পরিত্যক্ত জেলখানাকে বিদ্যাপীঠে রূপান্তরের কারিগর একজন আব্দুল মজিদ মাস্টার

received_846725029005451.jpeg

আশিস রহমান :

শিক্ষক পরিচিতির কাছে গৌণ হয়ে গিয়েছিল তার সংসদ সদস্য পরিচিতি। এর বাইরেও তার আরো অনেক পরিচিতি ছিলো কিন্তু সবাই স্যার কিংবা মাস্টার নামে সম্বোধন করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।
বলছিলাম জননেতা এডভোকেট আব্দুল মজিদ মাস্টারের কথা। যিনি সুদূর নরসিংদী থেকে এসে দোয়ারাবাজার উপজেলার মতো একটি প্রত্যন্ত এলাকায় নিজ হাতে শিক্ষার আলো জ্বেলেছিলেন। উপজেলাবাসীকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। দলমত, রাজনৈতিক সংকীর্ণ গন্ডির উর্ধ্বে ওঠে তিনি আমৃত্যু শিক্ষক হিসেবেই সবার নিকট শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। বর্তমান সমাজে এরকম মানুষ বিরল।
আমার বাবা দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমানও ছিলেন মজিদ স্যারের ছাত্র। সেই সুবাদে স্যারের সাথে আমাদের পারিবারিক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। স্যার আমাদের বাড়িতে অনেক বার এসেছিলেন। এলাকায় আসলেই আমাদের বাড়িতে অন্তত একবার হলেও স্যারের পা পড়তো। আমরা দাদাভাই বলে ডাকতাম। আমাদেরকে কখনো শালা, কখনো ভাই, কখনোবা নাতি বলে সম্বোধন করতেন। যতদূর জানি স্যারের স্মরণ শক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিলো। একবার কারো নাম শুনলে দ্বিতীয়বার আর বলতে হতো না। দীর্ঘদিন পরেও স্যার ওই নাম মনে রাখতে পারতেন, চিনতেও পারতেন।
আমি রাজনীতি করতাম না। এখনো রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছি। দিন তারিখ সঠিক মনে পাড়ছেনা। সম্ভবত ২০১৪ সাল। দোয়ারাবাজার উপজেলা অডিটোরিয়ামে উপজেলা জাতীয় পার্টির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন চলছে। আমি তখন স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকার দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রতিনিধি। সংবাদকর্মী হিসেবে ওই সভার নিউজ কভার করতে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম।
দোয়ারাবাজার উপজেলা জাতীয় পার্টির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন করলেন তৎকালীন জেলা জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি এডভোকেট আব্দুল মজিদ স্যার। সম্মেলনে নবীনদের চেয়ে প্রবীণদের উপস্থিতিই ছিলো বেশি। মজিদ স্যার সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন। নিচে দাড়িয়ে ছবি তুলছি আমি। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে হঠাৎ তিনি আমাকে নাম ধরে ডাক দিলেন। মঞ্চে উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছু বুঝে উঠার আগেই সম্মেলনে শতশত উপস্থিত জনতার সামনে তিনি আমার হাত উচুঁ করে ধরে বললেন, ‘ও হচ্ছে আমার নাতি। তার বাবা মশিউর রহমান আমার ছাত্র। সে আমাদের আগামী দিনের সম্ভাবনা। তাকে আজ থেকে দোয়ারাবাজার উপজেলা জাতীয় ছাত্র সমাজের সভাপতি ঘোষণা করলাম।’ ঘোষণার পর উপস্থিত নেতাকর্মীরা করতালি দিয়ে স্বাগত জানালেন। সেদিনের সেই মুহূর্তে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এতো মানুষের সামনে ভেতরে ভেতরে বেশ লজ্জা কাজ করছিল। দোয়ারাবাজার উপজেলায় জাতীয় ছাত্র সমাজের কোনো কমিটি নেই। সাংগঠনিক ভিত্তিও নেই। কিন্তু সেদিন থেকে আমি উপজেলা জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের কাছে উপজেলা ছাত্র সমাজের অলিখিত সভাপতি হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে গেলাম। নানা কারণে পরবর্তীতে ছাত্র সমাজের রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। জাতীয় পার্টিতেও যোগ দেইনি। কিন্তু ওইদিনের ওই ঘটনার কারণে এখনো অনেকেই মনে করেন আমি জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত।
অনার্সে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর এখনো সুনামগঞ্জে থেকেই পড়াশোনা করছি। স্যারের উকিলপাড়াস্থ বাসভবনের সামন দিয়ে প্রায়শই আসা যাওয়া হতো। মাঝেমধ্যে ফাক পেলে উনার বাসায় যেতাম। দেখলে নাতি বলে জড়িয়ে ধরতেন। সোফায় উনার পাশে ডেকে নিয়ে বসাতেন। চা নাশতা করাতেন। মাঝেমধ্যে পকেট থেকে গাড়ি ভাড়া হিসেবে একশ টাকার কয়েকটি নোট আমার হাতে জোরপূর্বক ধরিয়ে দিতেন। উনার মত বড়মাপের একজন রাজনীতিকের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ আমার হয়েছিল। স্যারের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে তার সবগুলো লেখায় তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
