায় প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নারী নির্যাতনের সংখ্যা দ্রæত হারে যেন বেড়ে যাচ্ছে। আগামীতে সেই নির্যাতনের সংখ্যা কোথায় দিয়ে দাঁড়াতে পারে তা সচেতন মহল একটু ভাববেন বলে আশা করি। সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতায় এসে বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশের নারীরা প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে। সাধারনত আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্টে প্রত্যেক নারী পুরুষের স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। আর সেই নারীমুক্তি, নারীর মর্যাদা, নারীর অধিকার, নারী শিক্ষার কথা বলেছে ইসলাম আজ থেকে ১৪৩৯ বছর আগে। কিন্তু বিশ্ববাসী তা শুনতে পেয়েছে কি? শুনলেও কান দেয়ার সময় পায়নি। এমনকি মুসলিম সমাজেও বিষয়টা হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেনি। নারী শিক্ষার বিষয়টি আমাদের সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে অপরিহার্য বিষয় হিসেবে জড়িত। আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই মৌলিক অধিকার সমান ও অভিন্ন। একুশ শতকে পদার্পন করে বর্তমান বিশ্ব যে সমাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পালাবদলে অংশ নিচ্ছে নারী সেখানে এক অপরিহার্য অংশীদার, জীবন যুদ্ধেও অন্যতম শরীক ও সাথী। এককালে মাতৃতান্ত্রিক সামাজে নারীরা ছিল প্রধান্য। তাই প্রাচীন হিন্দু বৌদ্ধ সাহিত্যে শিক্ষিত নারীর দেখা মেলে। কিন্তু পরবর্তী কালে সমাজে পুরুষের প্রধান্য প্রতিষ্টিত হলে নারী হয়ে পড়ে অন্তপুরবাসী। আধুনিক কালে নারীর স্বতন্ত্র মানবিক ভূমিকা স্বীকৃত হয় পাশ্চাত্যে। ভারতে ইংরেজ শাসন শুরু হলে উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার হাওয়া লাগে। যে হাওয়ার নারী আবার শিক্ষার অঙ্গনে আসার সুযোগ পায়। ইউরোপীয় জীবন ব্যবস্থায় নারী পুরুষের সমমর্যাদা হিসেবে অবাধ মুক্ত জীবনছন্দ এদেশের নবজাগ্রত বুদ্ধিজীবী মানসে ডেউ তোলে নারী প্রগতির ভাবপ্রবাহের। এঙ্গেলস তাঁর ‘‘অরিজিন অব দ্য ফ্যামিলি’ গন্থে বলেছেন, ‘‘নারী মুক্তি তখনই সম্ভব যখন নারীরা সমাজের প্রতিটি কর্মকান্ডে সমগুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে’’। আর নারীকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে, নারীর উন্নয়নের জন্যে, এক কথায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে দরকার সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার অবসান। প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। বর্তমান সভ্য সমাজে শিক্ষা ছাড়া সবই অচল। তাছাড়া কোনো স্বাধীন জাতির পক্ষে নিরক্ষর ও মূর্খ থাকা এবং বিশ্বজগৎ, জীবন ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে অজ্ঞান থাকা জাতীয় মর্যাদার পক্ষে হানিকর। আর সেই শিক্ষা লাভ করতে গিয়ে বাংলাদেশের নারী সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথে বাঁধা দূর হয়নি। যদিওবা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় জীবনে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়, গণতান্ত্রিক চেতনার ব্যাপক স¤প্রসারণ ঘটে এবং সমাজে নারী পুরুষের সমান মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি পায়। শিক্ষা মানুষকে বাঁচতে শেখায়। অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলোকিত মানুষ গড়ার কারখানা আর শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন যৌন নিপীড়নের মত ঘটনা? আসলে সংলাপগুলো একদিক দিয়ে লজ্জাকর অন্যদিক দিয়ে বেদনাদায়ক। পবিত্র শিক্ষাঙ্গন গুলো অপবিত্র করতে যাচ্ছে এক শ্রেণীর নিপীড়ক, কিছু কুচক্রিলোক। যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মহান এ পেশায় কিছু কুলাঙ্গার ঢুকে পড়েছে, যারা রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের খরব পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। দেশবাসী এসব সংবাদ দেখে, যা ছিল তাদের অপ্রত্যাশিত এবং অনাকাঙ্খিত। একের পর এক বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে চলছে। ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্ধি দিয়েছিলেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষক। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর তৎকালীন হাকিম ফৌজদারী কার্যবিধি’র ১৬৪ ধারায় তার জাবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। পরে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে রিমান্ডের সময় শেষ হওয়ার আগেই নিজেই ঘটনা পুলিশের কাছে স্বীকার করে। জবানবন্দিতে বলেন, স্কুলের কাছে বাসা ভাড়া নিয়ে তিনি ছাত্রী পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ধর্ষিত ছাত্রীটি তার কাছে পড়তে শুরু করে। একদিন মেয়েটি একা পড়তে আসে, তিনি মেয়েটিকে অপেক্ষা করতে বলে অন্য মেয়েদের চলে যেতে বলে। এরপর মেয়েটিকে ধর্ষন করে। সম্প্রতি নুসরাত এর ঘটনা। নুসরাত এক করুণ শোকের নাম হয়ে থাকবে। মাদ্রাসার সেই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তার এই পরিণতি। বর্ণিত এই ধরণের শিক্ষককে কি সত্যিই মানুষ গড়ার কারিগর বলা যায়? আমি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি শিক্ষাঙ্গন হচ্ছে জ্ঞান চর্চার সর্বোৎকৃষ্ট অঙ্গন। এই অঙ্গন গড়ে তোলে জাতির ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। পৃথিবীর যে কোন বড় সামাজিক দায়িত্বপালন করে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুঃখজনক হলে অপ্রিয় সত্য যে, এরধরণের কুচক্রিলোকদের কবলে শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যাচ্ছে। জাতির আশা আকাঙ্খার প্রতিফলক এই শিক্ষাঙ্গন যোগ্য নাগরিক উপহার দিতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিবছর কোননা কোন শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা গ্রহণে যাওয়া ছাত্রী ধর্ষিতা হয়ে, যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসছে। অথচ এদের কাছ থেকে পরিবার যেমন অনেক কিছু আশা করে তেমনি জাতিও অনেক কিছু আশা করে থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনকে এদের কবল থেকে মুক্ত করে শিক্ষা এবং জাতির মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করা আবশ্যক। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যে কোন আইনে নারীর ওপর অত্যাচারের বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। সিডো সনদের ১ অনুচ্ছেদের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘শরিক রাষ্টগুলো নারীকে সব ধরণের অবৈধ ব্যবসায় এবং দেহ ব্যবসায়ের আকারে নারীর শোষণ দমন করার লক্ষে আইন প্রণয়নসহ সব উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’’। দেশীয় আইনেও এমন অনৈতিক ও মানবতাবিরোধী কাজের বিচার করা আবশ্য কর্তব্য। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(২) ও ৩৪(১) অনুযায়ী গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে এবং সব ধরনের জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ ও আইনত দন্ডনীয়। এছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে রয়েছে সর্বাচ্চ শাস্তির বিধান। আজকাল পত্র পত্রিকার পাতা খুললেই ‘ইভটিজিং এর শিকার’ নির্মম সংবাদ শরীর শিউরে ওঠে। ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে যেসব বিষয় সমাজে বহুদিন ধরে অস্থিত্ব বজায় রেখেছে তার মধ্যে এই ইভটিজিং বিশেষ অগ্রগন্য। এ অমানবিক বিষয়টি মানুষকে অবমূল্যায়ন করছে। বৃদ্ধি করছে সামাজিক সমস্যা, নিয়ে আসছে সমাজ জীবনে অনাকাঙ্খিত বিপুল দুঃখ দুর্দশা।
