বিশ্ব সভায় উড়িয়েছি লাল সবুজের পতাকা : দিপু হাফিজুর রহমান

1-1-620x330.jpg

প্রথম ইমেইল পেয়ে কোটি টাকার অস্ট্রেলিয়ান লটারীর মতো ফেইক মেইল ভেবেছিলাম। পরে গুগলে লিংক চেক করে নিশ্চত হলাম ‘ইউএন এসডিজি অ্যাকশন ক্যাম্পেইন’ কর্তৃপক্ষই মেইলটি করেছে। কিছুটা অবাক হয়েই রিপ্লাই দিলাম। পরবর্তী সময় মেইল আসলো তাদের ওয়েবসাইটে আমার একটি অনলাইন প্রোফাইলসহ, আমন্ত্রণ পত্রের মতো এম্বাসি ফেইস করার একটি সহযোগী পত্রও পাঠালো সাথে। জার্মানীর বন-এ ৩ দিন ব্যাপী আয়োজন।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত সেনজেন ভিসা ইন্টারভিউয়ের যে ধারণা নিয়ে এম্বাসি ফেস করতে গেলাম- তার সাথে বাস্তবতা মিললো না, ভিসা অফিসার কাগজপত্র দেখছিলেন আর কম্পিউটারে কি যেন মেলাতে মেলাতে টুকটাক নিয়ম রক্ষার গল্প করলেন। যা থেকে ইউরোপের ভিসার ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু ছিল না। রেখে আসা পাসপোর্ট আনতে বরিশাল-ঢাকা করলাম না, পাসপোর্ট আনতে গেলো বিডিএ-এর এক ছোট ভাই মোসাদ্দিক বিল্লাহ হাসিব। হাসিব পাসপোর্ট হাতে নিয়ে মোবাইলে উচ্ছ্বাসিত আবেগ প্রকাশ করলো ‘ভাইয়া, পাইছেন পাইছেন’। বুঝলাম, ভিসা হয়েছে!
কোন এক প্রধানমন্ত্রী জার্মানীর অপর এক শহর ‘হেগ’-এ গিয়েছিলেন ‘বন’ থেকে যা ছোটবেলায় আমাদের মুখরোচক আলোচনায় ছিল। সেই থেকে জার্মানীর বন শহরের সাথে আমার পরিচয়। সেখানে যাওয়া যেন ক্যান্সেল না করি তার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছিল জুনায়েদ সাজিব। সজিব বলছিল, সে যখন আছে তখন বন আমার কাছে ঢাকা মনে হবে। জুনায়েদ বরিশালের ছেলে, জার্মানীতেই থাকছে এবং অসংখ্য বিদেশী ছেলেমেয়েদের সাথে প্রতিযোগিতা করে এই একই আয়োজনের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যদিও সজিব তার কথা পুরোটা রাখতে পারেনি, কারণ ঢাকা বানানোর কথা থাকলেও বন আমার কাছে প্রায় বরিশালের মতোই হয়ে গিয়েছিলো নিশ্চিন্ততায়।
২ হতে ৪ মে আয়োজিত এ বছরের অনুষ্ঠানে ১৫০ টির অধিক দেশ থেকে দেড় হাজারের বেশি কর্মী থেকে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছে। সারা বিশ্বের উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, পরিবর্তনকারী এবং সৃষ্টিশীলেরা জার্মানীর বন শহরে একত্রিত হয়েছিলো এসডিজির কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে, নতুন আইডিয়া যাচাই ও ত্বরান্বিত করতে, সেই সাথে এসডিজি কার্যক্রমের জোটকে আরো শক্তিশালী করতে। সেখানে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিলো যাতে দৃষ্টিভঙ্গী এবং রুচি ভাগ করে নেয়া যায়, যেন নতুন ধারণাকে ত্বরান্বিত করা যায় এবং যেখানে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের জন্য এসডিজি হয়ে ওঠে গুরুত্ববহ।
প্রথমদিন উদ্বোধনী আয়োজনে মডারেটরের হাস্য-কৌতুকপূর্ণ উপস্থাপনা সকলকে সহজ করে ফেলেছিল। আয়োজনের প্রধান কর্তাবৃন্দ ছাড়া কারো জন্যই বিশেষ কোন স্থান বরাদ্দ ছিল না। আন্তরিকতার সাথে তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার উজ্জীবিত রেখেছে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে। প্রধান বৃহৎ হলটিতে বৈশ্বিক সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে অ্যাডভোকেসির প্রয়োজনীয়তা, নাগরিক সম্পৃক্ততা, আচরণের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে এবং সেটার পুনরাবৃত্তির জন্য ছিল সকলের প্রতিশ্রুতি। জার্মানী রাস্ট্রের সংসদ সচিব মারিয়া ফ্লাক্সবার্থ কথা বলেছেন এসডিজির এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নের জন্য নতুন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে! তিনি বলেন, ‘এটা একটা দুর্দান্ত সময়। পৃথিবী জুড়ে বহুপাক্ষিকতা চাপের মুখে রয়েছে।’ জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিস-এর মানবাধিকার পরিচালক তানিয়া ফ্রেইন ভন উসলার একমত পোষণ করেন এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং আশাদীপ্ত আন্ত:রাষ্ট্র সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে সকলকে বাস্তবায়নের পথে একত্রে হাঁটার আহ্বান জানান। সৃষ্টিশীল, কর্মী, যুব নেতৃত্ব এবং ব্যবসায়ী ও সরকার বিশেষজ্ঞদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আপনার এজেন্ডা হোক ২০৩০ এর জন্য এক সহজাত শক্তি।’
