আরিফ ইকবাল নূরের লেখা- “বেহেশতের মাটি”

received_1988260044612378.jpeg

——————-
ফাহাদ ক্লাসের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট।প্রতিটি পরিক্ষায় সে প্রথম স্থান অধিকার করে।ফাহাদ মায়ের অনুগত ছেলে মা-কে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতেও তার ভীষণ কষ্ট হয়,এ কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না,শুধু অনুভব করা যায়।তার কাছে একমাত্র সুখ হল মায়ের হাতের আদর,আর সবচেয়ে কষ্ট মায়ের চোখের জল।মায়ের কাছে সে কতটা ঋণী,তা তার ছোট ভাই মিহাদের জন্মের পর অনুভব করে।
পাশের ঘরে ঘুমাতো ফাহাদ এক রাত্রে তার ছোট ভাই জোরে জোরে কান্না করতেছিল।কান্না শুনে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়।তখনো তার মা-বাবা জেগে আছে তার বাবা মাকে বললেন তুমি ওকে একটু থামাও।মা মিহাদকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে এদিক-ওদিক হাটতে লাগলেন।মিহাদ একটানা কেঁদেই চলছে আর মা নরম সুরে গুনগুন করে কি যেন বলে তাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতেছে।
ফাহাদের বাবা বিছানা থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।আবার কিছুক্ষণ পর তার বাবা ঘরে ফিরে এলেন।তার মা জিজ্ঞেস করলেন এতরাতে কোথায় গিয়েছিলেন?
তার বাবা বললেন মায়ের করবটা দেখতে গিয়েছিলাম।
মা বললেন এত রাতে কেন?তার বাবা উক্তর দিল আমাদের বাচ্চাটি যখন কাদঁতেছিল তখন আমার খুব বিরক্ত লাগছিল।কিন্তু তুমি ওকে কাঁধে নিয়ে আদর করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করতেছ।কারণ তুমি তার মা তখনি মনে পড়ে গেল আমি যখন ছোট ছিলাম তখনই আমার মাও আমাকে এভাবেই যত্ন করেছিল।তাই মায়ের কবরটা যিয়ারত করতে গিয়েছিলাম।আজ আমি মায়ের যত্নে এত বড় হয়েছি।কিন্তু জানিনা আমার মা সেখানে কতটুকু যত্নে আছে।বাবা-মায়ের এরূপ কথা শুনে ফাহাদের মায়ের প্রতি ভালোবাসা আরো নিবিড় হয়ে গেল।সে মনে মনে ভাবতেছে আমার জন্যও মা এমনটি করেছে।স্মৃতির সাগরে ভাসতে ভাসতে সে মনে মনে বলতে লাগল-
মা যে আমার দুঃখের সাথী
সুখের দিনের হাসি,
তাইতো আমি এত বেশী
মাকেই ভালোবাসী।

পরের দিন ফাহাদ স্কুলে উপস্থিত হল।ক্লাসে শফিক স্যার বললেন,কেউ কি বেহেশতের এক মুঠো মাটি এনে আমাকে দেখাতে পারবে?
আমি তোমাদের একদিন সময় দিলাম।স্যারের এমন কথা শুনে সবাই হতভাগ।কিভাবে তারা বেহেশতের মাটি এনে স্যারকে দেখাবে।তারা শুধু বেহেশতের নামই শুনেছে,আবার মাটি কোথায় পাবে।
স্যারের ক্লাস শেষ হওয়ায় তিনি কিছু না বলে বিদ্যুৎ গতিতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।সেদিন সবাই বিষয়টার চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফিরলো।
পরের দিনের ঘটনা
স্যার ক্লাসে প্রবেশ করলেন।স্যার বললেন আমি যে তোমাদের কাল বলেছিলাম বেহেশতের এক মুঠো মাটি আনতে,কে কে আনতে পেরেছ?ক্লাসের অবস্থা থমথমে কেউ কিছু না বলে চুপ হয়ে রইল।তখন দাঁড়িয়ে ফাহাদ বলল স্যার আমি এনেছি।স্যার বললেন তুমি আমার সাথে ইয়ার্কি করতেছ।আর কেউ আনতে পারেনি তুমি কিনা আনতে পেরেছ।কোথায় তোমার বেহেশতের মাটি?সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ব্যাগ থেকে মাটিগুলো বের করল স্যার মাটিগুলো হাতে নিয়ে বাহিরে ছুড়ে মারলেন।তখন তার চোখ দু’টি অশ্রুসজল হয়ে উঠল।স্যার বললেন সত্যি করে বল মাটি কোথা থেকে এনেছ।সে বলল আমার মায়ের পায়ের নিচ থেকে এনেছি।আপনিই একদিন ক্লাসে বলেছিলেন মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।তখন স্যারের আর বুঝতে বাকি রইল না,সঙ্গে সঙ্গে ফাহাদকে নিজের বুকে টেনে নিলেন।ক্লাসের সবই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।স্যার ছাত্র-ছাত্রীর উদ্দেশ্য বললেন তোমরা সবাই মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।স্যার আরো বললেন একদিন এক ব্যক্তি রাসুল(স) এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন,আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশী অধিকারি কে?রাসুল (স) বললেন তোমার মা।তারপর কে?তিনি বললেন তোমার মা।তারপর কে?তিনি এবারও বললেন তোমার মা।
তারপর কে? তিনি বললেন তোমার বাবা।স্যার হাদিসটি বলার সময় স্যারের দু’চোখ বেয়ে পানি চলে আসল।কারণ স্যারের মা কিছুদিন আগে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে না পেরার দেশে চলে গেছেন।স্যার ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে গেলেন।ফাহাদ ক্লাস ছুটির পর বাড়িতে গিয়ে মাকে জড়িয়ে বলতে লাগল-
আমায় ফেলে মাগো তুমি
কখনো চলে যেয়ো না,
তোমায় ছাড়া মাগো আমি
বাচঁতে পারব না।
খোদার কাছে প্রার্থনা
আমার এতটুক
সারাজীবন দেখি যেন
তোমার হাসি মুখ।
————–
আরিফ ইকবাল নূর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top