একজন আদর্শ মানুষ ও সফল আইনজীবী আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্য়্যা’র স্মরণেঃ

Father-Adv.-Zia-Habib.jpg

এডভোকেট জান্নাতুল নাঈম রুমানা
———————————-
বিগত ২০০৭ ইং সনের ৬ মে মৃত্যুবরণকারী আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিজ্ঞ আইনজীবী মরহুম এ.এম.য়্যাহ্য়্যা শুধুমাত্র আমার বাবা নন, তিনি আমার পেশাগত জীবনের শিক্ষক। তিনি ছিলেন বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী, মানবসেবী সমবায় আন্দোলনের নেতা, রাজনীতিবিদ এবং ইসলামী চিন্তাবিদ। সুদীর্ঘ ৩৩ বছর বাবাকে দেখেছি, বাবার কাছে শিখেছি, বাবাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। বাবার হাত ধরে হাটি হাটি পায়ে এই আইন পেশায় আমার পথযাত্রা। তিনি ছিলেন দারুন চমকপ্রদ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, মেজাজ, ধৈর্য্য, সহনশীলতা ও ধর্মের প্রতি অনুরাগ সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার ও অনুকরণ করার মত। তিনি ছিলেন আত্মপ্রচার বিমুখ সহজ, সরল, সাধারণ জীবন যাপনের অভ্যস্ত এক অসাধারণ গুনী ব্যক্তি। ধর্মের প্রতি অবিচল, আস্থা, ন্যায় নিষ্ঠা, সত্যবাদীতা, স্পষ্ট ভাষী এসব গুনাবলীই তার পেশাগত জীবন চরিত্রকে মার্জিত ও মাধূর্য মন্ডিত করে তুলেছে। এজন্যই তিনি মরেও পেশাগত জীবনে অমর হয়ে আছেন। তাঁর বুক ভরা সাহস ও একনিষ্ঠতা ছিল দারুন। অসম্ভব মেধা, পরিশ্রমী মনোভাব ও ঈমানী শক্তির কারণে তিনি কখনও তাঁর পেশাগত জীবনে অসত্যের কাছে মাথা নত করেননি। কর্মজীবনের বি¯তৃত পটভূমিতে তিনি ছিলেন সর্বদা সত্যের পথযাত্রী, অসত্য ও অন্যায়ের সহিত আপোষহীন যোদ্ধা। আমি একজন আইনজীবী হওয়ার পিছনে আমার বাবার অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর অনেক জুনিয়র আছেন যারা তাঁর কাছে হাতে কলমে শিখার সুযোগ পেয়েছেন সত্যিই তারা ছিলেন ভাগ্যবান। আমি যখন এই পেশায় আসি তখন ২০০১ সন। তখন বাবা অনেকটা অসুস্থ হয়ে গেলেও আমি যতটুকু সময় তাঁকে পেয়েছি, তাঁর পাশে থেকে শেখার অবিরাম চেষ্টা করেছি। বাবা না থাকলে আমার মনে হয় কখনোই এই পেশায় আসার সুযোগ হতনা। একজন সফল আইনজীবী হিসাবে তাঁর প্রতি অকৃত্রিম ও অগাঢ় ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল বলেই এই পেশায় আমার পদার্পন। সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক হয়ে থাকবেন তিনি আইন পেশায়। জুনিয়র হিসেবে আমি আদালতে যেদিন হতে পদার্পন করেছি, তিনি আমাকে আদালতে কখনো কন্যা হিসেবে দেখেননি। বরং একজন ‘শিক্ষানবীশ’ হিসেবে উপদেশ দিয়ে কাজ শিখাতেন। আমি তাঁর জুনিয়র হিসেবে তাঁর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধার কারণে ভীষণ ভয় পেতাম। আমার মনে হত বিজ্ঞ সিনিয়র য়্যাহ্য়্যা সাহেবের মত আইনজীবীর জুনিয়রের যোগ্য হতে আমাকে অনেক বেশী শিখতে হবে, অনেক বেশী বেশী পড়তে হবে। সময় ও সুযোগ পেলেই তিনি অনেক বেশী বেশী পড়াশুনা করতেন এবং বলতেন পড়াশুনা করা ছাড়া এই পেশায় টিকে থাকা কষ্টকর। তার দীপ্ত চোখে জ্ঞানের সুদীপ্ত আলো ঝলমল করতো। অন্যায় অবিচার দেখলে তিনি সত্য কথা বলতে কখনো কুণ্ঠবোধ করতেন না। অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেই আমার বাবা বেশী পছন্দ করতেন। দাম্ভিকতা, আহম্বরতা তার মোটেই পছন্দ ছিল না। আমার বাবা এই পেশায় আসার পর আমাকে বলতেন, ‘‘মা মনে রাখবে তোমার ক্লায়েন্ট/ মক্কেল তোমাকে আগে ফি দিলে তুমি অবশ্যই আদালতে তার পক্ষে

