খাদ্যে ভেজালকারীদের মৃত্যুদন্ড প্রদান অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তির বিধান সময়ের দাবীঃ

1555068345751blob.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

অতি মুনাফালোভী মানুষের লোলুপ অর্থলিপ্সার কারণে বিশৃঙ্খল সড়কে ফিটনেস বিহীন গাড়ী ও লাইসেন্স বিহীন অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ীর চাবি তুলে দিয়ে, অর্থের লোভে বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ ও অগ্নিনির্বাপণের সুযোগ সুবিধা না রেখে, পানির উৎস দখল, ভরাট করে অট্টালিকা বানানোর কারণে, অবৈধভাবে জনবসতিতে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের দোকান ও গুদাম বানিয়ে এবং খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে এক শ্রেণীর কতিপয় অসাধু, প্রতারক, দুর্বৃত্ত, খুনী ব্যবসায়ী দেশে রীতিমত মানুষ হত্যার কর্মযজ্ঞে লিপ্ত রয়েছে। মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়া তাঁদের মৌলিক চাহিদা ও অধিকার। অতীব দুঃখজনক এবং ন্যাক্কারজনক বিষয় হচ্ছে মানুষের বেঁচে থাকার অবিরাম সংগ্রামে ভেজাল, স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশে দুঃখজনকভাবে নিরাপদ খাদ্য ভান্ডার গড়ে তোলা অদ্যাবধি সম্ভব হয়নি যদিও দেশ অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা তরতাজা শাকসবজি, তরিতরকারি, মাছ ও ফলমূল খাচ্ছি। পাশাপাশি আমাদের পেটে যাচ্ছে এসব খাদ্যদ্রব্য তরতাজা রাখার বিষাক্ত ফরমালিন, কীটনাশক, ইউরিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ। বাদ যাচ্ছে না ছোট ছোট শিশুদের গুঁড়ো দুধও কেননা এখানেও মেশানো হচ্ছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ। সুস্বাদু আইসক্রিম, জুস, বিস্কুট, পাউরুটি, কেক সহ বিভিন্ন বেকারি সামগ্রী, মিষ্টি, দই, দুধ, বিভিন্ন ধরণের ও ফ্লেভারের চকলেট, ললিপপ ইত্যাদি টেক্সটাইলের কাপড়ের রং ও ফ্লেভার মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে হরেক রকমের আর বিভিন্ন স্বাদের মনোলোভা খাদ্যদ্রব্য। প্রকৃতপক্ষে আমরা খাদ্যের পরিবর্তে প্রতিক্ষণে গ্রহণ করছি ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোপিন, হাইড্রোজসহ ক্ষতিকর রং ও বিভিন্ন রাসায়নিক বিষের সংমিশ্রণ। আমরা প্রতিদিনই ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্টিং মিডিয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, এলাকায় ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে দেখি সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে। ভেজাল বিরোধী অভিযান চালানো হয় বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিভিন্ন খাবারের দোকান এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে। এতে খাদ্যে ভেজাল দেয়ার জন্য জরিমানা করা হয়, জরিমানা পরিশোধ করা হয় কিন্তু এসব দুর্বৃত্ত, খুনী, খাদ্য ব্যবসায়ীদেরকে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন থেকে কোন অবস্থাতেই বিরত করা যাচ্ছে না। কারণ এসব অমানুষদের কাছে জীবনের মূল্যের চেয়ে টাকার মূল্য অনেক বেশী। এরা জরিমানা দিতে রাজী কিন্তু মানুষ হত্যা বন্ধ করতে রাজী নয়। মানুষ হত্যা করে ওরা নিজেদের পকেট ভর্তি করার ঘৃণ্য, অপরাধ মূলক অপ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে নির্লিপ্তভাবে। তাঁদের মানবিক, নৈতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ যেন ভোঁতা হয়ে গেছে। সামাজিক অধঃপতন এবং অবক্ষয়ের শেষ সীমায় এসে ঠেকেছে এসব মানুষরূপী জালেম, মুনাফেক, নিষ্ঠুর, বর্বর খাদ্যে ভেজালকারী জঘণ্য এসব অপরাধীরা।

