সামাজিক সম্প্রীতিতে তরুণ সমাজ

59503314_2239455523039349_717421488763830272_n.png

আমরা এমন একটি বিশ্বায়িত পৃথিবিতে বসবাস করছি যেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মানুষ; মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইউরোপিয়ান, আমেরিকান, এশিয়ান, বাংলাদেশি প্রভিতি। দেশ, জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা এগুলোর ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। আর বর্তমান বিশ্বায়নের প্রভাবে এ বৈচিত্রতা আরো তরান্বিত হচ্ছে। আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, মানুষ বিভিন্ন ধরণের হতে পারে কিন্তু আমরা সবাই মানুষ। আমরা কখনো নিজেদেরকে প্রশ্ন করি না যে আমরা কি আসলেই ভিন্ন? কোন ক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন? আর এ ধরনের বৈচিত্রতাকে বিশ্বশান্তি বিনষ্টের নিয়ামক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশে এ বৈচিত্রতার হার অনেক বেশি। এখানে রয়েছে হিন্দু, মুসলিম , বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ী, সমতলে বসবাসকারী, আরো আছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি। তাই পিছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশেও এ ধরনের সামাজিক সম্প্রিতি হানিকর ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের মূলে রয়েছে অন্য সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণু মনোভাব, অন্য মতাদর্শ বা সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব।

বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠিই তরুণ যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ ডেমগ্রাফিক ডেভিডেন্ট ভোগ করছে।দেশের ৬৫ শতাংশ লোকজন কর্মশীল আর মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ নির্ভরশীল। তাই তাদেরকে আর্থনৈতিক অন্তভূক্তির সাথে সাথে সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হলে এ বিশাল তরুণ কাজে লাগাতে হবে। আমরা আগেই দেখেছি আমাদের দেশে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় প্রধান অন্তরায় অন্য সংস্কৃতির প্রতি অসহিষ্ণু মনোভাব। তাই সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি সমাজ বিনির্মাণে সর্বপ্রথম দরকার সহিষ্ণু মনোভাব।তবে এ সম্প্রিতি প্রতিষ্ঠায় যেমন অন্তরায় আছে তেমনি সম্ভাবনাও আছে আকাশ ছোঁয়া।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তরুণ সমাজের মধ্যে সম্পৃতির এবং সহিষ্ণুতার মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমরা স্কুল এবং কলেজ পর্যায়ে একটি সাংস্কৃতিক মিলন মেলার আয়োজন করতে পারি। সেখানে প্রত্যেক ধর্ম, জাতি, নৃ-গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন ভাষাভাষীর তরুণরা একত্রিত হবে। তারা একই সাথে সময় অতিবাহিত করবে। তারা সেখানে দলীয় উপস্থাপন সহ সাংস্কৃতিক উপাদানও প্রদর্শন করবে। সাংস্কৃতিক বিভিন্ন প্রদর্শনীর মাধ্যমে তারা একে অপরের সাথে সংস্কৃতি বিনিময়ে করবে একে অপরের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবে তখন তাদের মধ্যে সহিষ্ণুতা সৃষ্টি হবে। মোটকথা এ এটি হবে একটি সাংস্কৃতিক সম্মিলন যেখানে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের তরুণরা তাদের আদর্শ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুভূতি পরস্পর বিনিময় করবে। এই কর্মশালার মাধ্যমে একজন আরেকজনের প্রতি সহিষ্ণু হতে শিখবে এবং পৃথিবীর সকল আদর্শ এবং মতবাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবে। তখন তাদের মনোজগতে সাংস্কৃতিক সহাবস্থান তৈরি হবে। আর তখনই সামাজিক সম্প্রীতি এবং বৈশ্বিক শান্তি নিশ্চিত হবে। বৈশ্বিকভাবে এ রনের আয়োজনের একটি রীতি থাকলেও জাতীয়ভাবে এ ধরনের আয়োজন করা অতীব জরুরী। আঞ্চলিক পর্যায়ে এ ধরনের কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। স্কুলগুলোতে সাপ্তাহিক মাসিক এ ধরনের আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে একটি স্কুলের বিভিন্ন ধরনের মানুষের বিভিন্ন ধরনের প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা তরুণদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে উঠবে যেটি হবে আমাদের সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি বড় মাইলফলক। এভাবে প্রতিটি তরুণ অন্যের মতামত এবং আদর্শের প্রতি সহিষ্ণু হবে শুধু তাই নয় তারা অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে। অন্য। শান্তি নিশ্চিত হওয়ার জন্য এ ধরনের মনোভাব অতীব জরুরী।

একটি পরিবারের কথাই ধরুন একটি পরিবারের একে অপরকে আমরা সহ্য করতে পারি একজন আরেকজনকে খুব কাছ থেকে চিনি একজন আরেকজনের আচার-আচরণ সম্পর্কেও জানি। তাই সে একটু ভিন্ন ধরনের আচরণ করলেও আমরা তা মেনে নিতে শিখি , তার প্রতি সহিষ্ণু হয় তার কারণ আমার পরিবারের সদস্য। দেশের প্রত্যেকটি তরুণ যখন সারা বাংলাদেশকে তথা সারা বিশ্বকে একটি পরিবার হিসেবে মনের ভিতর স্থান দিতে পারবে এবং সারা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে এই বৈশ্বিক একক পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে মেনে নিতে পারবে। তখনই শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে সামাজিক সম্প্রীতি ত্বরান্বিত হবে অন্যথায় সামাজিক সম্প্রীতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব নয়। আমরা যখন বিশাল তরুণ সমাজকে এই কর্মশালার আওতায় এনে তাদেরকে এই সহিষ্ণুতার শিক্ষায় শিক্ষিত করাতে পারব তখন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি পরিবারই এ ধরনের সহিষ্ণুতার চর্চার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হবে। সামাজিক সম্প্রিতি আপনা আপনি আমাদের হাতে এসে ধরা দিবে। এক ধর্মের মানুষের দ্বারা অন্য ধর্মের পবিত্র স্থানে আঘাত করতে দেখব না । ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠি বিবেচনায় কোন ধরনের সংঘাত আর দেখা দিবে না। তবেই তো বাংলাদেশ ডেমগ্রাফিক ডেভিডেন্টকে আর্থনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতিতে কাজে লাগাতে পারবে।

লেখক: জসীম উদ্দীন
ইমেইলঃ jashimuddindu807@gmail.com

Top