নারী ও শিশু যৌন নির্যাতনের শেষ কোথায়?

IMG_20190416_231822.jpg

নিগার সুলতানা সুপ্তি ;

টিজিং বাংলাদেশে বহুল আলোচিত বিষয়। যেহেতু এই সামজিক ব্যাধিটি এখনও নির্মূল হয় নি তাই প্রসঙ্গটি আমাদের কাছে সেকেলে হয়ে পড়ে নি। বর্তমানে এনজিও ও সিভিল সমাজের চেষ্টায় ইভ টিজিং শব্দটিকে বাদ দিয়ে “সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট বা যৌন হয়রানি” শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কেননা ইভ টিজিং কথাটি নারীকে উত্ত্যক্তকরণের বিষয়টিকে হালকা করে দেয়। যৌন হয়রানি বা সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট পশ্চিমা তথা উন্নত দেশসমূহ অনেক আগে থেকেই একটি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত। সেসব দেশে ঘরে বাইরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যে কোন যৌন হয়রানি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

নির্যাতন, শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণ, ইভটিজিং এবং হত্যা সভ্যতার যে কোনও ক্ষেত্রেই ধিক্কারজনক ঘটনা। একথা সত্য যে, বিশ্বের বহু দেশেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি জাতিসংঘের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই এর হার বেশি, যা আমাদের দারুণভাবে আতংকিত করে। এক কথায় বলা চলে,বাংলাদেশ এখন ধর্ষক দ্বারা অবরুদ্ধ। চিন্তায়, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, কৃষ্টিতে, রাজনীতিতে কোথাও কোন জরার ছাপ নেই বাংলাদেশে অথচ নারীর প্রতি সহিংসতা কমে নি। কারণ অনেকেই আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ থেকে সরে গেছেন। সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ও তার আংশিক রূপায়ণ সত্ত্বেও নারীকে অবহেলিত ও অনুন্নত সম্প্রদায় হিসাবে ভাবার প্রবণতা প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে আমাদের সমাজের প্রতি স্তরেই। আজ আমরা ধরেই নিয়েছি যে, এটাই রীতি এবং আমাদের কাজকর্মের মধ্যে যে অপরাধবোধ কাজ করা উচিত সেই বোধটাই হারিয়ে যাচ্ছে বলেই সামগ্রিকভাবে অপরাধমূলক কাজকর্মের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। এবং আমরা চূড়ান্তভাবে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি বলেই অন্যের আর্তনাদে আমাদের হৃদয় আর তেমন আন্দোলিত হচ্ছে না। নিজেকে নিয়েই আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে, অন্যের কষ্ট অনুভব করার মতো মন কোথায়? সেই কারণে আমাদের দেশে চাঞ্চল্যকর কিছু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও তা মূলত সীমাবদ্ধ থেকেছে নারী সংগঠন ও স্থানীয় গোষ্ঠীর মধ্যে। কিন্তু এই ভয়াবহ অবস্থা প্রতিরোধ করতে এবং সমাজ থেকে এই বিপর্যয় দূর করতে সমাজের মূলধারা বিশেষত সুশীল সমাজ ও রাজনীতিবিদরা জাতীয় ঐকমত্য নিয়ে একত্রে বসেন নি। আমরা অনেক ক্ষেত্রে দেখি আমাদের বড় বড় সামাজিক বিপর্যয় এবং নারী নির্যাতনের ব্যাপারে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ সমান নীবরতা পালন করেন। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এক ধর্ষণের ঘটনা পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এ বর্বরতার বিচার চেয়ে পুরো ভারতবাসী ফুঁসে উঠেছে। তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করে তীব্র আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে দেশটির ভেতর। অথচ আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট নারীর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। যৌন হয়রানির শিকার কিশোরী বা তরুণী বড় হয়ে সে অন্য পুরুষ এমনকি নিজের স্বামীকেও ঘৃনা করতে পারে। এই দেশে, বাড়ীতে আত্বীয় স্বজনেরা, বাসের পার্শ্ববর্তী যাত্রী ও কন্ডাকটর, স্কুলে যাওয়ার পথে বখাটেদের দ্বারা প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির শিকার হয় নারী কিন্তু তারা মুখ খুলে না। বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে, যা নিয়ে বেশিরভাগ নারীই নীরব থাকে। পিতামাতা তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না।কারণ, শিক্ষক দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে। গার্মেন্টস, কর্পোরেট সেক্টর, এনজিও, মিডিয়া, সরকারী অফিস প্রায় সবখানেই ক্ষমতার অপব্যবহার হয়। চাকুরি হারানোর ভয় দেখিয়ে, মিথ্যা প্রলোভনের মাধ্যমে যৌন হয়রানি করা হয়ে থাকে । কিন্তু এসব নিয়ে যৌন হয়রানির শিকার নারীটি দুর্নামের ভয়ে সচরাচর মুখ খোলে না । আর এ ব্যাপারে সরকার, গার্মেন্টস মালিক বা কর্পোরেট মালিকেরা কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়েছেন কি? অথচ প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রান রোধে নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা উচিত ।

জাতিসংঘ, নানা আর্ন্তজাতিক সংস্থা এবং কিছু বহুজাতিক সংস্থায় যৌন হয়রানির ব্যাপারে “জিরো টলারেন্স” পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে। আর্ন্তজাতিক সংস্থাসমুহের মতো বাংলাদেশের সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর “জিরো টলারেন্স” পলিসি নেয়া কি খুব কঠিন? এক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি দরকার। বর্তমান নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে কাউন্সিলর নিয়োগের বিষয়টি উঠে এসেছে। কিন্তু পলিসি তৈরি করতে সরকার কেন এখনও পিছিয়ে আছে? শুধু পলিসি নয়, সরকারের উচিত হবে, এক্ষত্রে পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর হতে দেয়া। যৌন হয়রানি রোধে বাংলাদেশের সরকারী ও বেসরকারী সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে নিজস্ব সেফটি নেট ও মেকানিজম থাকাও জরুরী।

এছাড়া রয়েছে পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যর্থতা ও উদাসীনতা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতাকে আড়াল করতে আইনি জটিলতাকে দায়ী করা হয়। অথচ সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার মূল দায়িত্ব পুলিশের। নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য ২০০৩ সালের অধ্যাদেশে নেয়া হয়েছে বিশেষ শাস্তির বিধান। তারপরও কি সমাজ থেকে এ অপরাধ প্রবণতা কিছু কমেছে? এক কথায় বলা চলে, না। কারণ আইন আছে কিন্তু সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই। তাই অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ধর্ষিতার ন্যায়বিচার পেতে প্রতি মুহূর্তে কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে।

সুতরাং নারীর সম্মান, নারীর বিরুদ্ধে সহিংস আচরণ, পৈশাচিক কায়দায় ধর্ষণ ও হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। এক্ষেত্রে সচেতন, সভ্য, শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব অপরিসীম—এ কথা অনস্বীকার্য।

নিগার সুলতানা সুপ্তি
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
রোকেয়া হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top