এক অংশে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংগঠন বা উদ্যোক্তার সামাজিক উদ্ভাবনের প্রদর্শন করা হয়, যে গুলো নিজ নিজ দেশে এখনো চলমান এবং অন্যরা চাইলেও তা ব্যবহার করতে পারে। এর প্রত্যেকটিই টেকসই উন্নয়নের কোন না কোন লক্ষ্য সম্পর্কীত। এ সকল উদ্ভাবনে যার যার দেশের মানুষের সহযোগিতা এবং সমর্থনের গল্প শোনালেন সবাই মুখে এবং জায়ান্ট স্ক্রীনে। উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য রয়েছেঃ একটি সৃষ্টিশীল এবং অংশগ্রহণমূলক শিল্পকে ব্যবহার করে মালাওই এর যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য এবং এইচআইভি কে প্রতিহত করতে কাজ করা; লেবাননের কুখ্যাত ধর্ষণ-বিবাহ আইন রদ করতে একটি প্রতিবাদ যেভাবে জাতীয় প্রচারণা হয়; যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ার মুম্বাই এ একটি ক্রাউডম্যাপ; এসডিজি বিষয়ে তথ্য প্রচারের অভিনব ভাবনা। বৃহত্তর পরিসর এবং ছোট ছোট সমাবেশে উদ্ভাবনী আইডিয়া শেয়ারিং-এর সুযোগ করে দেয়া ছিলো এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
যেখানেই যেভাবে সুযোগ পেয়েছি, বাংলাদেশের নামটি মুখস্থ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি, উড়িয়েছি লাল-সবুজের পতাকা কারণে-অকারণে! চেষ্টা করেছি সামান্য যে উদ্যোগে আমার সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে সেটিকে তুলে ধরতে। সহকর্মী প্রতিভা নিটোল এবং নয়ন মাকসুদের সহযোগিতায় প্রস্তুত করে নেয়া প্রেজেন্টেশন প্রচারে আন্তরিকভাবে বরিশালের মানুষের উদ্যোমী শ্রম, উদ্যোগ বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পরা এবং সর্বোপরি তৎকালীন জেলা প্রশাসক গাজী সাইফ জামান স্যারের নেতৃত্বের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমি ডাক পেয়েছিলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সরকারি দপ্তর এবং নাগরিকদের সমন্বিত কাজের ক্ষেত্র তৈরি করার ধারণার জন্য। যে ধারণার মাধ্যমে এসডিজি এর লক্ষ্য-১১ (স্বয়ং-সম্পূর্ণ নগর এবং সম্প্রদায়), লক্ষ্য-১৬ (শান্তি, ন্যায় বিচার এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান) এবং লক্ষ্য-১৭ (লক্ষ্য অর্জনে অংশীদারিত্ব) অর্জনে সরাসরি সহেযোগিতা হয়েছে এবং পরোক্ষভাবে এর প্রভাব পরেছে লক্ষ্য-৩ (সুস্বাস্থ্য এবং কল্যাণ) এবং লক্ষ্য-৬ (পরিষ্কার পানি ও পয়:নিষ্কাশন) অর্জনে। শূন্য খরচে কেবল স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের এই পদ্ধতি যখন কেউ প্রশংসায় ভাসিয়েছে তখন হঠাৎ হঠাৎ মাঝে মাঝে বুক ভারি হয়ে উঠছিল উল্লেখযোগ্য কোন কারণ ছাড়াই।
‘আমাদের প্রয়োজন অংশীদারিত্ব- পাবলিক এবং প্রাইভেট, প্রফিট এবং নন-প্রফিটের জন্য। আমাদের দরকার সরকারী এবং স্বায়ত্বশাসিত সংগঠন। আপনাদের স্থানীয় সংবিধানে এই এজেন্ডা নিতে হবে এসডিজিকে জাতীয়করণ করতে এবং তাদের রূপান্তরিত করতে হবে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায়। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন গুরুত্বারোপ ও সংকল্প।’ বলছিলেন ইউএন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের ইউরোপের রিজিওনাল ব্যুরোর সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও পরিচালক মির্জানা স্পলজারিক এগার।
