চট্টগ্রামের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা এবং প্রকল্প ব্যয় ও কাজের মন্থর গতি প্রসঙ্গে ঃ

1550740050470blob.png


মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।

চট্টগ্রামবাসীর জন্য একটি সুখের বিষয় হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের প্রথম জোনের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। এর ফলে কর্ণফুলী নদী দৃশ্যমান হচ্ছে, ১০ কিলোমিটার নদী দখলমুক্ত হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৫টি উপ খাল। প্রথম পর্যায়ের উচ্ছেদের দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের দাবী এর ফলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কমে আসবে। কেননা এসব স্থাপনা উচ্ছেদের কারণে নগরের বর্ষার পানি নদীতে আসতে আর বাধাগ্রস্থ হবেনা। পাশাপাশি চট্টগ্রামবাসীর জন্য আরেকটি দুঃখের বিষয় হচ্ছে, চট্টগ্রামের মেগা প্রকল্প ২০২০ সালের জুন মাস নাগাদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বিভিন্ন সমন্বয়হীনতা এবং কর্মপরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় কারণে আনুমানিক আরো দুই বছর মেয়াদ এবং প্রকল্প খরচও বৃদ্ধি পাবে। “এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ওয়াসার ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা সঠিকভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছিল। কারগরি কমিটি, সিটি কর্পোরেশন ও বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের ঘাটতি তুলে ধরে বিভিন্ন সুপারিশ করেছিলেন। প্রথমে আমলে না নিলেও অনুমোদনের দেড় বছর পর প্রকল্প সংশোধন করছে সিডিএ”, {সূত্রঃ প্র/ আলো, ২০ ফেব্রুয়ারি’১৯}। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সিডিএ চট্টগ্রামে উড়াল সেতু নির্মাণের সময় যথাযথ কর্মপরিকল্পনা না নিয়ে নিজেদের মর্জিমাফিক কাজ শুরু করে দেয়। পরবর্তীতে নির্মাণের পর দেখা যায় এর সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে না। কেননা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বা মোড়ে উড়াল সেতুতে উঠানামার কোন ব্যবস্থা নেই। উড়াল সেতুর বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পরে আবার র‍্যাম্প নামানো হয় আবার কোথাও বা লুপ সংযুক্ত হয় করা হয়। যার ফলে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবহারও দেরীতে শুরু হয়। এটা হচ্ছে সিডিএ’র নিজস্ব স্টাইলের কর্মকাণ্ড যা সবাই আগে বুঝে কিন্তু সেটি সিডিএ বুঝে সবার পরে। এ যেন গাধার ঘোলা করে জল পানের মতো অবস্থা।
মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার দেড় বছর পর দেখা যায়, ওয়াসার মহাপরিকল্পনা ও কারিগরি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী জলাবদ্ধতার সুফল পেতে ৩৬টি খালের পরিবর্তে ৫৭টি খাল খনন করতে হবে। পাশাপাশি জোয়ারের পানিতে নগরীর নিম্নাঞ্চল যাতে তলিয়ে যেতে না পারে সেজন্য ৪০টি খালের মুখে জোয়ার প্রতিরোধক ফটক নির্মাণ, পরিষ্কার এবং মেরামতের আওতায় আনতে হবে ৫০০ মিটার নালা, এবং বিভিন্ন সড়কের পাশে নতুন ১০০ মিটার নালা নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব পরিকল্পনা আগে অন্তর্ভুক্ত করেনি সিডিএ। গত বছর তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খোন্দকার মোশারফের নির্দেশে চসিক, সিডিএ ও ওয়াসার প্রকৌশল বিভাগের দুইটি বৈঠকে ওয়াসার মহাপরিকল্পনা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে জানানো হয়। তখন এসব বিষয় যদি সমন্বয় করা হতো তাহলে কাজ শুরু করার দেড় বছর পর আবার এসব পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না।এতে প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছে পাশাপাশি প্রকল্প ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে অনেক যা পূরনাংগ পরিকল্পনা প্রকল্প তৈরির পর জানা যাবে। তাছাড়া গত ৭ আগষ্ট’১৮ তারিখে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকল্পের বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ দেয় যার মধ্যে নতুন খাল খনন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জলাধার নির্মাণ ছিল অন্যতম।