ছাতক-দোয়ারার প্রতিটি মানুষকে তিনি নিজের পরিবারের মানুষের মতোই দেখতেন। ভালোবাসতেন। ২০১৬ সালে তখন ঢাকায় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হচ্ছে। এর দুইদিন আগে আমি বাড়িতে না জানিয়ে মজিদ স্যারের সফরসঙ্গী হিসেবে উনার গাড়িতে করে সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলাম। গাড়িতে মজিদ স্যারের সাথে ছিলাম আমি, উনার বড় ভাই জাতীয় কৃষক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি আব্দুল আওয়াল, সাংবাদিক হাবীবুল্লাহ হেলাহী ভাই। এখনো মনে পড়ে গাড়িতে আমরা বেশ জমিয়ে আড্ডা দিয়েছিলাম। নরসিংদীতে উনার এক ভাতিজির বাসায় আমরা অবস্থান করেছিলাম। ওখানে একসাথে রাতের খাবার খাই। আমি, আওয়াল ভাই, হেলালী ভাই ওইদিন একসাথেই ফ্লোরে রাত্রিযাপন করেছি। স্যার একটু পর পর আমাদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। ঢাকায় আমাদের থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থাও করেন তিনি। সবাইকে নিজরুমে ডেকে নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন, আপ্যায়ন করিয়েছিলেন।
একদিন বসে গল্প করছিলেন। গল্পে গল্পে বলছিলেন দোয়ারাবাজার উপজেলা সৃষ্টির ইতিহাস, হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, উনার স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। তখন শীতকাল ছিল। শরীরের চাদর মোড়িয়ে সোফায় বসে আছেন তিনি। আমি পাশে বসেই গল্প শোনছিলাম। বলছিলেন উনার কর্মময় জীবনের নানা কাহিনী। দোয়ারাবাজারের পরিত্যক্ত জেলখানা কিভাবে বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেছিলেন, শোনালেন সেই গল্প। সেদিন দাদাভাইকে উনার একটা সাক্ষাৎকার পত্রিকায় প্রকাশ করব বলে কথা দিয়ে এসেছিলাম । ইচ্ছে ছিলো সাক্ষাৎকারে জেলখানা থেকে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরবো। করবো করবো বলে করা ওঠতে পারিনি। তারই আগে শনিবার সকাল ৮টা ৪২মিনিটে সিলেট ওসমানী মডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
একটা মানুষ কতটুকু স্বাপ্নিক ও পরিশ্রমী হলে সম্ভাবনাকে সাফল্যে রূপান্তর করতে পারেন তার উদাহরণ এডভোকেট আব্দুল মজিদ মাস্টার। যিনি সর্বপ্রথম দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। নিজেই সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ তৈরী করেছিলেন। তারপর হয়েছিলেন সংসদ সদস্য। দোয়ারাবাজার উপজেলায় উন্নয়নের সূচনা ঘটেছিল উনার হাত ধরেই। উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুতায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন- সকল খাতকে এগিয়ে নিতে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পরে দোয়ারাবাজার উপজেলার সর্বপ্রথম এবং একমাত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন মজিদ স্যার। আইন পেশায়ও সাফল্য দেখিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে পিপি হয়েছিলেন, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমৃত্যু দোয়ারাবাজার মডেল উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সুনামগঞ্জস্থ দোয়ারাবাজার কল্যান সমিতির উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন।
একজন সফল ও সংগ্রামী মানুষ মজিদ মাস্টার সাধারণ মানুষ থেকে জননেতায় পরিণত হয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত দক্ষতা দিয়ে। একাত্তরের রনাঙ্গনের বীরমুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট আব্দুল মজিদ মাস্টার তার বহুমুখী কর্মগুণে সবার মনে বীরের মতোই বেচেঁ থাকবেন আজীবন। প্রিয় মানুষটির সাথে চাইলেও আর কোনোদিন দেখা হবে না। দাদাভাই বলে ডাকা হবেনা। উকিল পাড়ার বাসায় তার শূন্যতা আমাদের সবসময় অভিভাবকহীনতার কথাই মনে করিয়ে দিবে। উনার অনুপস্থিতি মনে করিয়ে দিবে দোয়ারাবাজার উপজেলার সর্বস্তরের মানুষই শুধু একজন মজিদ মাস্টারকে হারায়নি, হারিয়েছে একজন অভিভাবকও।

লেখক: সংবাদকর্মী

Top