ইভটিজিং কি ঃ ইভটিজিং একটি ইংরেজী শব্দ। এই শব্দটার সাথে জড়িয়ে আছে শোক, বেদনা এবং নির্মম পরিহাস। যার অর্থ উত্যক্ত করা শাব্দিক অর্থে উত্যক্ত করা বুঝালেও ত্রæটির ব্যাপকতা রয়েছে। স্বাধীন দেশ আমাদের দেশের প্রত্যেক নারী পুরুষের রয়েছে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার কিন্তু চলার পথে এমনকি কর্মক্ষেত্রে কিশোরী ও তরুণীদের বিরক্ত করা, কুপ্রস্তাব দেওয়া, শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা ইত্যাদি অবৈধ ও অনৈতিক কর্মকান্ডের প্রস্তাব করা হচ্ছে ইভটিজিং যা আমাদের সমাজে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ইভটিজিং একটি মারাত্মক রূপে পরিগণিত হচ্ছে। ইভটিজিং এর শিকার একটি পরিবারের অবস্থা কত যে করুণ হয়ে পড়ে তা আমরা প্রতিনিয়ত পত্রিকার কলাম থেকে দেখতে পাই। প্রতিনিয়ত সংবাদ পত্রে যেসব খবর প্রকাশিত হয় তা নিষ্টুর বখাটে যুবকের নির্মম কাজেরই পরিচায়ক। ব্যক্তিগতভাবে এর শিকার কিশোরী তরুণীরা লজ্জা গোপন করার জন্য কত আত্মদান লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে তারও কোন ইয়াত্তা নেই। আইন আছে, সমাজে ঘৃণাও আছে। তবুও দুষ্ট ক্ষতের মত এই বিষয়টি সমাজ জীবনে নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে আছে। কত নিরপরাধ কিশোরী-তরুণীর জীবন যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। আজ আমাদের সমাজটা অবক্ষয়ে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। আমাদের দেশের মতো দেশের বেকারত্ব, হতাশা, উপযুক্ত বিনোদনের অভাব, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না করা, সর্বোপরি প্রত্যেক ধর্মের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসনগুলো সঠিকভাবে পালন না করার জন্য ইভটিজিং ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। যথার্থ উদ্দেশ্য থেকে মানবমন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে অবক্ষয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। নৈতিক মূল্যবোধ ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। এগুলোর জন্য দায়ী আমাদের যুব সমাজের সঠিক মনুষ্যত্ববোধের অভাব। যখন তাদের চরিত্র থেকে মহৎ গুণ বিদূরিত হয়ে অন্যায় অনাচার আশ্রয় নেয়। জীবনের কোন মহৎ লক্ষ্য থাকে না তখন এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। তারা বখাটে হিসেবে পরিচিত হয়ে যায় এবং বখাটেদের সমস্ত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকে তারা সুস্থ জীবন থেকে আলাদা হয়ে ঝুকে পড়ে অবক্ষয়ের গহীন আবর্তে। তাছাড়া সমাজ জীবনে চলতে গেলে বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই বন্ধুত্বের মধ্যে যদি “ছেলে” এবং “মেয়ে” এই শব্দের দূরত্ব থাকে তখন মেয়েদের সাথে বন্ধুত্বটা ছেলেদের কাছে আড্ডার, আলোচনার দুফোঁটো রস যোগানোর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এই দিক দিয়ে একটি ছেলের বখাটেপনা শুরু। আমাদের এও জেনে রাখা দরকার যে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত ছেলেরা পিতামাতার বাধ্য থাকে। বর্তমান প্রেক্ষপটে দেখা যায় ছেলেরা আড্ডার টেবিলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে কে কার চেয়ে বেশি মেয়েদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে বা তারা নির্দিষ্ট একটি এলাকায় বা স্থানে দাঁড়িয়ে থেকে স্কুল বা কলেজের সুন্দর মেয়েদের বিরক্ত করতে পারবে। এর ফলে যা হয় তা মুখে বলতে হয় না। আর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস দেখায় কে? যদি কোন রাজনৈতিক নেতার আশ্রিত হয়। ফলে অভিযোগ করলেও সেটার আর গুরুত্ব থাকে না। প্রমাণ আমাদের সামনে, সংবাদ মাধ্যমগুলোর উপস্থাপনা দেখলে দেখা যায়। প্রতিদিন ইভটিজিং এর কারনে অনেক মেধাবী প্রাণ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কত মেধাবী ছাত্রী অকালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে থাকে কারন তার ঘরের মধ্যেই তার বৈষম্যের কারনে সে বিষয়টা পরিবারে আলোচনা করার সাহস পায় না। যদি করেও থাকে সেক্ষেত্রে তার পরিবার তার বিয়ে দেওয়ার মতো নজির আমাদের সামনে আছে। ইভটিজিং এর বিরুদ্ধায়ন করার ফল হিসেবে সা¤প্রতিক শিক্ষক খুনের নজিরও আমরা পেয়েছি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত মেয়েদের ভাগ্যে বকা ছাড়া আর কিছু জুটে না। সচেতন পিতামাতা হলে অনেক সময় তাদেরও লাঞ্চিত হতে হয় এই