‘বরকতময় রমজান’

60155858_663367077450149_1969250949121703936_n.png

সায়মা নাহার দিনা, ঢাবি :

সাওম ইসলামের মূল পাঁচটি ভিত্তি বা স্তম্ভের ২য় স্তম্ভ।মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এবং হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসের অসংখ্য ফজিলত বর্ণনা করেছেন। রমজানের সাওম পালন করার মাধ্যমে মুসলিমদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ এবং তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভের জন্য আহ্বান করা হয়।
মোহে রমজানের প্রক্ষাপট বা শুরুর দিকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ২য় হিজরীর শাবান মাসে আল্লাহর প্রিয় বান্দা এবং রাসূল হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মদীনায় অবস্থান করছিলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনের সূরা আল বাকারার ১৮৩ নাম্বার আয়াত নাযিল করেন-
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সাওম ফরজ করা হলো যেভাবে তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা সংযমী হও।”

এই আয়াতের মাধ্যমেই মুসলমানদের জন্য সাওম পালন ফরজ হয়।আরো অনেক আয়াতে আল্লাহ সাওম পালন করার নির্দেশ প্রদান করেন।

সূরা আল বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই মাসকে পায় সে যেন সাওম পালন করে”।

রমজান বা রামাদান (رمضان) আরবি শব্দ। এটি আরবি বর্ষপঞ্জির ৯ম মাস এবং ইসলাম ধর্মমতে সবচেয়ে পবিত্রতম মাস ।
আর ভারতীয় উপমহাদেশ সহ কিছু দেশ সাওম কে রোজা বলা হয়।’রোজা’ হলো একটি ফার্সি শব্দ।

রমজান মাসের আগমনে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। আনন্দ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-
”বল! এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম। [সূরা ইউনুস : ৫৮]

পার্থিব কোন সম্পদের সাথে আল্লাহর এ অনুগ্রহের তুলনা চলে না, তা হবে এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা। যখন রমজানের আগমন হত তখন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হতেন। নাসায়ী শরীফের বর্ণননায় পাওয়া যায়, তিনি তাঁর সাহাবাদের বলতেন –
“তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। এরপর তিনি এ মাসের কিছু ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন : আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন।
◑এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হয়।
◑ বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। ◑অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়।
◑এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল।

সহীহ মুসলিম শরীফের বর্ণনায় রয়েছে-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে-শয়তানের শিকল পড়ানো হয়।”

রমজান মাস হলো মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাজিলের মাস। যার ফলে এই মাসের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা আল বাকা রার ১৮৪ নাম্বার আয়াতে বলেন-
“রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কোরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী।”

রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কোরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। কোরআন নাজিলের দুটি স্তরই রমজান মাসকে ধন্য করেছে। শুধু আল-কোরআনই নয় বরং ইবরাহিম আ.-এর সহিফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল সহ সকল ঐশী গ্রন্থ এই মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বলে হাদিস গ্রন্থসমূহে উল্লেখিত রয়েছে।এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাজিল হয়েছে তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম।

মাহে রমজানে সিয়াম পালনের ফজিলত বা গুরুত্বের উপর আরো অনেক হাদিস রয়েছে।
হযরত শাহ্ ইবনে সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম (সা.) এরশাদ করেছেন, বেহেশতের ৮টি দরজা রয়েছে। এর মধ্যে ১টি দরজার নাম রাইয়ান। রোজাদার ব্যতিত আর কেউ ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, হুজুর (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমযান মাসের রাতে এবাদত করে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে কদরের রাতে ইবাদত করে কাটাবে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারী, মুসলিম)

হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ(সো:)ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সিয়াম ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য, কিন্তু সিয়াম আমার জন্য এবং আমিই এর প্রতিদান দেব। সিয়াম ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যেন সিয়াম পালনের দিন অশ্লীলতায় লিপ্ত না হয় এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করে, তাহলে সে যেন বলে, আমি সায়িম (রোজাদার)। যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তার শপথ! অবশ্যই সায়িমের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিসকের গন্ধের চেয়েও সুগন্ধি। সায়িমের জন্য রয়েছে দু’টি খুশি, যা তাকে খুশি করে। যখন যে ইফতার করে, সে খুশি হয় এবং যখন সে তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন সাওমের বিনিময়ে আনন্দিত হবে।

(সহীহ বুখারী: ১৯০৪, সহীহ মুসলিম:১১৫১)

আবার যারা সুস্থ্য সামর্থবান থাকার পরও ফরয সাওম পালন করবে না তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিষয়েও হাদিস এ উল্লেখ রয়েছে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) আরো বলেছেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে শরীয়ত সম্মত কোনো কারণ ছাড়া রমজানের একটি রোজাও ভাঙে সে রমজানের বাইরে সারাজীবন রোজা রাখলেও এর বদলা হবে না। (তিরমিযী, আবু দাউদ)

বিনা কারণে যে ব্যক্তি মাহে রমজানের মাত্র একটি রোজা না রাখে এবং পরে যদি ওই রোজার পরিবর্তে সারা বছরও রোজা রাখে, তবু সে ততটুকু সাওয়াব পাবে না, যতটুকু মাহে রমজানে ওই একটি রোজার কারণে পেত।

এ সম্পর্কে ফিকাহবিদদের মতে, দুই মাস একাধারে রোজা রাখলে স্বেচ্ছায় ভাঙা একটি রোজার কাফফারা আদায় হয় আর এই কাফফারার বিনিময়ে একটি রোজার ফরজের দায়িত্বটা কেবল আদায় হয়। আর যারা নানা অজুহাতে ও স্বেচ্ছায় পুরো মাহে রমজানে রোজা রাখে না, তাদের শাস্তি কত যে ভয়াবহ হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই এ বিষয়ে প্রত্যেক মুসলমানের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তবে রমজান মাসে যাঁরা পীড়িত, অতিবৃদ্ধ, যাদের দৈহিক দুর্বলতার কারণে সিয়াম পালন করা খুবই কষ্টদায়ক হয়ে যায়, যারা সফরে থাকার কারণে মাহে রমজানে সিয়াম পালন করতে পারেন না, তাদের জন্য রোজার কাজা, কাফফারা, ফিদইয়া ইত্যাদি বদলা ব্যবস্থা স্থির করে শরিয়তে সুনির্দিষ্ট বিধি-ব্যবস্থা রয়েছে।

এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সূরা আল বাকারার ১৮৪ থেকে ১৮৫ নাম্বার আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-
“তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। এ (সিয়াম) যাদের অতিশয় কষ্ট দেয় তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে ফিদ্ইয়া-একজন মিসকিনকে অন্নদান করা। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎ কাজ করে, তবে সেটা তার পক্ষে অধিকতর কল্যাণকর। তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে, তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। আর কেউ পীড়িত থাকলে অথবা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য যেটা সহজ সেটাই চান এবং যা তোমাদের জন্য ক্লেশকর, তা চান না এ জন্য যে তোমরা সংখ্যা পূরণ করবে।”
সুতরাং প্রতিটি সামর্থবান মুসলিমের উচিৎ রমজানের যথাযথ নিয়মের প্রতি লক্ষ্য রেখে সাওম পালন করা।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পবিত্র রমজানের ফজিলত জেনে বেশি বেশি নেক আমল করার তৌফিক দান করুন এবং মহান রবের নৈকট্য লাভের তাওফিক দান করুন । আমীন

লেখকঃ- শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্মান ৩য় বর্ষ, আরবি বিভাগ।
Type a message…

Top