— আজ ঐতিহাসিক বদর দিবস —

FB_IMG_1558607171289.jpg

ইসলাম ডেস্ক :

( ১৪৪০ হিজরী, ১৭ই রমজান )

২য় হিজরীর ১৭ই রমজান। ইসলামের প্রথম রক্তক্ষয়ি সংঘর্ষ। যেটা ছিল মূলত ছেলের বিরুদ্ধে বাবার, বাবার বিরুদ্ধে ছেলের, চাচার বিরুদ্ধে ভাইপোর কিংবা ভাইপোর বিরুদ্ধে চাচার যুদ্ধ। মুসলমানদের জন্য এই যুদ্ধ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলতে গেলে এই যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই যুদ্ধে যদি মুসলমানেরা পরাজিত হতো, তাহলে আল্লাহর নাম নেওয়ার মতো পৃথিবীতে আর কোনো লোক থাকতো না।

মোজাহিদ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা :

রাসূল (সঃ) বদরের উদ্দেশ্যে রওয়ানাকালে তার সঙ্গে তিনশর বেশী সংখ্যক সাহাবী ছিলেন । এই সংখ্যা কারো মতে ৩১৩, কারো মতে ৩১৪ এবং কারো মতে ৩১৭ জন। তাদের মধ্যে ৮২ জন, মতান্তরে ৮৩ জন কিংবা ৮৬ জন ছিল মোহাজির। (যারা মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছেন)। বাকি সকলেই ছিলেন আনসার। (মদিনার মুসলমানগণ)। আনসারদের মধ্যে ৬১ জন আওস এবং ৭০ জন খাজরাজ গোত্রের লোক ছিলেন।

দায়িত্ব বন্টন :

মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের জন্য তেমন কোন প্রস্তুতি নেয়নি। সমগ্র সেনা দলে ঘোড়া ছিল মাত্র ২টি। একটি হযরত যোবায়ের ইবনুল আওয়াম (রাঃ) এর। অন্যটি হযরত মিকদাদ ইবনে আওয়াস কেন্দী (রাঃ) এর। ৭০টি উট ছিল, প্রতিটা উটে দুই বা তিনজন পলাক্রমে আরোহণ করতেন। একটি উটে রাসূল (সঃ), হযরত আলী (রাঃ) এবং হযরত মারসাদ ইবনে আবু মারসাদ গানাবী (রাঃ) পলাক্রমে আরোহন করেছিলেন। হযরত যোবায়ের ইবনুল আওয়াম (রাঃ) কে ডান দিকের, এবং হযরত মিকদাদ ইবনে আমর (রাঃ) কে বাম দিকের অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। সমগ্র বাহিনীতে এরা দুইজন ছিলেন ঘোড় সওয়ার। হযরত কায়স ইবনে আবি সাসায়া (রাঃ) কেও অন্যতম অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। প্রধান সিপাহসালার দায়িত্ব রাসূল (সঃ) নিজেই গ্রহন করেন।

পতাকা বহন :

মোহাজিরদের পতাকা হযরত আলী (রাঃ) এবং আনসারদের পতাকা হযরত সা’দ ইবনে মায়া’জ (রাঃ) বহন করছিলেন। জেনারেল কমান্ডের পতাকা ছিলো সাদা। যা হযরত মোসয়াব ইবনে ওমায়র আবদারী (রাঃ) বহন করছিলেন।

মল্ল যুদ্ধ :

মুশরিক আসওয়াদ ইবনে আবুল আছাদের হত্যাকাণ্ড ছিলো বদর যুদ্ধের প্রথম ঘটনা। এ হত্যার পর সর্বদিকে যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। কোরায়শ বাহিনীর মধ্য থেকে তিন বিশিষ্ট যোদ্ধা বেরিয়ে আসে। যারা ছিল একই গোত্রের লোক। তারা হলো রবিয়ার দুই পুত্র ওতবা ও শায়বা এবং ওতবার পুত্র ওলীদ। তারা সৈন্যদের কাতার থেকে বেরিয়ে এসেই মুসলমানদেরকে মল্ল যুদ্ধের আহবান জানায়। তাদের মোকাবেলার জন্য তিন আনসার যুবক অগ্রসর হন। তারা হলেন আওফ , মোয়াওয়েজ এবং আব্দুল্লাহ ইবনে রওয়াহা (রহঃ)। কোরায়শরা জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কারা ? তারা বললেন আমরা মদিনার আনসার। কোরায়শরা বললো তোমরা ভদ্র অভিজাত প্রতিপক্ষ। কিন্তু তোমাদের সাথে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা চাই আমাদের চাচাতো ভাইদের। এরপর তাদের ঘোষক চিৎকার করে বললো, হে মোহাম্মদ, আমাদের কাছে আমাদের গোত্রের সমকক্ষদের পাঠাও। রাসূল (সঃ) বললেন, আবু ওবায়দা ইবনে হারেস, হামযা ইবনে আব্দুল মোত্তালিব এবং আলী ইবনে আবি তালিব এগিয়ে যাও। তারা যাওয়ার পরে মল্ল যুদ্ধ শুরু হয়। হযরত আবু ওবায়দা ইবনে হারেস (রাঃ) ওতবা ইবনে রবিয়ার সাথে, হযরত হামযা (রাঃ) শায়বা ইবনে রবিয়ার সাথে এবং হযরত আলী (রাঃ) ওলীদ ইবনে ওতবার সাথে মোকাবেলা করেন। হযরত ওবায়দা (রাঃ) এবং তার প্রতিপক্ষ থেকে একেক আঘাত বিনিময় হয় এবং উভয়ে কঠিন আহত হন। হযরত হামযা (রঃ) এবং হযরত আলী (রঃ) নিজ নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীর কাজ শেষ করে এসেই ওতবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শেষ করে ফেলেন। এরপর তারা হযরত ওবায়দাকে উঠিয়ে আনেন। হযরত ওবায়দা (রাঃ) এর পা কেটে রক্ত বের হতে হতে কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার মুখে আর কথা ফুটেনি। চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে মুসলমানেরা মদিনায় ফিরে যাওয়ার পথে সাফরা প্রান্তর অতিক্রম করার সময় তিনি শাহাদাতে বরণ করেন।

তুমুল যুদ্ধ :

মল্ল যুদ্ধে মুশরিকদের তিনজন বীর নিহত হ‌ওয়ার সাথে সাথে তাদের সেনাপতি আবু জেহেলের নেতৃত্বে রাসূল (সঃ) এর ক্ষুদ্র মোজাহিদ বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে। মোজাহিদদের এই ক্ষুদ্র বাহিনী ঈমানের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মুশরিকদের বিশাল বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়েন। যার ফলে যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুশরিকরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

যুদ্ধের ফলাফল :

এই যুদ্ধে মুসলমানদের ১৪ জন মোজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। তন্মধ্যে ৬ জন ছিলেন মোহাজির এবং ৮ জন ছিলেন আনসার। পক্ষান্তরে মুশরিকদের সেনাপতি আবু জেহেল সহ ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দি হয়। অবশেষে আল্লাহর কুদরতে আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠানোর মাধ্যমে মুসলিম মোজাহিদ বাহিনীরাই ১০০০ জন মুশরিকের বিরুদ্ধে বদরের প্রান্তরে বিজয় লাভ করেন।

ডেস্ক/এম.এ ওয়াহিদ

Top