বখাটেদের হাতে। তাছাড়া অনেক সময় আপত্তি করলেও আরো বেশি করার নজিরও আমরা দেখেছি। ছাত্রীদের প্রতি এই ধরণের আচরণের দিকে তাকালে দেখি বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্রীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এতে করে ছাত্রীরা বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার শেষ ভরসাটুকু হারিয়ে ফেলে এমনকি অভিভাবকরা পর্যন্ত হতাশ হয়ে পড়ে। এখন প্রশ্ন, আমরা, আমাদের সচেতন নাগরিক সমাজ, আমাদের মেয়েদেরকে এই বখাটেপনার শিকারের দিকে টেলে দিয়ে তাদের জীবন যাপনে বাঁধা বা আত্মহত্যার বিষয়ে চুপ করে থাকতে পারি? আমাদের ভরসা হলো অনেক দেরিতে হলেও বর্তমান সরকার ইভটিজিং রোধে অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমরা তাই স্বাগত জানাই।
ইভটিজিং এবং যৌনপীড়ন এর শাস্তি কি হতে পারে ঃ ইভটিজিং দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৫০৯ ধারায় দন্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া স¤প্রতি সরকার সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছর কারাদÐ এবং ৫০,০০০ টাকা জরিমানার বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করেছেন এমনকি ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমেও সর্বনিম্ন ১ বছর কারাদÐ ও ৫,০০০ টাকা জরিমানার বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারী করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এর ১০ ধারায় যৌনপীড়ন এর শাস্তি হিসেবে অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন ৩ বছর সশ্রম কারাদÐের বিধান রয়েছে এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থ দÐও রয়েছে। আর যদি নারীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে বা অশোভন অঙ্গভঙ্গি করে তাহলে অনধিক ৭ বছর অন্যূন ২ বছর সশ্রম কারাদÐ এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদÐ। উক্ত আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদÐেরও বিধান রয়েছে।
ইভটিজিং প্রতিরোধে আমার অভিমত ঃ আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমাদের মেয়েদেরকে পুরুষতান্ত্রিকতার বাইরে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে দেওয়াটাই ভালো হয়। এতে করে তাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। তখন নিজে নিজেই ইভটিজিং রোধের সুযোগ পাবে, ফিরে পাবে তাদের মানসিক দক্ষতা। সমাজে ছেলে এবং মেয়ের দূরত্বটুকু কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তা যেনো লোক দেখানো না হয়। আর সবচেয়ে যে দিকটা আমাদের বর্জন করা উচিত তা হলো বিদেশী সংস্কৃতি চর্চা, যাতে মেয়েদের উক্তত্য করার মতো অনেক উপাদান আমাদের চোখে পড়ে। আমি বলছি না সব বর্জন করা উচিত। তবে আগে দেশপ্রেম গড়ে উঠতে উপাদান গুলো ছেলেমেয়েদের দিতে হবে অর্থাৎ দেশীয় সংস্কৃতির শিক্ষা এবং তারপরে ঐগুলোর প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে যদি শিক্ষনীয় হয়ে থাকে। তাছাড়া বর্তমানে দেখা যায় সংবাদপত্র অপসংস্কৃতি প্রচারের আরেকটি মাধ্যম। বেশিরভাগ সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকায় নগ্ন ছবি, যৌবনাবেগ বিষয়ে কথিকা, রসকথা ইত্যাদি প্রবেশ করে তরুণ-তরুণীদের অবক্ষয়ের পথ প্রশস্ত করে দেয়া হচ্ছে। খুন, গুন্ডামি, চুরি-ডাকাতি এসব কাহিনীর রসগুলোতো রয়েছেই। সমাজের উপর সিনেমা, টিভি, বিভিন্ন প্রকার সংবাদপত্র এসবের কুপ্রভাব অত্যন্ত বেশি। সিনেমার কাহিনী, নাচগান, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি এমনভাবে সন্নিবেশিত যে তাতে সমাজের যুবশ্রেণী অতি সস্তায় ও সহজে আমোদ প্রমোদের উপকরণ খুঁজে পায়। তারা অনেক সময় এসব উদ্ভট ও অবাস্তব কাহিনীকে বাস্তব জীবন বলে চালিয়ে দিতে গিয়ে মারাত্মক ভুল করে। নানা প্রকার বিজ্ঞাপন প্রচারের কারণে যুবকেরা ভোগ ও বিলাসিতার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনের যত্রতত্র ব্যবহার বিশেষ করে উঠটি বয়সের ছেলেদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করেছে যা ইভটিজিং এর জন্য অনেকাংশ দায়ী বলে ধরা হচ্ছে। তাই এই ইভটিজিং প্রতিরোধে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের দেশে আগত বিদেশী সংস্কৃতির গতিপথ নিয়ন্ত্রিত করতে হবে সমাজের সচেতন মানুষকে এবং সরকারকে। বিদেশী সংস্কৃতির যে অংশটুকু ইতিবাচক তাহাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। নেতিবাচক অংশটুকু বর্জন করা আবশ্যক। শাসন ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করে তুলতে হবে কেননা দুর্বল শাসন ব্যবস্থা দেশের পরিবেশ কলুষিত করে। আমাদের মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। স্কুল, কলেজ, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা আবশ্যক। একটি জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে এই ধরণের অবক্ষয়। তাই সৎ, আদর্শ ও ন্যায়পরায়ন মানুষে সমাজ পরিপূর্ণ করে তুলতে পারলেই জাতির প্রকৃত উন্নতি ঘটবে এই ব্যাপারে সকলকে সচেতন হতে হবে।
এরই পরিপেক্ষিতে আমি মানবাধিকার কর্মী হিসেবে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ এর পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত সুপারিশ সমূহ বাস্তবায়নের জোর দাবী জানাচ্ছি-মেয়েদের প্রতি বখাটেদের উৎপাত বা ইভটিজিং বন্ধে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ছেলে মেয়ের বৈষম্য দূর করা, প্রচলিত আইনে দূর্বলতা কমিয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন। ইভটিজিং বন্ধে সামাজিক আন্দোলন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন ও আধুনিকায়ন করে সঠিক ও যথাযথভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বিচার দ্রæত সম্পন্ন করতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশকে সংশোধন ও আধুনিকায়ন করে যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের দিক নির্দেশনার অনুকরণে আইন প্রণয়ন করা। ইভটিজিং আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, সামাজিক সংগঠন, সেচ্ছাসেবক সমিতি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও পাড়ায় পাড়ায় মহল্লা কমিটি গঠন করে তাদের পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যৌথ উদ্যোগে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যৌন হয়রানি, ইভটিজিং ও নারী অবমাননার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে সরকারী ব্যবস্থাপনা পরামর্শকেন্দ্র চালু করা এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দ্বারা ক্লাশের ব্যবস্থা করা। আত্মহত্যার ঘটনা পত্রিকায় বা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার বন্ধ করা। হত্যা ঘটনাকে আত্মহত্যা মামলা হিসেবে রুজু করার প্রবণতাকে কঠোরভাবে দমন করা। অধিক কর্মক্ষেত্র তৈরী করে বেকারদের কাজের ব্যবস্থা করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সময় তার স্বভাব চরিত্র ও বংশ মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ আপনারাও যেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি এই ব্যাপারে অধিক যত্মবান হউন। শিক্ষকদের দ্বারা যাতে আর কোন ছাত্রী নির্যাতিত না হয়। যেন তাদের নিজের কন্যার মতো আচরন করা হয়। কারণ দিবসের একটি বড় সময় ছাত্র-ছাত্রীরা আপনাদের সাহচর্যে থাকে। বাবা-মার কাছ থেকে যা কিছু শিখে তার চেয়ে অনেক বেশী জ্ঞান অর্জন করে একজন শিক্ষকের নিকট থেকে। সুতরাং তাদের সম্পর্ক যাতে হয় পরম পবিত্র। কিছু সংখ্যক শিক্ষকের কারণে যেন নষ্ট না হয় সমগ্র শিক্ষক জাতির সম্মান ও শ্রদ্ধা। এ ব্যাপারে আপনাদেরকে বিশেষভাবে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। পরিশেষে সকল সচেতন নাগরিককে উদাত্ত আহবান জানাবো, আসুন আমরা যার যার অবস্থানে থেকে এ অমানবিক সংকট উত্তোরণের সম্মিলিত প্রয়াস চালাই। আজ আমাদের শ্লোগান হোক-
‘‘আর না আত্মহনন, সকল প্রকার সহিংসতা প্রতিরোধে আমরা হবো বদ্ধ পরিকর’’

লেখক ঃ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্ম

Top