স্বশরীরে হাজির থাকবে এটাই তোমার মূল পেশাগত দায়িত্ব ও সততা”। আরো বলতেন, “ফি ছাড়া সব সময় কাজ করলে কিন্তু মক্কেলরা আইনজীবীর গুনাগুন মূল্যায়ন করতে পারবেন না। সেজন্য যতটুকু কাজ তুমি করেছ তোমার প্রাপ্য তুমি সঠিক ভাবে নিয়ে নিবে। তবে আদালত ভূল করলে তাকে সঠিক ভাবে বুঝিয়ে দেওয়া তোমারই দায়িত্ব। তিনি আরো বলতেন মক্কেল আসলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদেরকে হয়রানি করবেনা এবং আদালতকে সঠিকভাবে সম্মান করবে। কখনো আদালতে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে না’’। আমি আদালতে অনেক অনেক বড় বড় মামলার শুনানী/ যুক্তিতর্কের সময় আমার মরহুম আব্বা/ বিজ্ঞ সিনিয়রের সাথে ছিলাম। মাননীয় জজ আদালতে বসা অবস্থায় পক্ষাপাতিত্ব মূলক কথা বললে বাবা ভীষণ রেগে যেতেন এবং জজ সাহেবকে পর্যন্ত আদালতে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে তিনি এতটুকু কুন্ঠাবোধ করতেন না।
আইনজীবী হিসেবে তাঁর জীবন ছিল অসম্ভব নিয়মমাফিক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং সময়জ্ঞান ছিল প্রচন্ড। কোন ক্লায়েন্ট কিংবা কাউকে সময় মত আসতে বললে বাবা তার জন্য অপেক্ষা করতেন, তবে ঐ মক্কেল সময়মত না এসে নিজের ইচ্ছাকৃত সময়ে আসলে তিনি রেগে যেতেন। তখন তিনি তার সাথে আর দেখা করতে চাইতেন না। ‘‘ তখন তিনি বলতেন-যে লোকের কোন সময় জ্ঞান নেই, সেই লোকের কাজ আমি করব না’’। আদালতের বাইরে বাবা-মেয়ের মধুর øেহের সম্পর্ক থাকলেও আদালতে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কই বিদ্যমান ছিল। আইনপেশায় আমি বাবাকে দেখেছি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও গুছানো সিনিয়র হিসেবে কাজ করতে, অনেক কাজই তিনি নিজেই গুছিয়ে সেরে ফেলতেন, এলোমেলো কাজ তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। যে মামলার ভাল মেরিট বা গুনাগুন নাই সেই মামলা তিনি কখনোই নিতেন না। কোন কাজ তিনি বেশীদিন ধরে জমিয়ে রাখতেন না। ২০০৭ বারের নির্বাচনে আমি সদস্যপদে যখন অংশগ্রহণ করি, বাবা আমাকে বলতেন ‘‘তুমি কারো কাছে ভোট চাইবে না। শুধু বলবে- আমি এবার সদস্য প্রার্থী’’। অবাক হলেও এটাই আমার বড় বেশী ভাল লেগেছে, বাবা আমার জন্যা কারো নিকট ভোট চাননি। তবে নির্বাচনে সদস্যপদে নির্বাচিত হওয়ার পর বাবা বড় খুশী হয়েছেন এবং বলেছেন ‘‘মা তোমার সঠিক যোগ্যতাতেই তুমি নির্বাচিত হয়েছো’’। বাবা ছিলেন ভীষন দানশীল মনোভাবের। তিনি যাকে যখনই দান করেছেন তখন তা মুক্ত হস্তে নীরবে করেছেন এবং যে ব্যক্তিকে দান করেছেন, তাকে একেবারে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। তিনি উপদেশ দিতেন ‘‘মা দান করবে নীরবে, তবে এক টাকা, দুই টাকা দিয়ে নয় যেটা তার বিপদে তৎক্ষনাৎ কাজে লাগবে, তার বড় বেশী উপকার হবে সে ধরণের বড় দান করবে’’।