মাল্টি-স্টেকহোল্ডারদের অন্তদৃষ্টি নিয়ে বলা কথায় লিডাররা গুরুত্ব দেয় অ্যাডভোকেসি এবং নাগরিক সম্পৃক্ততায়। টেকসই এবং নাগরিক ক্রিয়াকে সম্পর্কযুক্ত করে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল জুয়ান সোমাভিয়া বলেন, ‘জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া এসডিজির বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ অসম্ভব।’ অন্যান্য বক্তাদের কথায়ও ছিল একই সুর। ‘আমরা হলাম পরিবর্তনের বাহক এবং আমরা যদি সেটা বিশ্বাস না করি, তাহলে আমাদের জীবনে কিছুই ঘটবে না।’ বলেন ম্যাক্সিকান কংগ্রেস ওমেন এবং ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভাপতি গ্যাব্রিয়েলা কুয়েভাস ব্যারন। সে তার বক্তব্য অব্যহত রাখে এই বলে যে, এই পরিবর্তন শুরু হয় সরকারের সাথে, হাতে হাতে কাজ করে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে, সেইসকল মানুষদের সাথে যাদের তারা উপস্থাপন করে। ‘আমরা যদি সত্যিই এই এগারো বছরে পৃথিবীকে বদলাতে চাই, এটা অসম্ভব মনে হবে। কিন্তু অবশ্যই এটা সম্ভব এবং সেজন্যই আমরা এখানে।’
এজেন্ডা ২০৩০ এর স্পেন সরকারের হাই কমিশনার ক্রিস্টিনা গ্যালাচ নেতৃত্বকে তিনটি মূল শব্দের একটি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি তার আলোচনায় তুলে ধরেন কিভাবে স্প্যানিশ সরকার এই এজেন্ডাকে একটি কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক কর্মকা-ে ‘উচ্চ নেতৃত্ব প্রয়োজন’ কিন্তু সেই সাথে প্রতিষ্ঠান এবং পৃষ্ঠপোষকতারও দরকার রয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যুব সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পীদের সাথে সংযুক্তি গড়ে তোলার। তিনি মনে করেন, ‘নাগরিক সমাজ হলো চাবিকাঠি।’ হ্যাশট্যাগ আমাদের গল্প (#আওয়ারস্টোরী)-এর সহ উদ্যোক্তা এবং কর্মী ইউসুফ ওমার যুবদের তাদের উদ্ভাবনগুলোকে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অনলাইনে ছড়িয়ে দিতে আাহ্বান জানান।
পরিবর্তনশীল, প্রভাবপূর্ণ এবং উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় টেকসই উন্নয়ন আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে-
এরকম বিভিন্ন চলমান উদ্ভাবনীকে পদক প্রদানের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেয়া হয় শেষ দিনে। আমাদের দেশ এমনকি আমাদের বরিশালে স্বেচ্ছাসেবী অনেকগুলো যুব সংগঠন যে সকল কাজ করে চলেছে তারাও কিন্তু ওই সকল কাজের চেয়ে কম কিছু করছে বলে মনে হয় নি। পার্থক্য মনে হয়েছে বৈশ্বিক ভাবনা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সমন্বয়ের অভাব।
দ্বিতীয় দিনে ভরা যৌবনা রাইম নদীর তীর ঘেষে চলা বিশাল র‌্যালীর প্রথম সারিতে থেকে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা নাড়ানো ছিলো ব্যক্তিগত অবিস্মরনীয় অভিজ্ঞতা। এসডিজির পতাকার পাশাপাশি লাল-সবুজ পতাকা দেখে দুই/একজন যখন দেশের নাম জিজ্ঞেস করেছিলো তখন চিৎকার করে বাংলাদেশ বলতে পারার সুযোগ ছিল সৃষ্টিকর্তার বিশেষ উপহার। এ ছাড়াও তিন দিনব্যাপী মানবিক সংগীত, জলবায়ু সচেতনতার আয়োজন, ফিল্ম, ডকুমেন্টারীসহ সকল ইভেন্টের র্বণনা দিয়ে শেষ করতে পারবো না। তবে ফেসবুকে নিয়মিত কিছু নমুনা পোস্ট দিয়ে বন্ধু তালিকায় থাকা ইউজারদের আপডেট রাখার চেষ্টা করেছি এবং তারাও লাইক কমেন্ট করে আমাকে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে কৃতজ্ঞ করেছেন।
বাংলাদেশ সরকার তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনে কাজ করে চলেছেন এবং বেশকিছু লক্ষ্যমাত্রায় বাংলাদেশের অর্জন প্রশংসনীয়। তথাপি সরকারী ব্যবস্থাপনায় সাধারণ নাগরিকদের এসডিজির লক্ষ্যসমূহ সম্পর্কে আরো তথ্য সরবারহ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। যখন অধিকাংশ নাগরিক এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হবে, তখনই সফলতা থাকবে আমাদের হাতের মুঠোয়। যে লক্ষ্য অর্জনে গোটা বিশ্ব ছুটছে তার সম্মুখভাগে থাকবে লাল-সবুজের প্রিয় বাংলাদেশ।

Top