হালদা নদীতে মাছ শিকার ও দখল-দূষণ আদৌ বন্ধ হবে কি ?

IMG_20190319_210050.jpg

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী

একদিকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ চলছে। ঢাকায় চলছে বুড়িগঙ্গা নদীর অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান। পাশাপাশি হালদা নদীতে অবাধে চলছে দখল, দূষণ আর অবৈধভাবেমা মাছ ধরা। কিছু কিছু অভিযানে কারেন্ট জাল জব্দ করা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য দক্ষিণ এশিয়া এবং বাংলাদেশের একমাত্র মিঠা পানির প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীকে অদ্যাবধি মা মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে কার্যকরভাবে গড়ে তোলা যায়নি মোটেও। যার সুফল থেকে দেশ ও জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং অবস্থা। ‘মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী থেকে অবৈধভাবে মাছ শিকারের সময় ১০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল উদ্ধার করেছে হাটহাজারি উপজেলা প্রশাসন’। {সুপ্রভাত, ৫মার্চ’১৯}। পরে এ জাল পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। পাশাপাশি ‘দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতে অভিযান চালিয়ে ৩০ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। হাটহাজারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে আইডিএফের স্বেচ্ছাসেবকগ্ণ হালদা নদীর মদুনাঘাট থেকে হালদা নদীর মুখ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এসব জাল জব্দ করেন’। {সূত্রঃ আজাদী, ৬ মার্চ’১৯}। পরে এসব জাল উপজেলা পরিষদ চত্বরে আগুনে ধ্বংস করা হয়।
সাধারণত ঘোর বর্ষা মৌসুমে মুষলধারে বৃষ্টি এবং প্রচুর বজ্রপাতের সময় হালদার মা মাছ ডিম ছেড়ে থাকে। পাশাপাশি শত শত নৌকার মাধ্যমে ডিম সংগ্রহকারীরা নদীর পানিতে ভাসমান ডিমগুলো সংগ্রহ করে থাকে। যা থেকে দেশের মানুষের রুই, কাতল, মৃগেল, আইর সহ বিভিন্ন মিটা পানির মাছের চাহিদার যোগান দিয়ে যাচ্ছে হালদা নদী। গত বছর বিগত দশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে।
জানা যায়, প্রকৃতি মা মাছের ডিম ছাড়ার অনুকূলে হলে এপ্রিল মাসে ডিম ছাড়তে পারে। ইদানীং হালদা নদীর বিভিন্ন শাখা, প্রশাখা খাল থেকে মা মাছ হালদা নদীতে আনাগোনা শুরু করেছে। পাশাপাশি কতিপয় অসাধু ব্যক্তি ডিম ছাড়তে আসা মা মাছ ধরার জন্য বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। মোটা দাগে বলা যায় প্রশাসন বিচ্ছিন্নভাবে হালদা নদী থেকে মা মাছ শিকার না করার জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা সত্ত্বেও অসাধু, অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করা যাচ্ছে না। এদিকে গত ৪ মার্চ’১৯ হালদা নদীতে একটি ১২ কেজি ওজনের কাতল মাছ ও ৩ কেজি ওজনের একটি আইর সহ দুইটি মাছ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা মা মাছগুলো উদ্ধার করেছে বলে জানা যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য দুইটি মাছের শরীরেই আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। মরা মাছ যে স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় সেখানে বড় বড় যান্ত্রিক বোট ছিল বলে জানা গেছে। এখন হালদা নদী প্রকল্প চলমান সেখানে বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারের পাখার আঘাতে মা মাছগুলো মারা যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
এক সূত্র থেকে জানা যায়, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রটিকে মা মাছের অভয়ারণ্য করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশনা প্রদান করা সত্ত্বেও বিগত এক দশকে এটিকে মা মাছের অভয়ারণ্য করার কার্যকরী পদক্ষেপ, কার্যক্রম দৃশ্যমান নয় বলে উভয় তীরের বাসিন্দা, পরিবেশবাদী এবং হালদা রক্ষা কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নদী দখল, দূষণ এবং মাছ শিকার কোনক্রমেই কমানো যাচ্ছে না তদারকি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা সমূহের সমন্বিত, কার্যকরী, ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে। নদী পাড়ের বিভিন্ন হাট বাজার, জনবসতি থেকে, বিভিন্ন মুগীর খামার থেকে খামারের বর্জ্য, জবেহকৃত পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, বসতির বিভিন্ন বর্জ্য, মলমূত্র এবং বিভিন্ন খালের মাধ্যমে ইটিপি বিহীন শিল্প কারখানার রাসায়নিক সহ বিভিন্ন বর্জ্য সরাসরি হালদা নদীতে এসে পড়ছে। এক সূত্র থেকে জানা যায়, মদুনাঘাটের বাজারের সব বর্জ্য ফেলা হচ্ছে সরাসরি হালদায়। পাশাপাশি কৃষ্ণখালী ও নজু মিয়া হাটের সব বর্জ্য খন্দকিয়া খাল হয়ে হালদায় পড়ছে বলেও জানা যায়। কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ইত্যাদিও নদীর পানিকে দূষিত করছে। পাশাপাশি নদীর পাড় ঘিরে নদী দখল করে গড়ে উঠছে দোকান পাট, মুরগীর খামার ইত্যাদি। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিভিন্ন যান্ত্রিক বোট চলাচল করছে। এবং এসবের মাধ্যমে মানুষ রড, সিমেন্ট, বালু সহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহণ করছে অবাধে ও নির্বিঘ্নে। তাছাড়া নৌযানের পোড়া মুবিল, বিভিন্ন তেল জাতীয় পদার্থ নদীকে দূষিত করছে অহরহ। তদুপরি এসব নৌযানের পখার আঘাতে গত বছর এবং এ বছরেও মারা পড়ছে মা মাছ সহ অনেক ডলফিন ( হুতোম প্রজাতির মাছ)।
হালদা নদীর পানি চট্টগ্রাম ওয়াসা পানি শোধনাগারের মাধ্যমে পরিশোধিত করে চট্টগ্রাম শহরে খাবার ও ব্যবহারের জন্যে সরবরাহ করছে প্রতিদিন। কৃষিকাজেও হালদার পানি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হাইকোর্টের মাননীয় একটি বেঞ্চ সকল নদীকে “জীবন্ত সত্ত্বা” ঘোষণা দিয়েছে। এর ধারবাহিকতায় এবং দেশের মিঠা পানির মৎস্য সম্পদকে রক্ষা, দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান, হালদার নদীর পানি কৃষিকাজ এবং পরিশোধিত হয়ে ওয়াসার মাধ্যমে মানুষ পান ও ব্যবহার করছে সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে হালদা নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন অতি শীঘ্র শুরু করা উচিৎ। অবৈধ দখলদার ও স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম গ্রহণ এবং শিল্পকারখানার ইটিপিবিহীন রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করার জন্য একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা সময়ের দাবী। পাশাপাশি মা মাছের অভয়ারণ্য শুধু কাগছে কলমে বা মুখে মুখে নয় কার্যক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে প্রণীত উদ্যোগ ও কার্যক্রম অতি দ্রুত সমাধান করার বিকল্প নেই। আমারা বিশ্বাস করি নদী বাঁচলে মাছ বাঁচবে, দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে।

Top