স্মরণে মরহুম এডভোকেট আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ য়্যাহয়্যা :

Father-Adv.-Zia-Habib-1.jpg

মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন খালেদ, এডভোকেট :

০৬মে বরেণ্য আইনজীবী শিক্ষানুরাগী, সমাজ সেবক মরহুম আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্য়্যার ১২তম মৃত্যু বার্ষিকী। ২০০৭ সালের এদিনে তিনি পরপারে চলে যান। তিনি শুধু একজন খ্যাতিমান আইনজীবীই ছিলেন না একাধারে শিক্ষানুরাগী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সমবায় উদ্যোক্তা এবং ধর্মপ্রাণ নাগরিক ছিলেন। তাঁর জীবনী বিশ্লেষণে জানা যায়, তিনি ছিলেন বিখ্যাত আইনজীবী, খ্যাতনামা রাজনীতিক, স্বনামধন্য সমাজসেবী, লেখক, গবেষক, অন্যায়ের বিরূদ্ধে সোচ্চার কন্ঠ এবং গ্রন্থকার।

১৯৩৪ সালের ২৭ অক্টোবর উত্তর চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জনপদ হাটহাজারী উপজেলার গুমানমর্দন ইউনিয়নের অভিজাত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার উচ্চ শিক্ষিত বাবা এম. আমীনুল্লাহ ছিলেন তদানীন্তন বার্মায় অবস্থিত রেঙ্গুন, মৌলমেন ও মান্দালয়ে বার্মা অয়েল কোম্পানির এজেন্ট ‘মেসার্স মোখলেছ এন্ড সন্স’ নামক নির্মাণ ফার্মের এটর্নি। ৪ ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড় এবং ৩ বোনসহ ৭ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ২য়। ১৯৫৬ইং সনের চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে বি.এ.পাশ। ১৯৬১ইং সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএল.বি ডিগ্রী অর্জন। ১৯৬৪ইং সনে চট্টগ্রাম বারে যোগদান। ১৯৭৮ইং সনে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বার এর সদস্য পদ গ্রহন। ১৯৮২ইং থেকে ১৯৮৫ইং পর্যন্ত সহযোগী সরকারী উকিলের দায়িত্ব পালন। তিনি ১৯৬১ সালের ৯ এপ্রিল রাউজান সুলতানপুর নিবাসী মরহুম এডভোকেট এজহার হোসাইন বি.এল. এর বড় মেয়ে (আলহাজ্ব) জায়তুন আরা বেগমকে বিয়ে করেন। ২০০৭ সালের ৬ মে ৭২ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন।

পেশাগত জীবনে তিনি যেসব প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা/প্যানেল ল’ইয়ার ছিলেন – অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংক (১৯৬৭ইং), রূপালী ব্যাংক- ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা কাল থেকে, সিনিয়র লিগ্যাল এডভাইজার- ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিঃ, জনতা ব্যাংক লিঃ, বেসিক ব্যাংক লিঃ, আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লিঃ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ওয়াকফ এস্টেট, বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন কো-অপারেটিভ ব্যাংক, এসোসিশেয়ন এবং সোসাইটি, সি.ই.উ এফ এল, সেনা কল্যাণ সংস্থা, বিভিন্ন সংস্থা ও কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যাক মামলা পরিচালনা করেন। এছাড়াও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারী-বেসরকারী ও আধা সরকারী প্রতিষ্ঠানের এবং ব্যক্তির পক্ষে সকল শ্রেণীর মোকদ্দমা পরিচালনায় অভিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর বহু জুনিয়রকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মামলা পরিচালনায় সহায়তা প্রদান। তাহাছাড়াও চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন ব্যাংকের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ঃ পুবালী ব্যাংক লিঃ, সিটি ব্যাংক লিঃ, ন্যাশনাল ব্যাংক লিঃ, আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লিঃ, আল বারাকা ব্যাংক লিঃ, অগ্রণী ব্যাংক লিঃ, সোনালী ব্যাংক লিঃ। পেশাবহির্ভূত তিনি অনেক দায়িত্ব পালন করেন। যুগ্ম সম্পাদক- বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন (১৯৭৩-১৯৭৫ইং), পরিচালক- বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক, মতিঝিল, ঢাকা (১৯৭৪-১৯৭৬ইং) পরিচালক- বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ জুট মিল্স (১৯৭৪-১৯৭৭ইং), চেয়ারম্যান- বৃহত্তর গুমান মর্দন ইউনিয়ন কাউন্সিল, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম (১৯৬৩-১৯৭১ইং), বিভিন্ন থানা পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সক্রিয় সম্পর্ক, আজীবন সদস্য- রেজিষ্ট্রার্ড গ্র্যাজুয়েট, ঢা.বি, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান- জায়তুন-য়্যাহয়্যা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, আজীবন সদস্য- ডায়বেটিক এসোসিয়েশন।

