সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল

31732137_154566598722009_6632324211136266240_o.jpg

জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষকে প্রতিনিয়ত কর্মব্যস্ত থাকতে হয়। কখনো শহর থেকে গ্রামে, কখনো গ্রাম থেকে শহরে, আবার কখনো বা বসবাসরত স্থানের নানা পথ ধরে এদিক-ওদিক মানুষকে ছুটতেই হয়। কেউ কেউ আবার পথকেই সঙ্গী করে নিয়েছে। কিন্তু পথ মানুষকে কতটুকু সঙ্গী করতে পেরেছে? প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ পথের বলি হচ্ছে। কত মানুষের জীবন যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে এর কোন ইয়ত্তা নেই। মোটকথা সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে অহরহ ঘটে চলছে।

বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের এমন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণিত হয়েছে যে, প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় ও টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই দেখা যায় অসংখ্য মানুষ নানাভাবে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শহরে ও সড়ক-মহাসড়কে বেশিরভাগ এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। ফলে অকালে ও আকস্মিক মৃত্যু বা পঙ্গুত্ব হচ্ছে দেশের অসংখ্য নিরীহ মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও পথচারী।
দুর্ঘটনার সাথে সাথেই বেশিরভাগ গাড়ির চালক পালিয়ে যায়।

বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায় যে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশর কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ মারা যায়। দৈনিক গড়ে ২০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। পঙ্গুত্ব হচ্ছে প্রায় বারো হাজার মানুষ এবং দুর্ঘটনাস্থলে আহত হয় বিশ থেকে ত্রিশ হাজার মানুষ। রাজধানীতে নিহতদের ৭২% ই পথচারী। সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা। যার ফলে দেশ বছরে হারাচ্ছে জিডিপির ২-৩%। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে।

সড়ক দুর্ঘটনার এসব কারণগুলো একটু হটিয়ে দেখলেই সবার আগে চলে আসে যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি,চালকদের অসাবধানতা,লাইসেন্সবিহীন বিংবা অনভিজ্ঞ চালক কর্তৃক গাড়ি চালানো,একে অপরকে ওভারটেক করার প্রবণতা,অতিরিক্ত গতিবেগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারানো,আবার কখনো কখনো চালক থাকা অবস্থায়ও হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো ইত্যাদি।

এতো ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ঘটনার পরেও নেই কোন কার্যকরী পদক্ষেপ। বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে যাওয়া শরীর গুলোর বিচারের জন্য স্লোগান তুলে কেবল সাধারণ শিক্ষার্থীরাই। কয়েক দিন মিছিল মিটিং, বিক্ষোভ সমাবেশ, র‍্যালী হবে। কিছুদিন পরেই আবার মানুষ ভুলে যাবে এসব দুর্ঘটনার কথা।

কিন্তু মাঝে মাঝে এমন কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যা বোধসম্পন্ন মানুষের মনকেও দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। স্রেফ দুর্ঘটনা হলেও, মানতে খুব কষ্ট হয়।এমন দুর্ঘটনা প্রতিদিনই আমাদের দেশে ঘটে। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে কিছু দুর্ঘটনা অন্য সব দুর্ঘটনা থেকে মুখ্য হয়ে উঠে। এ নিয়ে কিছুদিন আলাপ-আলোচনা হয়, তারপর থেমে যায়। এমন আরেকটি দুর্ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত আমাদের চৈতন্য জাগ্রত হয় না। কয়েকটা লাশ না পরলে আমরা কেমন যে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাইনা। কয়েকটা লাশ পরার পরেই আমরা প্রতিবাদী হয়ে উঠি। অথচ এই চলমান দুর্ঘটনা জাতীয় জীবনে দুর্যোগ হয়ে রয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই।

