দেশীয় সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে পহেলা বৈশাখকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

IMG_20190413_181705.jpg

নিগার সুলতানা সুপ্তি :

নববর্ষ উদযাপনের রীতি কোনো জাতির অতীত ঐতিহ্যকে ধারণ করে। ধারণ করে জাতিগতভাবে কতো সমৃদ্ধ তার উন্মেষ কিংবা বিকাশের ধারা। কালে কালে এই উদযাপন রং পাল্টায়, বর্ণ পাল্টায়, বৈচিত্র্যময় হয়- আগ্রাসনে অবরুদ্ধ হয়, তবু তার ভেতরে জেগে থাকে, নতুন করে জেগে ওঠার প্রেরণা। এই জেগে ওঠার প্রেরণা মানুষকে উজ্জীবিত করে জাতীয়তাবোধে, উদ্দিপীত করে জাতিসত্তা বিধ্বংসীকারী অপশক্তি রুখতে। যেমন বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের জাতিসত্তা যখনই আক্রান্ত হয়েছে অপশক্তির আগ্রাসনে কিংবা সংকট উপস্থিত হয়েছে আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে তখন এই নববর্ষ উদযাপন আমাদের পথ দেখিয়েছে ধ্রুব নক্ষত্রসম। শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে তাই বারবার ফিরতে হয়েছে এই ‘নববর্ষ` উদযাপনের কাছে।

দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে নববর্ষ উদযাপনের বিভিন্ন রীতি রয়েছে। সে উদযাপনের প্রকৃতি, রীতি আলাদা বটে তবে দিনটিকে ঘিরে পুরনো জঞ্জাল ভুলে নতুন প্রত্যাশাকে স্বাগত জানানোর স্পৃহাটা চিরন্তন। এই বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। কৃষিভিত্তিক সমাজের সাথে এর যোগসূত্র। প্রাচীন কৃষি সমাজে শীতের পাতা ঝরা দিন শেষে নতুন করে ধরনীর জেগে ওঠার সাথে এর সম্পর্ক ছিল। সাড়ে তিনশ বছরের আগে বিখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে দিনটিকে এদেশের জনগণের ‘নওরোজ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

একদা তো গ্রামবাংলার হালখাতা, মেলা, চড়ক পূজা, নৃত্য এ সবই ছিল পহেলা বৈশাখের প্রাণ। আজ যে তা শহুরে আনন্দ অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে- তার সবটুকুই কি মেকি? মোটেই তা বলতে রাজি নই আমি। যদিও এর সংগে গ্রামীণ সংস্কৃতির সংযোগ কম। কিন্তু এই শহুরে আয়োজনটাকেই পুঁজি করার যে অপচেষ্টা বেনিয়াদের, তাতে যদি গা ভাসাই আমরা তবে পহেলা বৈশাখ তার আসল চেতনা হারাতে বাধ্য। এখন খুব করে প্রয়োজন গ্রামীণ বৃহত্তর জনজীবনের সাথে, শ্রমজীবী মানুষের স্বতঃর্স্ফূত আয়োজনগুলোর সাথে এর একটা যোগসূত্র তৈরি করা। খুব করে দরকার। সচেতনভাবে দরকার, যদি তা সম্ভব হয় তবেই পহেলা বৈশাখ ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে অপরাজেয় মহিমায় উদ্ভাসিত করে তুলতে পারবে আমাদের। নইলে একদিকে বেনিয়াদের দল তাদের উগ্র ব্যবসায়ী হাত, অন্যদিকে মৌলবাদের রক্তচক্ষু- এ দুয়ের টানাপোড়েনে অচিরেই পথ থাকবে তা? এ হতে দেয়া যায় না। পহেলা বৈশাখকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদেরই প্রয়োজনে।

আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে পহেলা জানুয়ারি অনেক বেশি প্রভাবশালী পহেলা বৈশাখের তুলনায়। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পহেলা জানুয়ারির পার্থক্যটা একেবারে মৌলিক। পহেলা বৈশাখ আমাদের নিজস্ব, পহেলা জানুয়ারি বিদেশী। বৈশাখ কেবল যে বাঙালির ঋতু তা নয়, এটি উপমহাদেশের এবং উপমহাদেশের বাইরের অনেক দেশেরই ঋতু বটে। বৈশাখী উৎসব অন্যরাও করে থাকেন। বৈশাখ তা আমাদেরকে কেবল নিজস্ব করে না, প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুক্ত করে। আমরা নিজেদের স্বতন্ত্রকে এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে সংযোগকে সংকুচিত করে ফেলি পহেলা জানুয়ারির কাছে আত্মসমর্পণ করে।

বৈশাখকে কেউ কেউ হয়তো নতুনভাবে পায়, কিন্তু অধিকাংশই দেখে তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না।
পরিবর্তন অবশ্য আসে কিন্তু যেমনটা আশা করা যায় তেমনটা ঘটে না। সেই পরিবর্তনকেই আমরা পরিবর্তন বলি, যেটা আমাদের পছন্দের। কিন্তু সেই পছন্দের পরিবর্তনটা পাই না। বরং এ আশংকা হয় সামনের বছর বুঝি গত বছরের চেয়ে খারাপ হবে। পহেলা বৈশাখ সব শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য হোক এটাই কামনা প্রত্যেকের। এক শ্রেণির মানুষ বৈশাখের কেনাকাটায় মত্ত আরেক শ্রেণির মানুষ নিজের জীবিকার সন্ধানে ব্যাকুল। এটাই যদি হয় আমাদের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের চিত্র তাহলে সেটা তো কখনো সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। তাই দেশীয় সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের বিত্তবানদের। রোজার মাসে যেমন যাকাতের ব্যবস্থা আছে তেমনি যদি কোনো বিশেষ ব্যবস্থা থাকে তাহলে এ বৈষম্য অনেকাংশে কমে যাবে বলে আশা করা যায়। আবার সরকারী উদ্যোগ,বেসরকারি এনজিও,বিভিন্ন সংস্থার সফল প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারব আমদের দেশীয় ঐহিত্যকে।

———–
নিগার সুলতানা সুপ্তি
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
রোকেয়া হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top