ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব

28783285_1987347284849947_8804784805859005494_n.jpg

১৮১৮ সালে প্রকাশিত মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন অর দ্যা মডার্ন প্রমিথিউস’ বইটাকে পৃথিবীর প্রথম সাইন্স ফিকশন মনে করা হয়। বইটার মূলভাব, ফ্রাঙ্কেস্টাইন নামক এক জার্মান গবেষক বিশেষ প্রযুক্তির মধ্যমে এক দানব সৃষ্টি করেন, যা তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। পরবর্তীতে দানবটি তার সহকারী, আয়া, তার স্ত্রী, ভাইসহ পরিবারের সবাইকে এবং শত শত সাধারণ মানুষকে খুন করে।

আমরা প্রবলভাবে ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছি,সব কিছু ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছে।আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা, প্রেম, কামনা, রাজনীতি, বন্ধুত্ব, দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা, সবকিছু। কবরে সেলফি, শ্মশানে সেলফি, উপাসনালয়ে সেলফি, অপারেশন থিয়েটারে সেলফি, বেডরুম, ওয়াশরুমে সেলফি তুলে অনায়াসেই আমরা সেশ্যাল মাধ্যমে পোস্ট করছি। মানুষ মারা যাচ্ছে, আমরা সাহায্য করার পরিবর্তে সেলফি তুলছি কিংবা লাইভে যাচ্ছি। প্রাইভেসি শব্দটা না হয় অভিধান চাপা দিয়ে রেখে দিলাম। কিন্তু দায়িত্ব, কর্তব্য, সহমর্মিতা, মনুষ্যত্ব, মানবতাবোধ, শব্দগুলো চাপা দেব কিভাবে? এই শব্দগুলিই তো সামাজিক ঐক্যবদ্ধতার ভিত্তি।

বনানীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারব আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। কতটুকু মানবিক অধঃপতন হয়েছে আমাদের। মানুষ পুড়ে ভষ্ম হচ্ছে, আর কেউ সেলফি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ লাইভে যাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে, পোড়ার ছবি, মরার ছবি। যার দরুণ বিঘ্নিত হয়েছে অগ্নি নির্বাপণ এবং উদ্ধার কার্যক্রম। নুসরাত জাহান রাফির নামাজের জানাজাতেও আমরা দেখেছি, কিছু মানুষ ছবি তুলছে, কিছু মানুষ সেলফি তুলছে, কিছু মানুষ ভিডিও করছে, কিছু মানুষ লাইভে যাচ্ছে। জানাজার নামাজের মত স্পর্শকাতর জায়গায় কেন ছবি, ভিডিও সেলফি তোলার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে তা আমার বোধগম্য হয়ে উঠেনা।

নিশ্চয় সোশ্যাল মাধ্যমগুলি মত প্রকাশের দারুণ প্লাটফর্ম। কিন্তু সোশ্যাল মাধ্যমে কি প্রকাশ এবং শেয়ার করা উচিত, আর কি উচিত না তা আমাদের জানতে হবে, বুঝতে হবে। আমার ধারণা, আমাদের কাণ্ডজ্ঞান বোধহয় লোপ পেতে শুরু করেছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বা সেশ্যাল মাধ্যমে কি করা উচিত, কি করা উচিত না, তা আমরা মোটেই ভাবার প্রয়োজন বোধ করছি না। প্রখাত কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেছিলেন,”এই প্রজন্ম মাথা নিচু করে ফোন স্ক্রলিং করতে করতে মাথা নিচু প্রজন্ম হয়ে যাচ্ছে”।

আমার বার বার মনে হয় প্রযুক্তিটা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব হয়ে যাচ্ছে, যা ক্রমশ আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি না, প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করছে। প্রযুক্তি নীতিবিদ্যার যদি প্রচার প্রসার না করা হয়, প্রযুক্তি নীতিবিদ্যায় মানুষকে যদি নৈতিক করা না যায়, প্রযুক্তি ব্যবহারের কালাকানুন যদি আইনগত শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানো না যায়, তবে মানুষের সৃষ্টি প্রযুক্তি ফ্রাঙ্কেস্টাইনের দানবের মত মানুষের কাঁধেই ছোবল বসাবে।

লেখক: মোকতার আহমদ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top