বায়ুদূষণ থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা জরুরীঃ

1555068345751blob.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

বাতাসে ক্ষতিকারক পদার্থ যেমন ক্ষতিকর রাসায়নিক গ্যাস, ধূলিকণা, শিল্প কারখানা, যানবাহন, ষ্টীমার লঞ্চ ও ইঞ্জিন চালিত বোটের কালো ও বিষাক্ত ধোঁয়া, ইটভাটার ধোঁয়া, জীব জন্তুর মৃতদেহের দুর্গন্ধ ও মানুষের মল মূত্র, গাছ ও ময়লা আবর্জনা পোড়ানো সহ বিভিন্ন দুর্গন্ধ বাতাসে মিশলে বাতাস বা বায়ু দূষিত হয় যায়। শিল্প, কল কারখানা, বিভিন্ন দোকানে বা বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত পুরানো এবং উচ্চ শব্দের জেনারেটরের কালো ধোঁয়া বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে এবং এতে শব্দ দূষণও হচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন হাটবাজারের জবেহকৃত জীবজন্তুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি মাটিতে পুতে ফেলার নিয়ম থাকলেও তা হয় সরাসরি নদীতে পড়ছে। অথবা তা খাল, উপখাল বা বড় বড় নালা নর্দমায় ফেলছে যা পুঁছে গিয়ে বায়ুদূষণ করছে। বিভিন্ন গৃহস্থালি, মানব বর্জ্য ও বাজারের বর্জ্য অনেক্ষেত্রে নদী বা খালে ফেলে নদীকে ভরাট আর বায়ুকে দূষণ করছে। পাশাপাশি পাহাড় কাটা, কৃষিজমি নষ্ট করে বিভিন্ন ধরণের শিল্প কারখানা বৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়নও বায়ু দূষণের কয়েকটি প্রধান কারণেরও অন্যতম। পাশাপাশি নগর উন্নয়নের কারণে বাতাসে ধুলাকণা মিশেও বাতাসকে দূষণ করছে প্রতিনিয়ত। বায়ু দূষণের ফলে মানুষের জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্য বিভিন্নভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে। দেশের পরিবেশ, বনজ এবং বিভিন্ন সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বায়ুদূষণ জীবজন্তু, পশুপাখী, কীটপতঙ্গ ,ফসলের জন্য ক্ষতিকারক হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য, জলজজীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তরে পরিবর্তন ঘটায় তা দেশের ও বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরাট হুমকি হিসেবে মানবজাতির জন্য ভয়াবহ এবং ভয়ংকর পরিবেশ বিপর্যয় এবং উষ্ণণতা বৃদ্ধির কারণ। ফলশ্রুতিতে প্রকৃতি মানুষের সাথে বিরূপ, রূঢ় আচরণ করছে। দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, শীতকালে কখনো শীতের প্রকোপ বাড়ছে কখনো বা একেবারে শীতও অনুভব হচ্ছে না। এক তথ্য থেকে জানা যায়, “২০১৪ সালের WHO এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১২ সালে বায়ু দূষণে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে বাংলাদেশে প্রতি বছর যতো মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণ জনিত অসুখবিসুখের কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ।বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছে, শহরাঞ্চলে এই দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে তারা বলছে, দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে”। আরেক গবেষণা থেকে জানা যায়, বায়ুদূষণে আক্রান্তদের ৭৫ শতাংশ মারা যায় হৃদরোগ বা স্ট্রোক থকে বাকী ২৫ শতাংশ ফুসফুস রোগে। শুধু তাই নয়, এত মৃত্যুর ৭৫ শতাংশ আবার ঘটে এশিয়া মহাদেশে যেখানে খুবই ভয়াবহ বিশেষ করে চীন ও ভারত। জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর ফলে বেশীরভাগ দূষণ হয়। আমাদের বাংলাদেশও বায়ু দূষণের দিক থেকে পিছিয়ে নেই। অত্যন্ত ভয়ংকর এবং ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, “বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি- ২০১৭” শীর্ষক এক তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা এবং শীর্ষে রয়েছে ভারতের দিল্লী। আরো জানা যায়, ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। আর এই দূষণে সবচেয়ে ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। বর্তমান ২০১৯ সালে এসে বায়ুদূষণের মাত্রা বাংলাদেশে যে আরো কত ভয়ংকর এবং ভয়াবহ হয়েছে তা অবস্থাদৃষ্টে অতি সহজেই অনুমেয়।

