জন্মশত বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলী মরহুম এডভোকেট এ কে এম আমিনুল ইসলাম

1554658644810_Zia-Habib-Pic.jpg

জিয়া হাবীব আহ্‌সান, এডভোকেট

চট্টগ্রামের সাবেক জেলা ও পার্বত্য জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ মরহুম আবুল কাসেম মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের জন্মশত বার্ষিকী পালিত হতে যাচ্ছে । সিনিয়রের স্নেহধন্য একজন ভক্ত হিসেবে আমার এ লেখার অবতারণা । এডভোকেট এ কে এম আমিনুল ইসলাম জন্মেছিলেন মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া এলাকার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১২ই সেপ্টেম্বর ১৯১৯ সালে । পিতা মরহুম মোঃ এছহাকুর রহমান তৎকালীন সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজ রাজশাহীর আইনের প্রভাষক এবং মিরসরাই থানার প্রথম দারগা । মাতা মরহুমা রোকেয়া বেগম। মরহুম আমিনুল ইসলামের মামা ছিলেন সুখ্যাত আইনবিদ মিরসরাইয়ের প্রথম আইনজীবী মরহুম এডভোকেট বদিউর রহমান । মামা বদিউল রহমানের ৩য় কন্যা রিজিয়া বেগম এর সাথে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। মরহুম আমিনুল ইসলাম পরিবারের প্রথম সন্তান । একমাত্র বোন ছিলেন বেগম নূর জাহান । জনাব এ.কে.এম আমিনুল ইসলাম ১৯৩৬ ইংরেজী সনে চট্টগ্রাম জেলার ঐতিহ্যবাহী আবু তোরাব হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করার পর ১৯৩৮ ইং চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ হতে আই.এস.সি মেধা তালিকায় স্থান পেয়ে বৃত্তি পান । ১৯৪০ ইং সনে রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিষ্টিংশন সহ স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন । তৎপর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সাথে বি.এল ডিগ্রী প্রাপ্ত হন । ২য় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ১৯৪৬ ইং সালে চট্টগ্রাম জজ কোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন এবং অল্প দিনের মধ্যে সুনাম অর্জন করেন । ১৯৫৯ ইং সালে মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি সাহেবের জুনিয়র হিসাবে চট্টগ্রামের বিশেষ জজ আদালতে একটি চাঞ্চল্যকর ইলেকট্রিক ক্যাবল আত্মসাতের মামলায় তাঁকে সহায়তা করেন । ১৯৬১ সালে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জিলার পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত হয়ে সুদীর্ঘ ১৮ বছর যাবৎ উক্ত পদে বহাল থেকে চট্টগ্রামের বহু উল্লেখযোগ্য মামলায় দেশের খ্যাতিমান আইনজীবীদের বিপরীতে মামলা পরিচালনা করেন । ১৯৫১-১৯৬১ খৈয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-এর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে গ্রামোন্নয়নে ভুমিকা রাখেন । তিনি ছিলেন তদানীন্তন চট্টগ্রাম মুসলিম চেম্বার অব কমার্স এর সেক্রেটারি । তিনি আমৃত্যু চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সিনিয়র এডভোকেট হিসেবে প্র্যাকটিসে নিয়োজিত ছিলেন । একজন ফৌজদারী বিশেষজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে তাঁর নাম ডাক ছিল দেশব্যাপী । প্রসিকিউশন পক্ষে ও ডিফেন্স ল’ইয়ার হিসেবে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর সমধিক দক্ষতা ছিল। একটি ডাকাতি মামলার সাক্ষীর জেরা জবানবন্দী শিখতে গিয়ে আমি দেখেছি তিনি মামলার কত গভীরে প্রবেশ করতেন । তদানীন্তন সময়ে তিনি একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ফৌজদারি বিশেষজ্ঞদের অন্যতম আইনজীবী ছিলেন । বাংলা ভাষায় আইন চর্চায় তাঁর অবদান অতুলনীয়। তিনি ১৯৯১ সালে বাংলা ভাষায় আইন চর্চার সুবিধার্থে বাংলায় ফৌজদারী কার্যবিধি রচনা করেন । তদানীন্তন আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জ্জা গোলাম হাফিজ বইটির মুখবন্ধে লেখেন “তিরিশের দশকে আমি এবং জনাব এ কে এম আমিনুল ইসলাম একই হোস্টেলে থেকে রাজশাহী সরকারী কলেজে লেখাপড়া করেছি । জনাব ইসলাম একজন সুসাহিত্যিক ও অংকবিদ হিসাবে খ্যাতি অর্জন করে