শেকড়ের সন্ধানঃ পহেলা বৈশাখ

1555068345751blob.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

বাঙ্গালীর প্রাণের, আনন্দ উৎসবের, গভীর শেকড়ের সন্ধানের দিন পহেলা বৈশাখ। আমরা এই দিনটিতে খুঁজে পাই আমাদের নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য স্বকীয়তা, দেশজ, লোকজ সংস্কৃতি, বাঙ্গালী কৃষ্ঠি, সভ্যতা। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, রূপ, রস একদিনের জন্যে হলেও বিমূর্ত হয়ে উঠে আমাদের জীবনে। আমরা সারাটা বছর ভুলে যাই বাংগালীর অস্তিত্ব, সমৃদ্ধ কৃষ্টি, সভ্যতা আর সংস্কৃতির কথা। বাঙ্গালীর যাপিত জীবন যাত্রার কথা। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টানের একসাথে হাতে হাত ধরে পথ চলার কথা। নৌকা বাইচের কথা, গরুর লড়াইয়ের কথা, বিভিন্ন ধরণের মেলা ও উৎসবের কথা, ব্যবসায়ীদের হালখাতার কথা। নতুন করে শুরু হওয়া বছরের সাথে সাথে নতুন হিসেব শুরু হওয়ার কথা, পুঁথি পাঠের বৈঠকী আসরের কথা কথা, হারিয়ে যাওয়া যাত্রাপালার কথা, নাগরদোলায় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার কথা, বৈশাখী মেলায় বাহারি খেলনার সমাহারের কথা, শিশুদের আনন্দের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার কথা, নাড়ু, পিঠা, পুলি, চনা মনার ঠ্যাঙ্গের কথা, মুড়ি খই মোয়া মুড়ি খাওয়ার আনন্দের কথা।

পহেলা বৈশাখ মানে শিশুদের দুরান্তপনায় উন্মাতাল হয়ে উঠা একটা বিশেষ উৎসব। বৈশাখ যদিও কিছুটা তার নিজস্ব বৈশিষ্টতা হারিয়েছে হালে পান্তা ভাতের সাথে দামী ইলিশ খাওয়ার অশুভ অনভিপ্রেত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতার কারণে। আমরা ছোটকাল থেকেই দেখে আসছি কৃষকরা পান্তাভাতের সাথে পিঁয়াজ বা কাঁচা মরিচ দিয়ে ভাত খেতে। হালে দরিদ্র কৃষক শ্রমিক দুঃখী মানুষের সাথে ব্যাঙ্গ, বিদ্রূপ, তামাশা, উপহাস করার জন্য গরম ভাতে পানি ঢেলে দিয়ে দামী পান্তা-ইলিশ দিয়ে বৈশাখ উদযাপনের রীতিটা আর্থ সামাজিক এবং মানবিকভাবে বড়ই বেদনাদায়ক, অনৈতিক, মর্মপীড়াদায়ক একটি অশুভ প্রতিযোগিতা। গরীব দুঃখী অসহায় মানুষকে ছোট করার একটি জঘণ্য হীন প্রয়াস যার সাথে বাঙ্গালীপনার আর পহেলা বৈশাখের আদৌ কোন সম্পর্ক নেই। ইলিশ প্রজননের মৌসুমে এ ধরণের কর্মকাণ্ড দেশের জন্য মৎস্য সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি আত্মঘাতী বিষয়।

পহেলা বৈশাখে আমাদের খাওয়া দাওয়া, পোষাক পরিচ্ছদ, রূপ লাবণ্যে আমরা বাঙ্গালী হওয়ার যে অকৃত্রিম চেষ্টা বা প্রয়াস চালাই সেটাকে লালন পালন করে সারা বছর ধরে রাখার জন্য আমাদেরকে মনেপ্রাণে, আবেগ অনুভূতি আর মন মানসিকতা দিয়ে ধরে রাখার জন্য সবার আপ্রাণ চেষ্টা করা উচিৎ। আমরা যতই আমাদের আপন, নিজস্ব কৃষ্টি সভ্যতা সংস্কৃতিকে আকড়ে ধরে রাখবো ততোই আমাদের দেশে অপসংস্কৃতির কুপ্রভাব আমাদের জীবনে পড়বে না। আমাদের শিল্প সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অনুশাসন আমাদেকে নানান রকমের হিংসাত্মক, নীতি বিবর্জিত কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখবে। দেশে অবাধ মেলামেশার মাধ্যমে তথাকথিত নারী স্বাধীনতা বা প্রগতিশীলতার নামে ফ্রিমিক্সিং, নেশা বা মাদকাসক্তি কমে যাবে। কমে যাবে ধর্ষণ খুন খারাবিও। দেশকে, মানুষকে ভালোবাসার মূলমন্ত্র নিহিত রয়েছে আমাদের মূল সাংস্কৃতিক চেতনা, দেশজ কৃষ্টি ও সভ্যতা এবং ধর্মীয় আচার আচরণের মধ্যেই । এসবের সুন্দর সুস্থ স্বাভাবিক চর্চার ফলে আমাদের ব্যবহারিক জীবনে তার প্রভাব এবং প্রতিফলন ঘটাতে হবে বাঙ্গালীর মনের বিশালতা আর আন্তরিকতা দিয়ে। যেখানে নেই সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় উন্মাদনা বরং আছে প্রতিটি ধর্মের সুন্দর সহাবস্থান। সমাজে সকল ধরণের বৈষম্য, সকল ধরণের নারী নির্যাতন, সন্ত্রাস, ধর্ষণ ইত্যাদি মুক্ত করতে হলে আমাদেরকে আমাদের শেকড়ের সেই মূল মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে একে অপরের সাহায্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতেই হবে। বাংগালিত্বকে অস্বীকার করে আমরা যদি বিজাতীয় অপসংস্কৃতির মরীচিকার পেছনে দৌড়ায় আমাদের বার বার পথভ্রষ্ট, পদচ্যুত, পথহারা হতে হবে বার বার। যা আমাদেরকে অধঃপতনের দিকে নিয়া যাবে। হবে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। আমরা সেই অশুভ পঙ্কিলতায়, অপসংস্কৃতিতে শুধু হাবুডুবু খেতেই থাকবো।

বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতি, সাহিত্য, নাটক, কবিতা, গান অনেক সমৃদ্ধশালী। তারপরেও আমাদের জানার জন্য, মেধা, বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান অর্জনের যতটুকু দরকার আমরা শুধু সেটুকুই সনতুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করবো। আগ্রাসী আকাশ সংস্কৃতি আমাদের দেশের অগ্রযাত্রার জন্য বিরাট হুমকী। যা যুব সমাজকে বেপথু করে তুলছে। পহেলা বৈশাখে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার হোক দেশীয় শিল্প সংস্কৃতিকে আন্তরিকভাবে রক্ষা করবো এবং বিদেশী অপসংস্কৃতিকে ঘৃণাভরে রুখে দাঁড়াবো।

Top