ঈদকে সামনে রেখে সীতাকুণ্ডের পর্যটন স্পটগুলো বর্ণিল সাজে সজ্জিত

received_1033031893534203.jpeg

মুজিবুর রহমান,সীতাকুন্ড থেকে —

পাহাড় এবং সমুদ্র বরাবরই আকর্ষণ করে ভ্রমণ পিয়াসিদের। প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়া আর বুক উজার করা সৌন্দর্য মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় জীবনের যাবতীয় হতাশা। এবারের ঈদে পাহাড়ি প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্য পেতে আর উচ্ছ্বল ঝর্ণার শীতল স্পর্শ পেতে হলে সীতাকুণ্ড হলো প্রকৃত স্থান। বর্ণিল সাজে সাজানো হচ্ছে সীতাকুণ্ডের পর্যটন স্পটগুলো। এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর কয়েকদিন বাড়তি বন্ধ থাকে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত থাকায় ব্যাপক পর্যটক সীতাকুণ্ডের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের বিনোদনে সীতাকুণ্ডের পর্যটন এলাকাগুলো প্রস্তুত রয়েছে। আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য নতুন সাজে সাজিয়েছে পর্যটন স্পটগুলো।

চন্দ্রনাথ পাহাড় ঃ

গিরিসৈকতের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডের মনোরম প্রাকৃতিক শোভাকে করে তুলেছে অপরূপ। ছোট-বড় পাহাড়ের শ্যামল বনানীর কোলে পাখিদের কিঁচির-মিচির, বিচিত্র সাপের আনাগোনা, বনহরিণের চঞ্চল ভল্লুকের বাদুরঝুলা আর ভর সন্ধ্যায় শেয়ালের হুয়াক্কাহুয়া-এর শ্যামল পাহাড়ের প্রাকৃতিক শোভাকে করে তুলেছে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের শীর্ষে রয়েছে সনাতন সমপ্রদায়ের পুণ্যস্থান চন্দ্রনাথ শিব মন্দির। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ১২’শ ফুট উপরে মোট ষোলশত সিঁড়ি বেয়ে শিব মন্দিরে উঠতে হয়। এই চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে রয়েছে আরো অর্ধশতাধিক মঠ ও মন্দির। মন্দিরে যাওয়ার পূর্বে আঁকা-বাঁকা পথ এক পলকে চোখ পড়বে পাহাড়ে জন্মানো প্রাকৃতিক হৈমন্তি, লেনটোনা ও সোনালুর বাহারী ফুল
অথবা দুরে সাদা কাঁশ ফুলের সমারোহ।


ইকো-পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন ঃ সীতাকুন্ড পৌরসদর থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে গেলেই ফকিরহাট এলাকায় বোটানিকেল গার্ডেন ও ইকোপার্ক। ১৯৯৬ একর ভুমির পার্কটি দুই অংশে বিভক্ত। এক হাজার একর জায়গায় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ৯৯৬ একর জায়গা জুড়ে ইকোপার্ক এলাকা। ৩টি পিকনিক স্পট, ৮টি বিশ্রাম ছাউনি সম্বলিত ইকোপার্কে রয়েছে- পাহাড়ের মাঝে সৃজিত ১৪৫ প্রজাতির গাছ-গাছালি, দুলর্ভ কালো গোলাপসহ ৩৫ প্রকার গোলাপ এবং বিভিন্ন প্রজাতির দৃষ্টিনন্দন ১০০টি অর্কিট আছে। এই পাহাড়ে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া মেছোবাঘ, ভালুক, মায়াহরিণ, বানর, হনুমান, শুকর, বনরুই, সজারু, বনমোরগ, দাড়াঁশ, গোখরা, লাউডগা, কালন্তি নামক সাপ। বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে সুপ্তধারা ও সহস্রধারা নামে দুটি জলপ্রপাত। শত ফুট ওপর থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়া ঝর্ণাতে একটু ভেজা বা উঞ্চতা আহরণের আনন্দ আলাদা। এখানে এসে পানির সিগ্ধ পরশ পাওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামও। তাইতো তিনি এই ঝর্ণার পরশ নিতে ১৯২৬ সালে ও ১৯২৯ সালে ছুটে এসেছিলেন। রচনা করেছেন তাঁর বিখ্যাত গান ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ। ঐ পাহাড়ের ঝর্ণা আমি উধাও হয়ে রইগো’। এখানে যেতে হলে চট্টগ্রাম শহর থেকে বাস, মেক্সি, টেক্সিতে ৩৭ কি.মি. উত্তরে এলে কিংবা সীতাকুণ্ড থেকে ২কি.মি.দক্ষিণে ইকোপার্ক। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো-পার্কে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ১০টাকা।

