আমাদের উচিত শিশুদের মতের অবাধ প্রধান্য দেয়া

IMG_0416-1.jpg

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার

শিশুরা আমাদের ঘরে আলো জ্বালাবার এক উজ্জ্বল প্রদীপ। আমাদের বিদায়ের পর তারাই পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে। তারাই ভবিষ্যতে জাতিকে নেতৃত্ব দেবে এটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত এমন একটা বাক্য, যার বিপরীতে আমরা খুব কম জানি, আমাদের করণীয় কী। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে কাঠামোগত অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামাজিক চর্চায় শিশু অধিকারের বিষয়টি এখনো অনেকখানি উপেক্ষিত। এখনো আমাদের অধিকাংশের ধারণা, শিশুরা যেহেতু বয়সে ছোট, তাদের দাবি আদায়ের ক্ষমতা যেহেতু কম, তাদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কম, অন্নবস্ত্র সবকিছু পরিমাণে তাদের কম লাগে বলে তাদের অধিকারগুলোও বোধ হয় মর্যাদায় তুলনায় ছোট এবং তা বাস্তবায়নে তেমন কোনো জবাবদিহি নেই। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাদের অধিকার সচেতন করে তুললেই পরবর্তীতে তাদের হৃদয়ে আমাদের মর্যাদার আসন বড়ো হবে।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ জাতিসংঘের গৃহীত অন্য সব প্রধান সনদের মতো সমান গুরুত্বপূর্ণ, যার জন্য প্রতিটি রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে হয়। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এ পর্যন্ত পাঁচবার শিশু অধিকার বাস্তবায়নে অগ্রগতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন জাতিসংঘে জমা দিয়েছে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি শিশু। তার মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি শিশু দরিদ্র। এই দরিদ্র শিশুদের মধ্যে রয়েছে শ্রমজীবী শিশু, গৃহকর্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, পথশিশু, বাল্যবিবাহের শিকার শিশু এবং চর, পাহাড় আর দুর্গম এলাকায় বসবাসরত শিশু। আমরা যখন ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা বলি, তখন এই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কী ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছি, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেননা, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো রকম টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শিশু অধিকার বাস্তবায়নে আসলে আমাদের করণীয় কী? এই করণীয় নির্ধারণে প্রথমে আমরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নজর দেব। বাংলাদেশ শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে আইনকানুন ও নীতি প্রণয়নে দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে। আমাদের শিশুনীতি, শিশু আইন, শিশুশ্রম নিরসন নীতি, গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, পাচার প্রতিরোধসহ নানা বিষয়ে শিশুদের সুরক্ষামূলক আইন রয়েছে, যা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু এখানে লক্ষণীয় একটি দুর্বলতা হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয়ের জন্য দায়িত্বশীল কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বাংলাদেশে কর্মরত শিশু অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তরের দাবি জানিয়ে আসছে, যা জাতিসংঘ শিশু অধিকার কমিটিও সুপারিশ করেছে, কিন্তু তার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ে না। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুর ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন যে হারে বেড়েছে, তার প্রতিকারে অনেক আইনি বিধান থাকলেও এই ধরনের কর্মকা- প্রতিরোধের জন্য আমরা বেশি কিছু করতে পারছি না। এই সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের জাতীয়ভাবে কোনো সমন্বিত শিশু সুরক্ষা কাঠামো না থাকা।

শিশু যদি এমন কোনো কাজ করতে চায় বা এমন মত প্রকাশ করে, যা তার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তবে মা-বাবা বা সংশ্লিষ্ট বড়দের দায়িত্ব হবে তাকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়া।
আমাদের উচিত সব ক্ষেত্রেই শিশুর মতামতের প্রাধান্য দেওয়া। এর মধ্যে পড়ে বাড়ি, স্কুল, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের একটি মূলনীতি হলো, ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’।
রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিশুদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোগগুলো পরিকল্পনা করার সময় তাদের মতামত শোনা। কোনো মতামত যদি শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ অথবা অন্য কোনো কারণে গ্রহণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেটা শিশুকে বুঝিয়ে বলতে হবে।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Top