সিডিএ’র প্রকল্প পরিচালকের বরাতে জানা যায়, একনেক এবং প্রশাসনিক অনুমোদন শেষে বিভিন্ন জটিলতার কারণে কাজ শুরু করতে ১০ মাস সময় লেগে যায়। কাজ শুরু হয় ২৮ এপ্রিল’১৮ তারিখ থেকে। পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের নির্বাহী সদস্য প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে টুকরো টুকরো অর্থাৎ খন্ডিতভাবে কাজ হয়। সমন্বিত কোন কাজ হয়নি। কিন্তু এই সমস্যা নিরসনে খন্ডিতভাবে কাজ করার কোন সুযোগ নেই। তাই চলমান প্রকল্পে কোন কিছু বাদ পড়লে তা যুক্ত করতেই হবে। আর তা যৌক্তিক সময়েই শেষ করতে হবে। বেশি দীর্ঘায়িত হলে আগের করা কাজের সুফল পাওয়া যাবে না। সময় বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে”, {সূত্রঃ প্র/আলো, ২০ ফেব্রুয়ারি’১৯}। চট্টগ্রামবাসীর জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মনোবেদনার বিষয় হচ্ছে স্থানীয় শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সংঘাত, কোন্দল, পরস্পরের মধ্যে দ্বন্ধ, বিস্মবাদ যা সবসময় তাঁদের মধ্যে লেগেই আছে। গত কয়েকবছর যাবৎ মেয়র চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার জন্য সিডিএ’র উড়াল সেতু নির্মাণের কাজকে দায়ী করে আসছিলেন যা কিছুটা হলেও সত্য। প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর নর্দমার ময়লা আবর্জনা অপসারণ এবং কাজ শেষে নালার ঢাকনা না লাগানোর জন্য সিডিএ’কে দোষারূপ করে আসছিলেন যা ছিল সঠিক অভিযোগ। পাশাপাশি সম্প্রতি জিইসি সার্কেলে উড়াল সেতুর নিচে দুই সড়কের মধ্যে সিডিএ দোকান ভাড়ার নোটিশ দিলে চসিক যানজট, রাস্তার মধ্যে ক্রেতাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে দোকান বরাদ্দ থেকে বিরত থাকার জন্য সিডিএ’কে নোটিশ দেয়। এবং চসিক ব্যবসায়ীদের রাস্তার মধ্যের দোকানের জন্য ট্রেড লাইসেন্স না দেয়ার হুমকীও প্রদান করে। এমতবস্থায় জনৈক নাগরিকের আদালতে আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত দোকান বরাদ্দের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এদিকে গত ২০ ফেব্রুয়ারি’১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত চসিকের ৪৩ তম সাধারণ সভায় জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন কয়েকজন কাউন্সিলর। সভা সূত্র জনায়, প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন সিডিএর জলাবদ্ধতা প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে কাউন্সিলররা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। “তাঁদের আশঙ্কা, কিছুদিন পরেই বর্ষা মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকার অনেক নালা ও খাল খনন করা হয়নি। বৃষ্টি এলেই এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে। আর এ জন্য জনগণ সিটি কর্পোরেশনকে দায়ী করবে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ”, (সূত্রঃ প্র/আলো, ২১ ফেব্রুয়ারি’১৯}। অপরদিকে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কার্যক্রম পুরোদমে চলছে দাবী করেছেন সিডিএর প্রকল্প পরিচালক। তার মতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং এটি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

আমরা চসিক, সিডিএ ও ওয়াসার মধ্যে মতবিরোধ, মতানৈক্য, দ্বন্ধ চাইনা। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামবাসীর প্রতি ভালোবাসা এবং মনের টান দেখিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বিরাট অংকের তহবিল দিয়েছেন চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করার জন্য। সেই তহবিলের সুচারু, যথাযথ, কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বাসীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করে দেশের প্রতি তাঁদের দায় ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণ করবেন। চট্টগ্রাম বাসী এখনো স্বপ্নের মধ্যে বসবাস করছে যে একদিন তাঁদের নগরী জলাবদ্ধতা মুক্ত হবে। মেগা প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারনে আমরা জানিনা সে স্বপ্ন পূরণের জন্য আরো কত বছর অপেক্ষা করতে হবে। যদিও গত ১৯ ফেব্রুয়ারি’১৯ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল রেজাউল করিম সিডিএর সম্মেলন কক্ষে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বলেন, তিনি জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম চান। কাজের গতি বাড়ানোর তাগিদ দেন। আশা করি মন্ত্রীর তাগাদায় কাজের গতি আসবে। এবং নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর হবে।

Top