রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির কোথায় হবে তা বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপারঃ

IMG_20190319_210050.jpg

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

‘উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অদূরে অবস্থিত নৌকার মাঠের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্প ইনচার্জসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে রোহিঙ্গারা তাঁদের উপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ ৭/৮ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুড়লে রোহিঙ্গারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়’ {সূত্রঃ সুপ্রভাত, ১৮ মার্চ’১৯}। রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংঘর্ষ, খুনোখুনি নতুন কোন বিষয় নয়। তাঁরা এদেশে আশ্রয় নেয়ার পর থেকেই নানান রকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। তাঁরা নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি এবং স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে রোহিঙ্গা সহ স্থানীয় মানুষও খুন হয়েছে তাঁদের হাতে। তাঁরা আমাদের দেশের আইন কানুন মানতে চায়না, তোয়াক্কা করতে চায় না বলেও আমাদের পুলিশের অভিযোগ। তাঁরা এদেশে সুখে শান্তিতে বসবাস করলেও নিজেরাই সব সময় নিজেদের মধ্যে বিবাদ বিস্মবাদে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ছিনতাই, ডাকাতি, গুম, অপহরণ সহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে বলেও জানা যায়। তাঁদের কারণে স্থানীয় অধিবাসীরা নানা সঙ্কটের মধ্যে দিন যাপন করছে। এদের কাজের অভাব হচ্ছে, নিত্যব্যবহার্য পণ্য দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সুপেয় এবং ব্যবহার্য পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানির অভাব এবং সঙ্কট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় নিম্নবিত্তদের জ্বালানি কাঠের অভাব দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। রোহিঙ্গারা বিভিন্ন ত্রাণ সামগ্রী বিক্রি করার ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনছে। মোটা দাগে বলতে গেলে স্থানীয় অধিবাসীরা বিরাট সংখ্যক রোহিঙ্গাদের চাপের কাছে যেন সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দাতা ও সেবা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন ধরণের, অনেকক্ষেত্রে একাধিক দাতা সংস্থা প্রয়োজনের তুলনায় একই ধরণের অতিরিক্ত ত্রাণ সামগ্রী দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন কেনাকাটার জন্য তাঁদের নগদ টাকার প্রয়োজনে তাঁরা ত্রাণ সামগ্রী বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে । অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কেউই তাঁদের রান্নার জন্য জ্বালানির ব্যবস্থা করছে না। ফলশ্রুতিতে প্রতি মাসে এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ৬ হাজার ৮০০ টন জ্বালানি কাঠের প্রয়োজন হয় বলে জানা যায়। এরা এসব জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছে বাংলাদেশের বনাঞ্চল ধ্বংস করে। “রোহিঙ্গাদের বসতির কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকার বন ধ্বংস হয়ে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে সেখানকার পরিবেশ, বনভূমি ও জীব বৈচিত্র্য। ধ্বংস হয়েছে ৬ হাজার ১৬৩ হাজার একর বনও। এ ছাড়া বসতি স্থাপন করতে গিয়ে এশিয়ান হাতির আবাসস্থল ও বিচরণ ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে উখিয়া ও টেকনাফের বনাঞ্চল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বন বিভাগ”{সূত্রঃ প্র/ আলো, ২১ মার্চ’১৯}।

কক্সবাজারের শিবিরে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা গাদাগাদি করে আছে। ফলে সেখান থেকে ভাসানচরে তাঁদেরকে স্থানান্তরে আপত্তি জানিয়ে আসছিলো জাতি সংঘ। এদিকে তাঁরা আবার জানিয়েছে যে, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে তাঁদের আপত্তি নেই তবে তাঁদেরকে জোর করে পাঠানো যাবেনা। রোহিঙ্গারা যদি স্বেচ্ছায় যেতে চাইলে যাবে অন্যথায় নয়। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এ কে এম মোজাম্মেল হক গত ১৩ মার্চ’১৯ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক এক বৈঠকের পর জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কোথায় হবে সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়। বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে তাঁদেরকে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও খাদ্য দেয়া, মানবিক আচরণ, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করা। এখানে জাতি সংঘের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তাঁদের দেখার বিষয় মানবিক দিকগুলোর কোন ঘাটতি আছে কিনা। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, এ পর্যন্ত দাতা সংস্থাগুলোর কর্তাদের হোটেল বিল বাবদ হয়েছে দেড়শ কোটি টাকা সে হিসেবে রোহিঙ্গাদের পেছনে ২৫ শতাংশও খরচ করা হয়না বরং কর্মকর্তাদের তদারকিতেই ৭৫ ভাগের বেশী অর্থ তাঁরা ব্যয় করছে যা খুব দুঃখজনক। এখানে অনেক এনজিও কাজ করছে তবে তাঁদের কিছু সংখ্যক এনজিও অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে যা আমাদের গোয়েন্দা রিপোর্টেও উঠে এসেছে বলে মন্ত্রী জানান। মন্ত্রী আরও বলেন, এনজিওদের অপতৎপরতা এবং কর্মকর্তাদের দেখভালের জন্যে ৭৫ ভাগ খরচের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য গোয়েন্দা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভাসানচরের আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গাদের রাখার জন্য সকল প্রস্তুতি প্রায় সমাপ্ত করা হয়েছে বলে জানিয়ে মন্ত্রী এবং আগামী ১৫ এপ্রিলের আগে পড়ে যে কোন সময়ে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের কাজ শুরু হতে পারে। রোহিঙ্গাদের অতি দ্রুত ভাসানচরে স্থানান্তরের ব্যাপারে সরকারের “সর্বোচ্চ চেষ্টা” রয়েছে বলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী সাংবাদিকদের অবহিত করেন।