ধীরে ধীরে চট্টগ্রামেও বায়ুদূষণ নানান কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদী দখল ও ভরাটের কারণে নদী, খাল, উপ খালের পানি চলাচল বাঁধাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন ধরণের বর্জ্য পচনের ফলে বাতাসকে দুষিত করছে। নগরীর বড় বড় নালা দখল হয়ে নালার পানি চলাচলে বাঁধাগ্রস্ত হয়ে বা নালা-নর্দমা নিয়মিতভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না করার ফলেও বায়ু দুষিত হচ্ছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত শিল্প কল কারখানার বিশেষ করে ভারী শিল্প কারখানা অঞ্চল নাসিরাবাদ, ষোলশহর, বায়েজিদ বোস্তামী, অক্সিজেন, কালুরঘাট, এ কে খান এলাকা, সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন এলাকার হাল্কা, মাঝারি ও ভারী শিল্প ও কল-কারখানা থেকে নিগৃত কালো ও বিষাক্ত ধোঁয়ার সংগে বস্তুকণা, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড,লেড বা সীসা, লোহাসহ অন্যান্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর উপাদান বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে অহরহ। যা বাতাসকে ঘণ ও ভারী করার পাশাপাশি দূষিত করে তুলছে প্রতিদিন। যান্ত্রিক উৎস থেকে সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া ও ধূলা থকে বাতাসে ক্ষুদ্রকণা ছড়িয়ে পড়ে বলে বিজ্ঞানীদের অভিমত। পাশাপাশি কয়লা ও জৈব জ্বালানী পোড়ানো থেকে ক্ষতিকর কণার সৃষ্টি। আর এসবের উৎস হচ্ছে, ইটভাটা, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের দোয়া এবং সড়ক, ভবন সহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী থেকে তৈরি ধূলায় এসব কণার সৃষ্টি হয় বলে জানা যায়। পেট্রোল, ডিজেল এবং কাঠসহ নানান ধরণের জ্বালানী পোড়ানো হলে এবং কয়লা, গ্যাস ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে বাতাসে কার্বন মনোঅক্সাইড এবং কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে বাতাসকে দূষিত করছে বলে বিজ্ঞানীদের অভিমত। বায়ুদূষণের ফলে মানুষের মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, শুক্রাণুর ক্ষতি বা স্পার্ম কোয়ালিটি কমে যাওয়া, হাড়ের ঘনত্ব কমে ফ্র্যাকচার হওয়া, কিডনীর রোগ, স্ট্রোকের ঝুঁকি, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগের ঝুঁকি, উচ্চ রক্তচাপ, জন্মগত ত্রুটি বা বিভিন্ন প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মহার বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নানাবিধ প্রভাব ইত্যাদি। সর্দি কাশি শ্বাসকষ্ট হাফানি বা অ্যাজমা মানুষকে অহরহ শারীরিকভাবে অক্রান্ত করছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য আর কিছুদিন পর আমাদের প্রতিবেশী ভারতে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশটিতে বায়ু দূষণ রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন “স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার এর ২০১৯ এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে বায়ুদূষণের কারণে ভারতে ১২ লাখের বেশী মানুষের মৃত্যু হয়েছে”। {সূত্রঃ আজাদী, ৪ এপ্রিল’১৯}। “যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন বলছে, বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। এত দিন এই উপাদান সবচেয়ে বেশি নির্গত করত চীন। গত দুই বছরে চীনকে টপকে ওই দূষণকারী স্থানটি দখল করে নিয়েছে ভারত। চীন ও ভারতের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান”। { সূত্রঃ প্র / আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি’১৭। ভারতের পরে যে আমাদের দেশের মানুষের মৃত্যু ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি কি পরিমাণ মারাত্মক এবং ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে তা উপরোক্ত তথ্য থেকে সহজে বুঝা যায়।

সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ সবার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ একটি দেশ। পাশাপাশি বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব দেশকে, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মোটা দাগে বলা যায়, বায়ুদূষণ যতো না প্রকৃতিক তারচেয়েও বহুগুণ বেশী মানবসৃষ্ট। তাই বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব ও ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য বায়ুদূষণ রোধ করা জাতির জন্য অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়। ইটভাটাগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে ধূলাবালি কমানোর ব্যাপারে জরুরী ভিত্তিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি তা লোকালয় থেকে সরিয়ে নেয়া বা সেখানে গড়ে তোলা। । শিল্প কলকারখানা থেকে বিষাক্ত, কালো এবং রাসায়নিক ক্ষতিকর পদার্থ নির্গমনের পরিবর্তে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা আবশ্যক। পাশাপাশি বর্তমানে চালু কল কারখানাগুলো থেকে যাতে বিষাক্ত ধোঁয়া বেরুতে না পারে সেব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। উচ্চ শব্দের কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনকারী জেনারেটর চালানো নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। ফিটনেসবিহীন লক্কড় ঝক্কড় মার্কা কালো ধোঁয়া নির্গত হয় সেসব যানবাহন যা এখন সড়কে বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য, দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে সেগুলো একেবারে ধ্বংস করে দিতে হবে। কালো ধোঁয়া সৃষ্টিকারী যানবাহন গুলোর চলাচল নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি পরিবেশ বান্ধব জ্বলানীর মাধ্যমে গাড়ীর কালো ধোঁয়া বন্ধ করার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কালো ধোঁয়া উৎপাদন করে এমন যানবাহন ব্যবহার বন্ধ করা। যানবাহনে কম জ্বালানি ব্যবহার হয় এমন উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। ধূমপান নিষিদ্ধ করা। বিশেষ করে অন্য মানুষের কাছাকাছি বা বদ্ধস্থানে ধূমপান না করা। রান্নাঘরে বায়ু চলাচলের ভালো ব্যবস্থা তৈরি করা। উন্নত চুলা ব্যবহার করা। শিল্প বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য, নদী দূষণ, ভরাট কামানোর পাশাপাশি নদীর নব্যতা ফিরিয়ে আনা, পাহাড় কাটা বন্ধ, সবুজ বনায়নের পাশাপশি সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চচলের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন । জীব বৈচিত্র্য, জলজ জীব বৈচিত্র্য রক্ষা, বন উজাড় না করা, পুকুর, ডোবা, জলাশয়, দীঘি, নদী রক্ষা ও ভরাট না করার ব্যাপারে জাতিকে সচেতন হতে হবে।

মানুষের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে দখলদারী মনোভাব ত্যাগ করে নদী ভরাট, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং বন উজাড় না করলে দেশের ভয়ংকর বায়ু দূষণ থেকে মানুষ রক্ষা পাবে। দেশের বায়ুদূষণ রোধ করার জন্য জনসচেতনতা, রাজনৈতিক এবং সামাজিক এবং ধর্মীয় অঙ্গীকারের পাশাপাশি গভীর দেশপ্রেমের কোন বিকল্প নেই । আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুখী সুন্দর সুস্থ সবল নিরাপদভাবে বেড়ে উঠার জন্য বায়ু দূষণ মূক্ত বাসযোগ্য সবুজ আবাসভূমি গড়ে তোলা আমাদের সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং নৈতিক দায়িত্বও বটে। আমাদের প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলেই সুন্দর আগামীর জন্য বায়ুদূষণ রোধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।

Top