ডিষ্ট্রিংশন নিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদালয়ের স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন । পরবর্তীকালে আইনজীবী হিসেবে তিনি জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন । এই আইনগ্রন্থ তাঁর মহতী প্রয়াসের সার্থক ফসল । ইহা বিচারক ও আইনজীবীদের নিকট সমাদৃত হবে বলে আমি আশা করি । প্রণীত আইনের বাকী ধারাগুলোর লেখা শেষ করার জন্য আল্লাহ তাঁকে দীর্ঘজীবী করুন এই কামনা করি ।” মরহুম আমিনুল ইসলাম স্যার ছিলেন নারী শিক্ষার অগ্রদূত ও একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজ সংস্কারক । তৎকালীন ৬০ দশকের অবহেলিত নারীদের শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান পথ প্রদর্শকের মতো। তিনি নারীদের স্বশিক্ষায় গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে নিজ এলাকা মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া গ্রামের নারী শিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন নিয়ে সদা নিবেদিত প্রাণ ছিলেন । কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের গন্ডি পেরিয়ে নারী সমাজকে শিক্ষিত করার মানসে নিজ এলাকায় ৬০ দশকের শুরুতে তিনি নিজের জমিতে মিরসরাই থানার একমাত্র বালিকা বিদ্যালয় ” আবুল কাসেম উচ্চ বিদ্যালয় ” প্রতিষ্ঠা করে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রয়াসে সদা সচেষ্ট ছিলেন । নিজের প্রতিটি সন্তানদেরও তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন । বিশিষ্ট সাহিত্যিক জনাব ওহিদুল আলম তাঁর লিখিত ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ বইতে (পৃষ্ঠা ২১২) জনাব এডভোকেট এ.কে.এম আমিনুল ইসলাম সম্পর্কে নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেন, “আবুল কাসেম মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম (জন্ম ১৯১৯) মিরসরাই অঞ্চলের একজন উল্লেখযোগ্য সমাজকর্মী। তিনি ১৯৫১-৬১ সালে স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, জিলা পরিষদের সদস্য, ১৯৪৮ সালে জিলা মুসলিম লীগের ভাইস চেয়ারম্যান, তদানিন্তন মুসলিম চেম্বার অব কমার্সের সেক্রেটারী ছিলেন । ১৯৬১-৭৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর ছিলেন । ১৯৬৪ সালে সম্পূর্ণ নিজ খরচায় নিজ জমির উপর বালিকা স্কুলের জন্য গৃহ নির্মাণ করে ‘আবুল কাসেম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন । নিজ অঞ্চলে নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য প্রথমতঃ নিজের জীপ, পরে নিজের খরচায় মাইক্রোবাস কিনে দিয়েছিলেন। নিজ জন্মভূমি পোলমোগরা গ্রামে দুইটি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে পরিচালনা করেছেন । তিনি স্থানীয় নিজামপুর কলেজেরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা । পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি প্রতি সপ্তাহে নিজ গ্রামে যেতেন । বন্ধের দিন প্রচুর মানুষ তাঁর অপেক্ষায় থাকতেন এবং ৫/১০টি শালিশ মিমাংসা সপ্তাহে নিস্পত্তি করতেন । বর্তমান সময়ে পেশাজীবীদের জন্য এটা একটি শিক্ষণীয় বিষয় । ছাত্র জীবনেও একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে তাঁর পরিচিত ছিলেন । ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে আবুল কাসেম সাহেব স্কুলের সেক্রেটারী ছিলেন । তিনি স্কুলের মাইক্রোবাস দিয়ে মুক্তি বাহিনীকে সাহায্য করেন ।” ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে । তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষা ছাড়া নারীরা সে সমাজের বৃত্ত ভেঙে নিজস্ব চিন্তা ও মননে বেরিয়ে আসতে পারবে না । তাঁর স্থাপিত আবুল কাসেম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টিকে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই থানার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় বলে দাবী করা হয় । বরেণ্য কবি ওহীদুল আলম রচিত” চট্টগ্রামের ইতিহাস” গ্রন্থটিতে আরো লেখা হয়েছে- নিজ গ্রামে নারী শিক্ষা বিস্তারে আবুল কাসেম মোঃ আমিনুল ইসলামের চেষ্টার অন্ত ছিলনা । অবহেলিত নারীদের জন্য একটা স্বতন্ত্র স্কুলের জন্য, ছাত্রীদের জন্য তিনি ঘুরেছেন গ্রামের পর গ্রাম। তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠালগ্নে ডি এস পি হাফেজ আহমদকে স্কুল পরিচালনার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন। মরহুম আমিনুল ইসলাম স্যারের স্নেহধন্য জুনিয়র শ্রদ্ধেয় এডভোকেট মনজুর আহমদ আনছারী ভাইয়ের সাথে স্যারের আগ্রাবাদ পাঠানটুলিস্থ আমান মঞ্জিলের বাসার চেম্বারে আমার একাধিকবার যাওয়ার সুযোগ হয় । তিনি মামলাকে নিয়ে গবেষণা করতেন । একটা মামলায় যখন মনোযোগ দিতেন তখন অন্য কোন দিকে আর খেয়াল দিতেন না । তাঁর স্নেহাস্পদ জুনিয়রদের মধ্যে সাবেক বার সভাপতি ও সাবেক পিপি মরহুম এস এইচ ফারুকী, এডভোকেট মরহুম মোহাম্মদ আলী, স্বর্গীয় এডভোকেট প্রদীপ কুমার ভট্টাচার্য্য, এডভোকেট সাধনময় ভট্টাচার্য্য, এডভোকেট দীপু শংকর নন্দী, এডভোকেট প্রণব কান্তি পাল প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য । তাঁর ১ম পুত্র মাহফুজুর রহমানও একজন বিশিষ্ট আইনবিদ । তিনি সরকারী সিটি কলেজের সাবেক অধ্যাপক ছিলেন ও প্রসিদ্ধ বিভিন্ন ব্যাংকের লিগ্যাল এডভাইজার হন । তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির স্বনামধন্য শিল্পপতি মির্জাবুর- এর কনিষ্ট মেয়ের জামাই । মরহুমের ২য় পুত্র নজিবুর রহমান একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও তিনি কাজির দেউরীর কাজী বাড়ীর মরহুম কাজী আমিনুল হকের ছোট মেয়ের জামাই । মরহুম ইসলাম সাহেবের ১ম কন্যা এডভোকেট শাহানা বেগম, বি.এ । তাঁর স্বামী মরহুম এডভোকেট রবিউল হোসেন অত্যন্ত কৃতি আইনজ্ঞ ছিলেন । তাঁর ২য় কন্যা বাংলদেশ ব্যাংকের জি এম মিসেস রোকসানা বেগম-এর স্বামী মোঃ শফিউল্লাহ্‌ সিলেটের হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসরে যান । এডভোকেট আমিনুল ইসলামের ৩য় কন্যা মরজিনা বেগম, তাঁর স্বামী সাবেক বিচারপতি মরহুম কুদ্দুস চৌধুরী’র পুত্র ডাঃ শওকত ওসমান । স্যারের ৪র্থ কন্যা গুলশানা আনাম (মাস্টার্স) ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজের ১৯৮১-৮২ ব্যাচে আমাদের সহপাঠী ছিলেন । তাঁর স্বামী আফজাল জুট মিলস এর মালিক শিল্পপতি আফজালুর রহমানের ২য় পুত্র খাইরুল আনাম । ৫ম কন্যা ছিলেন মরহুমা তাহমিনা বেগম । ছোট পুত্র নকিবুল রহমান পাঠানটুলির আমান মঞ্জিলে বসবাস করেন । ৫ কন্যা ৩ পুত্র প্রত্যেকেই স্ব-স্ব যোগ্যতায় মহীয়ান। মরহুম আমিনুল ইসলাম স্যারের একমাত্র বোন বেগম নূর জাহানের পুত্র বিশিষ্ট কবি ও গ্রন্থপ্রণেতা আরিফ চৌধুরী আমার ঘনিষ্ট বন্ধু । তাঁর নিকট তার মামার একটি স্ব-হস্ত লিখিত আত্মজীবনী বা ডাইরী রয়েছে । যেখানে তাঁর পূর্ববর্তী পাঁচ পুরুষের বিবরণ সহ তাঁর নানামূখী কর্মযজ্ঞের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে । তাঁর মেধা ও যোগ্যতা সম্পর্কে বিজ্ঞ বিচারক ও বিশিষ্টজনদের নানা মন্তব্য এবং গুণগান রয়েছে । এডভোকেট এ.কে.এম আমিনুল ইসলাম ১৯৯৭ সালের ১৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পাঠানটুলিস্থ নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন । নারী শিক্ষার অগ্রদূত এই বহুমুখী প্রতিভাধর আলোকিত মণীষী মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই।  তার মনন চিন্তা ও স্বপ্নের আবুল কাসেম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি আলোকবর্তিকা হয়ে আজও মিরসরাই এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত । এ বছর বরেণ্য মানুষটির জন্মশতবর্ষ । জন্মশতবর্ষে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই আমি নিজে ও আমার আইনজীবী পরিবারের পক্ষ থেকে, তাঁর বিদেহী আত্মারও মাগফেরাত কামনা করছি । প্রভু তাকে তাঁর ভালো কাজের বিনিময়ে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন । আমীন।

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সু-শাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

Top