এডভোকেট আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ য়্যাহয়্যা সমবায় আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে তিনি বহু লেখালেখি করেন। “কানি প্রতি একশ, তার নাম সোনালী শ”- আন্দোলনের তিনি অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন। ‘উন্নত কৃষি সমবায়’ শীর্ষক তাঁর রচিত প্রবন্ধ তদানিন্তন সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৬৪-১৯৭১ সাল পর্যন্ত তার চেয়ারম্যানশীপ থাকাকালে সকল সেতু পাকা করা হয়। এসময় এলাকায় প্রায় একশত টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়। বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা পায় তার উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে। তিনি এলাকার অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরের উন্নয়ন করেন। গ্রামে প্রতিবছর বৃক্ষরোপন অভিযান করতেন। মির্জাপুর বৌদ্ধমন্দিরে জাপান ও থাইল্যান্ড হতে বৌদ্ধবৃক্ষের গাছ এনে তাঁর দ্বারা রোপন করানো হয়। গ্রামে বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন ও সংযোগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। মৃত্যুর পূর্বে “জায়তুন-য়্যাহয়্যা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট” নামে একটি অলাভজনক জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। যার মাধ্যমে অসহায়, দরিদ্র, নিঃস্বদের নানাভাবে সহায়তা (ছদকায়ে জারিয়া) প্রদান চালু আছে। তিনি স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলনকে জোরদার করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন এবং দীর্ঘদিন জাতীয় সমবায়ের নির্বাচিত মহাসচিব, চট্টগ্রাম ও হাটহাজারী থানা সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ এসোসিয়েশন এর চেয়ারম্যান, সেন্ট্রাল কো- অপারেটিভ ব্যাংক লিঃ এর চেয়ারম্যানসহ বহু গুরুত্ব পূর্ণ সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। শ্রেষ্ঠ সমবায় সংগঠক হিসেবে তিনি পদক প্রাপ্ত হন।

নিজ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি গ্রামবাসীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ঐ গ্রামকে দীর্ঘ নয় মাস হানাদার মুক্ত রাখেন এবং নিজ গ্রামকে আশেপাশের গ্রাম সহ নিজের গ্রামের সংখ্যালঘুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত করেন। দেশ স্বাধীন হলে এজন্যে তাঁকে বিশাল গণ সম্বর্ধনার আয়োজন করে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাঁকে একাধিক স্বর্ণপদক ও নগদ অর্থ পুরস্কার প্রদান করেন। দেশের সমবায় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসাবে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার তাঁকে শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমবায় কনফারেন্স এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব প্রদান করেন। স্থল পথে হাটহাজারী-নাজিরহাট প্রধান সড়কের সাথে সংযোগ সড়ক (ডি.সি. রোড) এর তিনি উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমেও তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ সারা দেশের গ্রাম ও কৃষি উন্নয়ন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখেন। মরহুম এডভোকেট য়্যাহ্য়্যা নিজ এলাকায় পূর্ব গুমান মর্দন সরকারী প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা ছাড়াও গ্রামের প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ও পরিচালনায় অবদান রাখেন । তিনি নিজ তহবিল থেকে গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি চালু করেছিলেন । তিনি স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলনকে জোরদার করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন এবং দীর্ঘদিন জাতীয় সমবায়ের নির্বাচিত মহাসচিব, চট্টগ্রাম ও হাটহাজারী থানা সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ এসোসিয়েশন এর চেয়ারম্যান, সেন্ট্রাল কো- অপারেটিভ ব্যাংক লিঃ এর চেয়ারম্যানসহ বহু গুরুত্ব পূর্ণ সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। শ্রেষ্ঠ সমবায় সংগঠক হিসেবে তিনি পদক প্রাপ্ত হন। সমবায় আন্দোলনে তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন নোবেল জয়ী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুস, সাংবাদিক ফজলুর রহমান (পরবর্তীতে লন্ডন টাওয়ার হ্যামলেটের মেয়র), মরহুম এম,এ, ওহাব, এম.পি, দৈনিক আজাদী সম্পাদক মরহুম অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, ডা. আবুল কাশেম এমপি, মরহুম অধ্যাপক আহমেদ উল্লাহ, অধ্যাপক ড. এইচ আই লতিফী প্রমূখ খ্যাতিমান ব্যাক্তিবর্গ। ২০০৭ সালের ৬ মে বাদ ফজর হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে স্রষ্টার ডাকে সাড়া দিয়ে স্যার না ফেরা দেশে পাড়ি জমান। গ্রামের বাড়ী ও মুহসিন কলেজ মাঠে ২টি জানাজা শেষে নগরীর কাজেম আলী হাই স্কুলের সম্মুখস্থ মোল্লা মিসকিন শাহ মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে তাঁকে চিরতরে সমাহিত করা হয়। ব্যক্তি জীবনে তিনি ৬ কন্যা সন্তান এবং ১ পুত্র সন্তানের জনক। তারা হলেন যথাক্রম- এডভোকেট এ.এম জিয়া হাবীব আহসান, কানিজ ফাতেমা মুন্নি, তাসলিম আরা বেগম, এডভোকেট জান্নাতুন নাঈম রুমানা, ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস হাসি, ডা. জান্নাতুল মাওয়া রুজি, জান্নাতুল নাবিলা (এম,বি,এ)।

স্যারের একমাত্র পুত্র বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট এ.এম জিয়া হাবীব আহসানের এসোসিয়েটস্ হিসেবে মরহুম সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি তাঁর সংক্ষিপ্ত বর্ণনার এখানেই ইতি টানছি। স্যারের জন্য অশ্র“সিক্ত নয়নে দু‘হাত তুলে মোনাজাত করি-‘ হে রাব্বুল আলামীন, তাঁকে বেহেশত নসীব করুন’।

লেখক ঃ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।

Top