বারৈয়াঢালা সহস্রধারা জলপ্রপাত ঃ

চারদিকে সবুজ পাহাড়। মাঝখানে পাহাড় থেকে অবিরাম পড়ছে জলপ্রপাত। পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় বারৈয়াঢালা সহস্রধারা জলপ্রপাতের অপরূপ এই দৃশ্য। সীতাকুণ্ড সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে বারৈয়াঢালা পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়ঝরা সহস্রধারা। তিন’শ ফুট উঁচু একটি পর্বত শীর্ষ থেকে জলধারা শিলাময় স্থানে পতিত হয়। এত উচুঁ পাহাড় থেকে এভাবে যুগ যুগ ধরে জলপ্রপাতের ধারাটি নিচে যাওয়ার ফলে এখানে বিশাল কুণ্ড সৃষ্টি হয়েছে। উচুঁ-নিচু দুর্গম টিলার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় সহস্রধারায়। জন্মলগ্ন থেকেই পাহাড়ি ঝর্ণাটির চারদিকে আছে বিরাট বিরাট পাথরের স্তুপ। ঝরণাধারার স্বচ্ছ পানি দিয়ে নানা জাতের সবজি ফলিয়েছে এলাকার চাষিরা। ঝরণাটি থেকে ৫০গজ দুরে পুরাকীর্তি সজ্জিত লবণাক্ষ মন্দিরে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। এখানে আসার জন্য কোনো ফি লাগে না। কৈফিয়ত দিতে হয় না কাউকে। নিরাপত্তার জন্য দলবেঁধে এখানে আসা ভালো। প্রকৃতির ছায়া ছাড়া কোনো বিশ্রামাগার নেই।

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত ঃ

মেঠো পথ পেরিয়ে যতদূর চোখ যায়, চারদিকে সবুজ আর সবুজ, মাথার ওপর বিশাল আকাশ, তার নিচে কেওড়ার বন, খানিক দূরেই সমুদ্রের বিশাল জলরাশি। হৃদয় হরণ করা এমন রূপে বারবার হাতছানি দেয় সীতাকুণ্ডের অনিন্দ্যসুন্দর গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে সৈকতের অদূরে বেড়িবাঁধের ওপর দাঁড়াতেই চোখ পড়বে কেওড়া বনের ওপরে শীতের মায়াবী আকাশ। বেড়িবাঁধ পেরিয়ে জুতোজোড়া হাতে নিয়ে কাঁদা মাটির ওপর দিয়ে কিছুটা পথ হাটার পর কানে ভেসে আসছিল সমুদ্রের গর্জন। সৈকতে যাওয়ার আগে কেওড়া বনে ঘাসের বিছানা আর ঝিরঝিরি বাতাস। কেওড়া বন আর সবুজের মাঝে ছোট ছোট খাদ। সাগরের জলে পা ভেজাতে সৈকতের দিকে এগোতেই দর্শনার্থীদের কোলাহল। দলবল নিয়ে কেউ ফুটবল খেলেছে, কেউ গা ভেজাচ্ছে, অনেকেই আবার ব্যস্ত ছবি তুলতে। সৈকতের এক পাশেই বয়ে যাওয়া খাল। সেই খালে নৌকা নিয়ে গোধূলি বেলায় ভাটার অপেক্ষায় মাঝি। সমুদ্রের জলে সূর্যের রক্তিম আভা। জল আর আকাশ মিলেছে সোনালি রঙের ক্যানভাসে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামগামী যে কোনো বাসে উঠে নামতে হবে সীতাকুণ্ড বাজারে। সেখান থেকে সিএনজি, অটোরিকশা নিয়ে যাওয়া যাবে গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতে। ভাড়া লাগবে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। সৈকতে কোনো গাড়ির স্ট্যান্ড নেই বিধায় আগেই ফেরার গাড়ির বন্দোবস্ত করে নেওয়া ভালো, এক্ষেত্রে রিজার্ভ করে ফেলা অথবা যাওয়ার গাড়ির সঙ্গেই নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত থাকার চুক্তি করা যেতে পারে। গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকতের আশ-পাশে থাকা ও খাওয়ার কোনো ভাল ব্যবস্থা নেই। খেতে হলে সীতাকুণ্ড বাজারে যেতে হবে। বাজারে মোটামুটি সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়। বাজারেই রয়েছে সৌদিয়া আবাসিক হোটেল, গ্রীণ হোটেল, সাইমুনসহ কয়েকটি রেস্ট হাউজ।

কুমিরা ঘাটঘর ব্রিজ ঃ

যারা সমুদ্র ভালোবাসেন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। সময়টা বৃথা যাবেনা। কুমিরা ঘাট হয়ে সন্দ্বীপ যাওয়ার একমাত্র পথ।

Top