ওদের আনন্দ দেখে আবারো একপশলা চোখের জল মুছলাম আমি !!

64556484_2520690867940997_1566092822996582400_n.jpg

আমিনুল ইসলাম আরিফ :

ক’দিন আগে আম্মার নতুন জুতাটা একটু ছিড়ে যাওয়াতে সেটা বাজারে মুচির কাছে নিয়ে গেলাম সেলাই করে আনতে,
আমাদের বাড়ির পাশেই বাজার হওয়াতে মুচি নারায়ণ কে বললাম জুতাটা ঠিক করে আমার চাচার দোকানে রেখে যাবেন, রাতেই না নিতে পারলে আম্মার মাইর আর আমার পিঠ।
নারায়ণ হেসে উত্তর করলো কেন “”আপনি এসে নিয়ে যাইয়েন বিশ মিনিট পর, কিন্তু উপজেলা সদরে আমার জরুরী কাজ থাকায় আমি এসে আপনাকে পাবোনা বলে বিদায় নিলাম।

তো আমার কাজ সেরে বাজারে আসতে আসতে রাত নয়টার মত বেজে গেল, এসেই চাচার দোকানে আম্মার জুতার খবর নিলাম, চাচাতো ভাই বললো নারায়ণ জুতা দিয়ে যায়নি,
পড়লাম মহা টেনশনে,
আম্মা বার বার বলে দিয়েছে জুতা নিয়ে যেতে।
মায়ের আদেশ যথাযথ পালন করতে নারায়ণ এর বাড়ির খুঁজ নিলাম, আমি চিনিনা বলে চাচাতো ভাই কে নিয়ে চলে গেলাম নারায়ণের বাড়ি।

ঘুটঘুটে অন্ধকার আর খুব সরু ও চিকন একন একটা রাস্তা দিয়ে ঢুকলাম নারায়ণের বাড়ি, আদো ছাওয়া আদো ভাঙা খুবি নড়বরে দু চালা একটা কুড়ে ঘর।
দরজার এপাশ থেকে টুকা দিলে নারায়ণ বের হলো, ঘরের ভিতরে বসতে বলাতে আমি তার ঘরে প্রবেশ করলাম।
কিন্তু ঘরে প্রবেশ করেতো আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম, আজকের দিনে এও সম্ভব!!!?

ভিতরে জায়গা নাই বললেই চলে, ছোট একটা ভাঙা চৌকি, তাতে তার দুই স্ত্রী আর একটা ছোট বাচ্চা কে নিয়ে গদাগদি করে বসবাস করে, একেকজন মানুষ প্রচন্ড গরমে ঘেমে হাশপাশ করছে।
আর সেই পূরনো দিনের কাষার তৈরী একটা খুপি বাতি জ্বলছে।
আমি নারায়ণের কাছে খুব কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইলাম বিদ্যুত চলে গেছে বুঝি?
নারায়ণ অত্যান্ত সরল উত্তর দিয়ে- ” ভাই ঘরে কারেন্টের লাইন থাকলেতো তার কথা আসবে” আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলাম বাজারের পাশেই আপনার বাসা আসেপাশে সব জায়গায় বিদ্যুত, আপনার বাসায় নেই কেন?
নারায়ণের অতি আবেগি জবাব, -“আমি একটা বৃদ্ধ মানুষ, একটা ছেলে আছে সেও ছোট শিশু, অসুস্থ শরীর তাই পরিশ্রমের কাজও করতে পারিনা, গ্রামের বাজারে সামান্য জুতা সেলাই করে যা উপার্জন হয় তাতেইতো সবাই তিন বেলা খেতে পারিনা, কাপড়ের অভাবে বাজারে যাই খালি গায়ে,
আমার দ্বারা কারেন্ট চালানো এতো স্বর্গ সুখের মত””