আপনাদের মনে আছে সাবিহা ও খাদিজার কথা?
এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে সাবিহা আক্তার ও খাদিজা আক্তার নামে দুটি কোমল প্রাণ কেড়ে নেয় বাস দুটির বেপরোয়া চালক। জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া সাবিহা আক্তারের স্বপ্ন ছিল সে ডাক্তার হবে। তার বাবা রংমিস্ত্রি জাকিরেরও সব স্বপ্ন এবং আশা ছিল মেয়েকে নিয়ে। সেগুনবাগিচার বেগম রহিমা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ -৫ পেয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণের পথেই হাটছিল সাবিহা। তার সে স্বপ্ন ও আশা কেড়ে নেয় বেপরোয়া চালক। তার জমে থাকা স্বপ্ন গুলি চাপা পরে যায় চাকার তলে। সেই স্বপ্নকে লাশ বানিয়ে দিল বাস। খাদিজা কুমিল্লা থেকে ঢাকা এসেছিল বোনের বাড়ি বেড়াতে। প্রাথমিক সমাপনী পরিক্ষায় জিপিএ -৫ পাওয়া খাদিজার শখ ছিল শিশু পার্কে যাওয়া। রাস্তা পার হওয়ার সময় বাস তাকে চাপা দিয়ে তার আশা-আকাঙ্খা স্বপ্ন পিষে ফেলে দিলো।

আমাদের কি মনে আছে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর আরেক ছাত্র হামিমের কথা?
সেও বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছিল। বেপরোয়া বাস হামিমকে বাবার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পিষে ফেলে দিল। রাস্তার উপর পড়ে থাকা হামিমের লাশের ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কাপড় দিয়ে ঢাকা হামিমের দেহ ঢাকা গেলেও, তার কচি দুটি পা যেন কোনো কিছুই ঢেকে রাখতে পারেনি। এ ছবি দেখে তখন অনেকের চোখ ছলছল করে উঠেছিল। এসব ঘঠনা গুলো দেখে হৃদয় হাহাকার করে। হাহাকার আর হৃদয় বিদীর্ণ করা সেই ঘটনা গুলো যেন আবার ফিরিয়ে আনল ‘আবরারের’ ক্ষতবিক্ষত মৃত দেহ। সন্তান স্বজন হারানোর ব্যাথা সেই অনুভব করতে পারে যার হারিয়েছে। আমরা যারা চারিদিকে আছি সবাই মিষ্টির মাছি। কারণ অন্যকে শান্ত্বনা দেওয়াটা খুব সহজ কিন্তু তার কষ্টটা অনুভব করা খুব কঠিন।

কিছুই যেন করার নেই আমাদের। আমাদের যেন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, একশ্রেণীর ড্রাইভারের কাছে আমাদের স্বপ্ন ও আশা-আকাঙ্খা গুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। তারা যখন খুশি তখন তা কেড়ে নেবে। এদের প্রতিরোধের যেন কেউ নেই। সরকারের তরফ থেকে কত প্রতিশ্রুতি, কত উদ্যোগের কথা শুনি। কিন্তু দিন শেষে এইসব দুর্ঘটনার জন্য নেই কোন কার্যকর পদক্ষেপ।

গত বছর জুলাইয়ের রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপায় হত্যার ঘটনায় নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ও বেপরোয়া গাড়ি চালকদের ফাঁসির দাবিসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছিল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

গত প্রায় আট মাসে শিক্ষার্থীদের ৯ দাবির মধ্যে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ জাতীয় সংসদে অনুমোদন হয়েছে গত সেপ্টেম্বরে। সাবেক নৌমন্ত্রী নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনাও করেছেন। কিন্তু ৯ দফা দাবির বাকি ৭ দফা দাবি এখনো অপূর্ণতায় রয়ে গেলো। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হলেও তাদের সমন্বয়হীনতা ও ধারাবাহিক কর্মসূচির অভাবে দাবিগুলোর জোর যেন ফিকে হয়ে গেছে।

লেখকঃ আয়ান নুহা আলামিন
শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ।

Top