অতি মুনাফা লাভের জন্য মুড়িকে সাদা করার জন্য ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। পোড়া মুবিল দিয়ে চানাচুর ভাজা হয় মচমচে থাকার জন্য। কলা, পেপে, আনারস, আম পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হয়। রাসায়নিক পদার্থের ছোঁয়া লাগানো মাত্রই ম্যাজিকের মতো কাঁচা জাম কালো পাকা জামে পরিণত হয়ে যায়। আপেল, আমসহ বিভিন্ন ফলমূলে পচন রোধ করার পাশাপাশি দেখতে যেন তরতাজা লাগে সেজন্য ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। এটি আবার মাছকে তরতাজা রাখা এবং পচনরোধ করার জন্যও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মিষ্টি, দই ইত্যাদি বানানোর সিরাগুলো বদলানো হয় না। বরং একই সিরা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি হোটেল রেস্টুরেন্টে কড়াইয়ের তেলও বদলানো হয় না। পুরানো ও পোড়া তেল দিয়েই আবার শুরু নতুন দিনের কাজ। কাপড়ের রং দিয়ে, পুরানো মিষ্টির সিরা না বদলিয়ে বিভিম্ন রকমের রঙ্গিন মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করা হয়। বেকারি সহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ, বিপণন ও ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত সর্বস্তরেই রয়েছে ভেজালের ছড়াছড়ি। কোথাও মান নিয়ন্ত্রণ, মেয়াদ দেখভালের জন্য কেউ নেই। থাকলেও তাঁদের অনেকেই তাঁদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে পালন করছেন না বা অসৎ উপায়ে ব্যবসায়ীদেরকে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড় দিচ্ছেন। এদেরকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরী। কৃষিজাত শাকসবজি, তরিতরকারিতে ব্যবহার্য সার ও কীট নাশকের একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে যা মায়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে বাজারে আসার কথা নয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য বেশী মুনাফার জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা না করে তা বাজার চলে আসছে। আমরাও নতুন তরকারি মৌসুমের শুরু হওয়ার আগেই উচ্চমূল্যে কিনে মনের আনন্দে খাচ্ছি আর পাশাপাশি সার ও কীট নাশকের মতো রাসায়নিক পদার্থও পেটে ঢুকে পড়ছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানান রকমের রোগ ব্যাধিতে। আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই মানুষের জীবন রক্ষাকারী ঔষধেও ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ভেজাল বিরোধী অভিযানে। পাশাপাশি মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধও বিক্রি হচ্ছে অহরহ এবং অবাধে। তাছাড়া ডায়াগোনেস্টিক সেন্টারে মেয়াদ উত্তীর্ণ বিভিন্ন কেমিক্যাল এজেন্ট দিয়ে মানুষের রক্ত, মল, মূত্রসহ রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং এসব রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে রোগীর চিকিৎসা চলছে। এসব পরীক্ষার অনেক রিপোর্ট যে শতভাগ নির্ভুল নয় তা সহজেই বোধগম্য। তার ওপর আছে ভেজাল তথা ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তার। আর এসব কারণে মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশ মুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। আরেকটি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, মানুষ পয়সা দিয়ে ভেজাল আর অনিরাপদ এবং স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পানি পান করছে।

এক তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন জটিল এবং মরণ ব্যাধি রোগে প্রতি বছর ৪৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এবং এদের অনেকেই মৃত্যুমুখে পর্যন্ত পতিত হচ্ছে। আমাদের দেশে বেশীরভাগ মানুষকে পেটের পীড়ায় ভুগতে দেখা যায়। গ্যস্ট্রিক, গ্যস্ট্রিক আলসার, আমাশয়, ডায়রিয়া, পেট ফাঁপা, বমি বমি ভাব সহ বিভিন্ন ধরণের রোগে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে রয়েছে ভেজাল, অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ। দীর্ঘ মেয়াদে এসব রোগ মানুষের দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেয়, মানুষের হাড় ক্ষয়রোগ ও বাথ ব্যাথাশ বৃদ্ধি পায় এবং অনেকক্ষেত্রে মানুষের মূল্যবান এবং স্পর্শকাতর অংগ কিডনি, লিভার, গলব্লাডার আক্রান্ত বা বিকল হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ভেজাল তেল বা অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থের কারণে মানুষ হৃদরোগে এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। মোটা দাগে বলতে গেলে খাদ্য ব্যবসায়ীরা দেশের মানুষের নীরব ঘাতক। তাঁদের অর্থলিপ্সা, অতি মুনাফা করার অসৎ আকাঙ্ক্ষা, অল্প সময়ে ধনী হওয়ার লোভ লালসায় মত্ত হয়ে সচেতন ভাবে মানুষকে হত্যা করছে। এই জঘন্য, পাপী, জুলুমকারী ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন সংশোধন করে আমেরিকা এবং চীনের মতো মৃত্যুদন্ড অথবা ভারতে যাবজ্জীবন, পাকিস্তানে ২৫ বছরের কারাদন্ডের মতো কঠিন এবং কঠোর শাস্তির বিধান করার পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল করতে না পারার জন্য সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সমূহকে সজাগ, সচেতন এবং সার্বক্ষণিক নজরদারীতে থাকতে হবে। জীবন ধারণের জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ খাদ্য এবং পানীয় মানুষের জন্মগত অধিকার। নিরাপদ খাদ্য নাগরিক, সামাজিক, রাজনৈতিক অধিকারও বটে। অতএব নিরাপদ আর বিশুদ্ধ খাদ্য ও পানীয়ের ব্যাপারে রাষ্ট্রের কাউকেই ছাড় দেয়ার কোন এক্তিয়ার আছে বলে মনে হয়না। অতএব খাদ্যে ভেজালকারীদের মৃত্যুদন্ড প্রদান অথবা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তির বিধান সময়ের দাবী।

Top