আমি আর কি বলবো,- ওদের অবস্থা আর তার কথা শুনেই কন্ঠ ভার হয়ে গেল, চোখের কোণে জল গড়িয়ে পরাটা তার দৃষ্টির বাহিরে যায়নি, বলতে লাগলো, ” আমরা মুচি, নিচু জাতের মানুষ বড়লোকেরা আমাদের কষ্ট যে কি, তা কখনো বুঝবে? এই নেন আপনার জুতা””

আমি তার হাত থেকে জুতা নিয়ে বিদায় নিলাম, আর বাজার থেকে বাড়ির পথে হাটতে লাগলাম, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল আমার জিবনি শক্তি শেষ হয়ে গেছে, কোথায় হাটছি আর কোথায় যাচ্ছি তা যেন আমি ভুলেই গেছি।

শুধু একটাই চিন্তা মাথায় প্রেসার দিয়ে যাচ্ছে, – আমিতো এখন ঘরে গিয়েই বৈদ্যতিক বাতি জ্বালাবো, ফ্যানের বাতাস গায়ে মাখবো, কিন্তু এই হতদরিদ্র নারায়ণ তার পরিবার নিয়ে এই গরমের রাত গুলো কি ভাবে কাটাবে!!?
সেওতো আমারি মত মানুষ, তারওতো সখ আহ্লাদ আছে, আমি যেমন সামান্য গরমে অস্থির হয়ে পড়ি, তারওতো কষ্ট হয়, সেতো আমার মত সুখটাকে উভোগ করতে পারছেনা।
এসব চিন্তা অস্থির করে ফেলছিলো আমাকে, রাতে বার বার ফ্যানটা বন্ধ করে দিয়েছি কিন্তু গরমে তো আর থাকতে পারিনা, তাই আবারো চালাতে হয়েছে।

না, পরদিন আর বিলম্ব করতে পারলামনা, বাজারে বিদ্যুতের যে সব সরঞ্জাম পাওয়া যায়, তাই নিয়ে রওয়ানা হলাম নারায়ণের ঘরে, অনুমতি চাইলাইম তার ঘরটাকে আলোকিত করার।
নারায়ণ ভয় পেয়ে বসলো, বললো, “” না না ভাই, আমার কারেন্ট লাগবেনা, আমি কারেন্টের বিল পাবো কোথায়? ফকিরের দ্বারা কি আর হাতি পালা সম্ভব বলেন?
বন্ধু ইমনকে নিয়ে গিয়েছিলাম সাথে করে, তাকে বলাম বুঝিয়ে বল, বন্ধু বললো বিদ্যুতের বিল নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবেনা, সেটাও ওই দিয়ে যাবে প্রতিমাসে।

নারায়ণ চোখ ছল ছল চোখে স্তির তাকিয়ে আমার দিকে,
বললো, আমি একটা মুচি, আপনাদের জুতা সেলাই করে খাই, নোংরা পরিবেশের নোংরা মানুষ, কেন আমার জন্য আপনি এগুলো করতে যাবেন?
আমি বললাম,- প্রচুর টাকা পয়সা থাকলেই মানুষ পরিষ্কার হয়না, যদি না তার আত্তা পরিষ্কার হয়।

ইলেকট্রিশিয়ানের জন্য প্রায় তিন ঘন্টা অপেক্ষার পর
অবশেষে আলোকিত হলো নারায়ণের ঘর, সেই সাথে ফ্যানের বাতাস।
সত্যি তার আর তার স্ত্রী নিয়তির হাসিটা ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখার মত ছিল।
ওদের আনন্দ দেখে আবারো একপশলা চোখের জল মুছলাম আমি।
বন্ধুগণ, সে হিন্দু হতে পারে, অথবা যে কোন ধর্মের কিন্তু আমিতো মুসলিম, তার ধর্ম জাত আলাদা হতে পারে, কিন্তু সেওতো মানুষ, তাছাড়া ধর্ম উৎসব যার যার, কিন্তু মানবতা তো সবার, তাইনা???
———————–

Top