শিক্ষা ব্যবস্থার যতো অসঙ্গতি –আবদুল্লাহ মজুমদার

ABDULLAH-IMG.jpg

—————————–
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলো শিক্ষার মাধ্যমে আলো অন্বেষী সবাই। স্বাধীনতার পরপরই হতাশা আমাদের গ্রাস করে। তখন পরিকল্পনা কমিশনে শিক্ষার দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, পরিকল্পনা কমিশন শিক্ষাবর্ষ এক বছর পিছিয়ে স্বাধীন দেশে সকল ছাত্রই যাতে উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে পারে তার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলো। কিন্তু সবাইকে হতবাক করে দিয়ে সে সময়ের শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তার পর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। পরীক্ষার হলে শিক্ষকদের উপস্থিতিতেই ছাত্ররা বই খুলে উত্তর লিখে। এই অভাবিতপূর্ব ঘটনায় সকলেই বিস্ময় ও কীংকর্তব্যবিমূঢ় হলেও শাসকগোষ্ঠী এর মধ্যেই নিজেদের নিরাপদ ভাবতে শুরু করে এবং গণ নকল দমন না করে তার আরও ব্যাপ্তি ঘটাতে সহায়কের ভূমিকায় হাজির হয়। এর পর সব পরীক্ষাতেই চলতে থাকে গণনকল। এভাবে এক ভয়ানক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হলো। ১৯৭২ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ত্রিশ বছর বাংলাদেশে পরীক্ষার হলে চলে প্রকাশ্যে গণটোকাটুকির মহোৎসব। ফলে শিক্ষাজীবনেই ছাত্ররা পথভ্রষ্ট হয়ে চরম অনৈতিকতার শিক্ষা লাভ করে, যা পরবর্তীকালে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে ভ্রষ্টাচারে নিমজ্জিত করে।
প্রথম থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশে পথ হারায় গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা। তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার আন্তরিক কোনো চেষ্টা কখনও লক্ষ্য করা যায়নি। শিক্ষার নামে গত সাড়ে চার দশকে চালু করা বিভিন্ন রকমের ব্যবস্থায় শুধু ধনী ও ক্ষমতাবানদের সন্তানদেরই শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। চরম বৈষম্যমূলক এক শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। আজতক সেই বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিলো তা দিনে দিনে আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য দামি পণ্য হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। অথচ দুটোই নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আর এই দুই মৌলিক অধিকার থেকে নাগরিকরা বঞ্চিত।
দেশের সাধারণ মানুষের জন্য চালু করা হয়েছে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা কোনো শিশুকে না নৈতিকতা শেখায়, না তাদের দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরিত করে। দেশপ্রেমিক না করে এই শিক্ষা তাদের গড়ে তোলে দেশবৈরী এমন এক শ্রেণী হিসেবে, যারা লুটপাটের মাধ্যমে ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে এমন খারাপ কাজ নেই যা তারা করতে পারে না। বলা যায়, শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থা না আধুনিক, না সনাতন। এ এক জটিল প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের জন্য আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার নামে গত সাড়ে চার দশকে ব্রিটিশ বাংলায় প্রচলিত সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা হয়েছে, কিন্তু পুনবির্নিমানের কোনো প্রচেষ্টাই গ্রহণ করা হয়নি।
সমাজের সবচেয়ে গরিব ও পিছিয়ে থাকা মানুষদের বাধ্য করা হচ্ছে মাদরাসা শিক্ষা গ্রহণ করতে, যেখানে ধর্মভীরু মানুষ আল্লাহর ওয়াস্তে যে যা পারে দান-খয়রাত করে। মাদরাসা শিক্ষার পেছনে এই অতি গরিব শ্রেণীর মানুষেরই প্রধান অবদান। রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত তাকে অভিসম্পাত করে, কিন্তু তার আধুনিকায়নে বাস্তবিক কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে না। অবকাঠামোগত যতটুকু করা হয় তা শুধুমাত্র ভোটের একাউন্ট ভারী করতেই করা হয়।
দেশের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের জন্য জারি রাখা হয়েছে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে বিরাজ করছে চরম অচল অবস্থা। হালে যুক্ত হওয়া কারিগরি শিক্ষা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষ করার পরিবর্তে সার্টিফিকেটধারীতে পরিণত করেছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা করে তরুণ শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা অন্য যে কোন কাজের তুলনায় সহজ ছিলো।
সাধারণ শিক্ষা শুরু হয় সরকার পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাদের সন্তানদের এই সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পাঠায়। তারা যেন দেশের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। গ্রাম ও শহরের খেটে-খাওয়া মানুষ, যারা প্রতিদিন কায়িক শ্রম বিক্রি করে কোনো রকমে বেঁচে আছে, ছোট চাষি, গরিব শিক্ষক, ছোট ব্যবসায়ী, রিকশা-ভ্যান-নছিমন চালকদের সন্তানদের জন্য এই তথাকথিত ‘ফ্রি’ লেখাপড়া। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে তবুও শিক্ষার্থী আছে, কিন্তু শহরের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের অবস্থা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শহুরে সচ্ছল শ্রেণী এসব সরকারি প্রাইমারি স্কুলকে ঘৃণার চোখে দেখে এবং সেখানে তাদের সন্তানদের পাঠানোর কথা কল্পনা করতেও ভয় পায়। পথশিশুরা সেখানে পড়তে আসে। তাই সেসব স্কুলের অবস্থা কেমন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
গ্রামের সম্পন্ন কৃষক, ইউনিয়ন পরিষদের অবস্থাপন্ন মেম্বার- চেয়ারম্যান, সম্পন্ন শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক টাউট, চোরাচালানি, থানার দালাল, অপেক্ষাকৃত কম ধনী ডাক্তার, প্রবাসী কর্মজীবীরা তাদের সন্তানদের পাঠায় ‘কিন্ডারগার্টেনে’ এবং পরে সাধ্য ও সুবিধামতো ক্যাডেট কলেজ, জিলা স্কুল বা সরকারি মাধ্যমিক স্কুল, নানা রঙের মিলিটারি পাবলিক স্কুল, শহরের নামিদামি স্কুল-কলেজে। এই শ্রেণীকে আমরা আদর করে ডাকি ‘মধ্যবিত্ত’ বলে। তারা আমাদের সমাজের প্রায় ১৫ ভাগ । বলে রাখা ভালো যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীই গত শতকের মাঝামাঝি আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল এবং তারাই এদেশে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠতে সচেষ্ট, জীবনযুদ্ধে তাদের সংগ্রাম নিম্নগামী ও উচ্চবিত্তদের তুলনায় অবিরাম। মধ্যবিত্ত এই শ্রেণীকে আবার করপোরেট পুঁজি খুবই ভালোবাসে। কেননা, তাদের আয়তন যত বাড়ে, করপোরেট পুঁজির ব্যবসা তত রমরমা হয়। তাই এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রসারে রাষ্ট্র এবং বিদেশি মুরব্বিরা খুবই খুশি ও যত্নবান। এ মধ্যবিত্তরা রাষ্টের প্রায় ৩০-৩৫ ভাগ সুবিধা ভোগ করে।

লেখক- শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Top