রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে নিহত রংপুরের পিয়ারুলের মা ও ছেলের আহাজারি

received_448876925848241.jpeg

মোঃ রাফিউল ইসলাম(রাব্বি)। স্টাফ রিপোর্টার,রংপুর :

মুই টাকা নিয়্যা কি করিম। মোর বাবাক ফিরি দ্যাও। মোর কলিজার টুকরা বাবা ছাড়া হামরা যে অসহায়। হামার এ্যালা আর কায়ো খোঁজ রাখে না। সন্তান হারানো মায়ের চোখ এখনো পিয়ারুল ইসলামকে খোঁজে। তাইতো কথাগুলো বলতে বলতে সন্তানের ছবি দেখা মাত্রই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বারবার পিয়ারুলকে ফিরে আসার জন্য চিৎকার করেন বৃদ্ধা মা পেয়ারি বেগম।
পিয়ারুল রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শিবপুর দিঘীরপাড় গ্রামের লায়েব আলীর একমাত্র ছেলে। সংসারের স্বচ্ছলতার আশায় দুই শিশু সন্তান আর স্ত্রীকে মা-বাবার কাছে রেখে ঢাকায় গিয়েছিলেন। রানা প্লাজায় পোশাক শ্রমিক হিসাবে কাজ নিয়েছিলেন। ২৮ বছরের যুবক পিয়ারুলকে বাঁচতে দেয়নি ঝুঁকিপূর্ণ রানা প্লাজা। ভবন ধসে মারা যান তিনি। অথচ তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পিয়ারুলের মৃত্যুর পর ছয় মাসের শিশুসন্তানকে রেখে স্ত্রী আবার বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছেন। দুই বেলা দু’ মুঠো ভাতের জন্য লড়াই করতে থাকা পিয়ারুলের পরিবার এখন অসহায়। দেখতে দেখতে রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির ছয় বছর পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু এখনো তেমন আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়নি দুর্ঘটনার শিকার এই পরিবার। এক পিয়ারুলের শূন্যতায় মা-বাবা হারিয়েছেন তাদের সন্তান। অবুঝ দু’টি শিশু হারিয়েছে তাদের বাবা। আর ছোট বোনরা হারিয়েছেন একমাত্র ভাই। হারানো সেই ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে পরিবারটি। পিয়ারুলের বৃদ্ধ বাবা লায়েব আলী এখন সংসারের লাগাম ধরেছেন। ছেলের মৃত্যুর পর সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে যে আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছিলেন, তা থেকে কিছু জমি বন্ধক নেন। সেই জমির ফসল আর দিনমজুরের কাজ থেকে যা আয় হয়, তাই দিয়ে কোনো রকমে চলছে পরিবারটি। পিয়ারুলের অনার্স পড়ুয়া ছোট বোন নাজমিন আক্তার বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘‘ভাইয়া ছিল সংসারে সুখ শান্তি। আজ ভাইয়া নেই। বৃদ্ধ বাবাকেই সব কিছু দেখাশোনা করতে হচ্ছে। আমার পড়ালেখার খরচ, স্বামী পরিত্যক্ত আরেক বোন, ভাইয়ের দুই শিশু ছেলে সবাইকে নিয়ে খুব কষ্টে আমাদের দিন কাটছে। আগের মতো কেউ আর আমাদের খোঁজ রাখে না। সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী আমরা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাইনি। পিয়ারুলের পরিবারের মতো বদরগঞ্জ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত অন্য পরিবারগুলোরও একই অবস্থা। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল দিনটি অন্য সবার কাছে আবেদন ম্লান হলেও রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারদের জীবনে অভিশাপময় এক কালো দিন হয়ে থাকবে। রানা প্লাজা ট্যাজেডিতে রংপুরের ২৬ জন পোশাক শ্রমিক নিহত হন। এর মধ্যে বদরগঞ্জে ১৮ জন, মিঠাপুকুরে সাতজন এবং রংপুর সদর উপজেলার একজন রয়েছেন। ওই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন অর্ধশতাধিক। যাদের বেশিরভাগই এখনো পেটের তাগিদে রাজধানীতে পড়ে আছেন। জেলা প্রশাসক এনামুল হাবীব বলেন, ওই ঘটনায় নিহতদের পরিবারগুলোকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়। আমরা তাদের খোঁজ খবর রাখার জন্য স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ২৪ এপ্রিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ানক রানা প্লাজা ধসের দুর্ঘটনায় এক হাজার ১৩৫ জনের মৃত্যু হয়। আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিল দুই হাজার ৪৫৮ জন পোশাক শ্রমিক।

Top