দেশবাসী জানেনা এসব বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বোঝা বাংলাদেশকে আর কতকাল বহন করতে হবে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের মারমুখী আচরণ, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, ছিনতাই, ডাকাতি, গুম, অপহরণ সহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশের জনগণের জন্য এক ভীষণ বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ এবং ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে বন বিভাগের এক প্রতিবেদনে, “রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগ নিয়ন্ত্রণাধীন উখিয়া ও টেকনাফে ২ হাজার ২৭ একর সৃজিত বন (প্রধানত সামাজিক বনায়ন) এবং ৪ হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ৮ লাখ ৭২ হাজার ৮৮০ জন রোহিঙ্গা বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ২ লাখ ১২ হাজার ৬০৭ টি গোসলখানা, ত্রাণ সংরক্ষণের জন্য ২০ টি অস্থায়ী গুদাম, ১৩ কিলোমিটার বিদ্যুতের লাইন, ৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ এবং ২০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক একটি অবকাঠামো তৈরি করবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বনভূমি ও বনজ সম্পদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে গেলেও জায়গা জবরদখল হয়ে যেতে পারে এবং স্থাপনাগুলো অপসারণ করে বনায়ন করা কঠিন হবে”{ সুত্রঃ প্র/ আলো, ২১ মার্চ’১৯}। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বকি উষ্ণতা বৃদ্ধি সম্পর্কে এক তথ্য থেকে জানা যায়, “বাংলাদেশে একাধারে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সমস্যা, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, বন্যা ইত্যাদি সবগুলো দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক অনেক বেশি। মালদ্বীপ, টুভ্যালু, টোবাগো -এদের সবার ক্ষেত্রেই এই সবগুলো মানদন্ডই কার্যকর নয়। তাছাড়া মালদ্বীপের মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের অনেক জেলার জনসংখ্যার চেয়েও কম। তাই এই চারটি মানদন্ডেই বাংলাদেশ, জলবায়ু পরিবর্তনেক্ষতিগ্রস্থদের তালিকায় শীর্ষে”। এমতাবস্থায়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে, মানবিকতা, সহানুভূতি, মহানুভবতা, উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করার পাশাপাশি সমসাময়িক সময়ে একমাত্র বাংলাদেশই বিরাট সংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় দিয়ে সারা বিশ্বে মর্যাদা, সুনাম, খ্যাতি অর্জন করলেও বাংলাদেশ এখন নিজেই মানবিক, সামাজিক, নৈতিক, আর্থ সামাজিক, প্রাকৃতিক, পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ, ভয়ংকর সঙ্কটের মুখোমুখি। বাংলাদেশের উন্নয়নের অব্যাহত অগ্রযাত্রা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপে পিষ্ট, ভুলন্ঠিত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা করছেন রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানী সহ অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। দেশ ও জাতির গভীর প্রত্যাশা জাতিসংঘ বাংলাদেশকে মহা বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদেরকে তাঁদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দদেরকে নিয়ে যথাশীঘ্র সম্ভব বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অন্যথায় বাংলাদেশের সব অর্জন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যেতে পারে। মায়ানমারে ফেরত যাওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকার। মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার কোন শাসক গোষ্ঠি কেড়ে নিতে পারে না। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে মায়ানমারে মানবতার মৃত্যু হয়েছে। মানুষ তাঁদের জন্মগত অধিকার হারিয়েছে। কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এমন মানবিক, নৈতিক বিপর্যয় আশা করে না। মায়ানমারের শাসক গোষ্ঠীর মনে মানবতাবোধ, দয়া, মায়া, ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত হোক এই প্রত্যাশাই করি।

Top