আইনপেশায় সম্পূর্ণ সততা ও বিশ্বস্থতার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিয়মমাফিক এবং সাধারণ জীবন যাপন করে ছেলেমেয়েদের সমাজে লেখাপড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সঠিক সিদ্ধান্তকে আমরা কোন দিন ভুলবো না। নারী শিক্ষাকে তিনি পদে পদে সম্মান করতেন বলেই আজ ৬ কন্যা ও একমাত্র পুত্রবধুসহ সকলে সু-শিক্ষিত। যখনই আইন পেশায় আসি, যতদিন তাঁর সাথে ছিলাম, দেখেছি জুনিয়র আইনজীবীদের গড়ে তুলতে, তাদেরকে বুদ্ধি দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে শিখিয়ে দিতে। বাবার কাছে কেউ জানতে আসলে তাকে তিনি সর্বাত্মক ভাবে শিখানোর, বুঝানোর চেষ্টা করতেন, ফিরিয়ে দিতেন না। কেউ জানতে চাইলে শিখাতেন,তাতে তিনি বড় আনন্দ পেতেন। তাঁর মৃত্যুর পর যেখানেই যাই আদালত পাড়ায় সর্বক্ষণই বাবার মত সৎ ও গুনী সিনিয়রের সুনাম শুনতে পাই। আইনপেশায় বাবার বিচক্ষনতা, সততা ও একনিষ্ঠতার কথা শুনলে বুকে এক ধরণের আনন্দ অনুভব হয়। ধার্মিকতা, পরিশ্রমী মনোভাব, বিচক্ষণতা, মহত্ববোধ ও সত্যবাদীতার কারণেই বাবার মত সিনিয়রকে সকলেই ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। সৎভাবে এই আইন পেশায় কিভাবে টিকে থাকা যায়। তাঁর সুদীর্ঘ ৪২ বৎসর আইন পেশার জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। বাবাকে এই পেশায় ছোট বেলা থেকে দেখেছি। এই পেশায় পদে পদে তাঁর সত্যনিষ্ঠতা দেখেছি এবং চরম ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি এই পেশায় আসার। বাবা বলতেন ‘মা ওকালতি পেশাটি বড়ই কঠিন, আমরা দিনরাত পরিশ্রম করেছি, অনেক বেশী পড়েছি, এখনও পড়ি। ধৈর্য্য, সততা, মেধা ও শ্রম ছাড়া এই পেশায় সৎভাবে টিকে থাকা কষ্টকর। সব সময় পড়বে। তাহলে নতুন নতুন অনেক কিছুই জানতে পারবে’’। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে তিনি তাঁর সততা ও স্পষ্টবাদীতার জন্যই সমাদৃত ছিলেন। মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট আমি কৃতজ্ঞ, আমার বাবার মত একজন, মহৎ, একনিষ্ঠ, সত্যবাদী, মেধাশীল মানুষের কন্যা হয়ে তাঁরই হাত ধরে এই পেশায় আসতে পেরে। আজীবন চেষ্টা করবো তাঁর দেওয়া উপদেশ বাণী গুলো পদে পদে অনুসরণ করতে। মহান আল্লাহ তাঁকে ‘‘জান্নাতুল ফেরদৌস’’ নসীব করুন। আমার আইন পেশায় ও ব্যক্তিগত জীবন ধারায় আমার মরহুম পিতার জীবনাদর্শকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে বার বার স্মরণ করবো ইনশা-আল্লাহ। তাঁর বিচক্ষনতা, সততা ও আদর্শের জন্য তিনি এই আদালত প্রাঙ্গনের আইন পেশার ধারায় আমাদের সকলের নিকট উদাহরণ হয়ে থাকবেন আজীবন এই আশা রাখি।

লেখক-
আইনজীবী ও প্যানেল ল’ইয়ার,
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ ফাউন্ডেশন

Top